৩০ শ্রাবণ  ১৪২৫  বুধবার ১৫ আগস্ট ২০১৮  |  মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও রাশিয়ায় মহারণ ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

ভারত : প্রথম ইনিংস

বিজয়: বো অ্যান্ডারসন ০

লোকেশ: ক বেয়ারস্টো বো অ্যান্ডারসন ৮

 পুজারা: রানআউট ১

