৩০ শ্রাবণ  ১৪২৫  বুধবার ১৫ আগস্ট ২০১৮  |  মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও রাশিয়ায় মহারণ ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

'অপু' থেকে 'ক্ষিদ্দা'। 'ময়ূরবাহন' থেকে 'ময়ূরাক্ষী'। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালির অভিজাত অহংকার। স্মৃতির ঝাঁপিতে তুলে রাখা ৬০ বছরের না বলা সব কথা তিনি উজাড় করে দিচ্ছেন তাঁর 'দিনের শেষে' কলামে। স্মৃতির সেই দিনলিপি লিখে রাখছেন সহলেখক গৌতম ভট্টাচার্য। 

 

এগজ্যাক্টলি বছরটা মনে পড়ছে না। বোধহয় ১৯৭০-’৭১ হবে। সকালে হঠাৎ টাইগার পটৌডির ফোন। তা ফোন করে প্রথমেই বলল, “সৌমিত্র তুমি তো অদ্ভুত টাইপের লোক। ছেলে-মেয়ে-বউ নিয়ে আমার বাড়িতে গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়ে গেলে। অথচ আমি তিন দিন ধরে কলকাতায়, তোমার একটা ফোন নেই?” আমি খুব হাসলাম। পটৌডিকে তার অনেক বছর আগে থেকে চিনি। জানি ওর সেন্স অফ হিউমার কেমন। যা বলল আদৌ গায়ে না মেখে বললাম, আসছি রাত্তিরে তোমার হোটেলে। পটৌডি সে বার হায়দরাবাদের হয়ে খেলতে এসেছিল। আমি আর দীপা গেলাম ওদের ডেরায়। তখনকার সেই গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। তখনকার টিমগুলো গ্রেট ইস্টার্নেই বেশি থাকত। গিয়ে দেখি জয়সীমা রুমে এসে গেছে। হুইস্কি চালু। আমরা দেখা-টেখা করে বেরিয়ে আসতে যাব, টাইগার কিছুতেই রাজি নয়। বলল চলো, পার্টি হপিংয়ে বেরবো। তখন অলরেডি রাত্তির এগারোটা। দু’চারটে পার্টি এ দিক ও দিক ঘোরার পর টাইগার বলল, চলো সৌমিত্র তোমার বাড়ি গিয়ে আরাম করে মদটা খাই।


আমার স্ত্রী আবার তখন আমায় ইশারা করছে, খবরদার আমাদের বাড়ি নয়। বাড়ি পুরো অগোছালো হয়ে পড়ে আছে। তার মধ্যে নবাব যাবে। হয় নাকি? টাইগার সে সব দেখছেও না। বলল, সৌমিত্র মদ ফুরিয়ে গেছে। একটু কেনার ব্যবস্থা করো। তখনকার কলকাতা আজকের মতো এত লিবারেল নয়। কোথায় পাব মদ? লাইটহাউসের উল্টো দিকের একটা দোকানে স্টক থাকত জানতাম। সেটাকে খুলিয়ে ওর জন্য হুইস্কির বোতল কেনা হল। বাকি যা মদের স্টক ছিল, ততক্ষণে সব শেষ। টাইগার বলল, চলো কোথাও। একটু খাই। কী করি, অগত্যা আমাদের একটা বন্ধু ছিল উড স্ট্রিটে। তাকে ফোন করে জানানো হল যে আমরা যাচ্ছি। সেখানেও ও টানা মদ খেয়ে গেল। আমি তখন প্রমাদ গুনছি। কাল সকালে আমার গানের সিকোয়েন্স রয়েছে। এ ব্যাটা তো এ দিকে ওঠার কোনও লক্ষণই দেখাচ্ছে না।  রাত তিনটে নাগাদ সেই আসর ভাঙল। আমি তখন নিজে ড্রাইভ করতাম। গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরলাম। টাইগারকে নামিয়ে দিলাম ওর হোটেলে। অবাক হয়ে গেলাম, অত মদ খেয়েও কিন্তু টলছে না। স্টেডি হেঁটে লবিতে ঢুকে গেল। আমি বরঞ্চ তখন চিন্তিত হয়ে পড়ছি কাল সকালে এত ইম্পর্ট্যান্ট গানের সিকোয়েন্স, আমি কী ভাবে ম্যানেজ করব? সকালে যখন মেক আপে বসেছি, চোখ-টোখ লাল। মেক আপ ম্যান বলছে, আপনার শরীর ঠিক আছে তো? আজ যেন কেমন দেখাচ্ছে। আমি আর ওকে কী বলব, যে কাল এক বন্ধু নবাবজাদার পাল্লায় পড়েছিলাম বটে। এক মিনিটের জন্য হঠাৎ মনে হল আমার একটা গানের সিকোয়েন্স করতে গিয়ে সকালে এই অবস্থা। আর টাইগার কিনা আজ ব্যাট করতে নামবে। আগের দিন একেবারে শেষ ওভারে নেমে ও জিরো নটআউট ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আজ তুই শিওর জিরোতেই আউট হবি। ফার্স্ট বলে বোল্ড।

টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে সেট পড়েছিল আমাদের। ফ্লোরের বাইরে ছোট একটা শুটিং জোন তৈরি করা হয়। গানের সিকোয়েন্সটা শুট করা হয়েছিল সেখানেই। খুব বিখ্যাত গান। ‘স্ত্রী’ ছবির। খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার/এই তোমাদের পৃথিবী। শুটিং একটু দেরিতে শুরু হলে আমার কোনও প্রবলেম ছিল না। তিন-চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু সিনটা ঠিক করে তোলার জন্য ভোরের আলো দরকার ছিল। এক ঘণ্টার বেশি ঘুমোতেই পারিনি। তার পরেও যে ঠিকঠাক লিপ দিয়েছিলাম সেটাই বোধহয় আশ্চর্য। একই রকম পপুলার থেকে গিয়েছে ‘তিন ভুবনের পারে’-র কিছু গান। ‘জীবনে কী পাব না’। আধুনিক এমন সব মেটাফর এর মধ্যে ছিল। রোম্যান্টিক একটা অনুষঙ্গ এমন ছিল যে প্র্যাকটিসে লিপ দেওয়ার সময়ও মজা লাগত। দারুণ কাজ করেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। গানটার সঙ্গে টুইস্ট নেচেছিলাম আমি। সেটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। আমি একেবারেই নাচতে পারতাম না। ফিল্মে ডান্স সিকোয়েন্স আছে শুনে আমার মেয়ে টিটকিরি দিতে শুরু করল, বাপি তুমি ধেই ধেই করে নেচো না। পৌলমী আসলে ছোটবেলা থেকেই খুব ভাল ডান্সার। গোটা পরিবার মনে হল আমার সম্ভাব্য টুইস্ট নাচের ভবিতব্য নিয়ে অসীম আতঙ্কে। শেষ পর্যন্ত আমার স্ত্রী সাজেস্ট করলেন, নাচ শিখে তার পর ফ্লোরে যাও। তখন কলকাতায় ওয়েস্টার্ন ডান্স খুব ভাল শেখাতেন বব দাস। আমি ববের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করলাম। তার পর ওই পাড়ার চ্যাংড়া ছেলের ডান্স সিকোয়েন্স করতে অসুবিধে হয়নি।
‘তিন ভুবনের পারে’-তে চ্যাংড়া ছেলেটার পাড়ার মস্তানি থেকে বৃহত্তর জীবনে উত্তরণ- একটা অ্যাসপিরেশনাল ব্যাপার ছিল। রোলটা করে খুব ভাল লেগেছিল। আর বাড়তি আকর্ষণ ছিল তনুজা। আমি আর তনুজা বরাবর খুব ভাল বন্ধু। এমনকী আজও আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। বজবজের কাছে একটা জায়গায় শুট হয়েছিল ‘হয়তো তোমারই জন্য-র সং সিকোয়েন্স।
শর্মিলার সঙ্গেও আমার খুব ভাল বন্ধুত্ব। তনুজা-শর্মিলা ওদের সঙ্গে দেখা আর কত হয়? বছরে হয়তো এক-আধবার। কখনও তা-ও না। অথচ দেখা হলে আমরা সেই পুরনো সময়ের মতোই উষ্ণতা নিয়ে আবার শুরু করি। ওরা দু’জনেই আমার এত কাছের যে ওদের সঙ্গে সম্পর্কটা প্রেম অবধি গড়ালে আমি হয়তো আশ্চর্য হতাম না। অপর্ণা সেন তুলনায় আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। স্নেহভাজন এবং ভাইঝিস্থানীয়। ওর বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্তর সঙ্গে আমার খুব সখ্য ছিল। অপর্ণা তাই আমায় ‘কাকু’ বলে ডাকত। তার পর একদিন নিজেই এসে বলল, ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। কাকু বলে ডেকে রোম্যান্টিক রোল করা যায় না। আমি তখন মজা করে বললাম, তা হলে তোমার বাবাকে এখন থেকে আমি কী বলে ডাকব বলো?

কত স্মৃতি। কত ঘটনা। কত মনে থেকে যাওয়া কথা জড়িয়ে রয়েছে এ সব নাচ-গানের সিকোয়েন্সগুলো ঘিরে।
নাচা ব্যাপারটা বরাবর আমার কাছে চ্যালেঞ্জিং ছিল। ‘হোমাপাখী’ নাটকে আমাকে নাচতে হয়েছিল। সেই টুইস্ট। তবে একটু বদলানো হয়েছিল ইচ্ছাকৃত ভাবে। আমার মেয়ে তখন সাজেস্ট করল, যে স্টেপগুলো ফিল্মে করেছিলে, সেগুলোই করো। শুধু হাতের ব্যবহারটা আনো। শুরুর দিকে অবশ্য শুধু নাচ নয়, গানে লিপ দেওয়ার ব্যাপারেও আমি কিঞ্চিৎ অনুৎসাহী ছিলাম। এমনিতে বাংলা সিনেমার নায়কের লিপে গান বহু পুরনো অভ্যেস। আমি যাঁকে বেস্ট লিপ দিতে দেখেছি তিনি গাইয়ে হিসেবেও সমান বিখ্যাত ছিলেন- নীতীশ মুখোপাধ্যায়। আর একজন লেজেন্ডের কথা না বললেই নয়। তিনি, রবীন মজুমদার। তাঁর সর্বশেষ লিপ দেওয়া আমরা দেখেছি ‘হীরক রাজার দেশে’—তে। কী দারুণ করেছিলেন! নীতীশ মুখোপাধ্যায় আর রবীন মজুমদার ছাড়া দুর্ধর্ষ লিপ দিতে আমি মাত্র আর একজনকেই দেখেছি। নামটা আন্দাজ করা খুব সহজ– উত্তম কুমার! নিজে ভাল গাইত উত্তমদা। বউদির সঙ্গে ওর প্রেম তো গান শেখাতে গিয়েই। অনেকেই হয়তো জানেন গৌরী দেবীর গানের টিচার ছিলেন উত্তমদা।

উত্তমদার লিপ দেওয়া নিয়ে অনেক কথা বলার আছে। পরের শনিবার আসছি। তার আগে টাইগারের গল্পটা শেষ করি। ‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার’ গানটায় লিপ দেওয়া শেষ হতে বেশ সময় লেগেছিল। এত কনসেনট্রেট করে করতে হয়েছিল যে মধ্যিখানে টাইগারের কথা মনেই পড়েনি আমার। তখন তো আর মোবাইল ফোনের দুনিয়াও নয় যে ফটাফট স্ক্রিনে স্কোর ভেসে আসবে। বা কাউকে ফোন-টোন করে জানব। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরেছি। দেখি আমার স্ত্রীও ফিরেছে ইডেন থেকে। দীপা সে দিন বেঙ্গল—হায়দরাবাদ ম্যাচ দেখতে ইডেন গেছিল। সঙ্গে গেছিল আমাদেরই বন্ধু, এক্স স্পোর্টিং ইউনিয়নের প্লেয়ার শিবাজি রায়। শিবাজি বড় চাকরি করত এম এন দস্তুরে। প্লাস বড় ক্রিকেট বোদ্ধা। আমি ওদের দেখে বললাম, কেন কষ্ট করে গেলে? টাইগার ফার্স্ট বলে বোল্ড তো? শিবাজি বলল, “পুলুদা কী বলছেন! টাইগার সেঞ্চুরি করেছে।” আমি তো শুনে হাঁ। আমার স্ত্রী তখন বললেন, “তুমি যে কী মিস করলে। দুর্ধর্ষ খেলেছে টাইগার। স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছুটিয়েছে আজ।”

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। টাইগারও আজ নেই। কিন্তু আমার বিস্ময় কাটেনি। রাত তিনটে অবধি অত মদ খেয়ে কী করে একটা লোক পরের দিন সেঞ্চুরি করতে পারে?

ট্রেন্ডিং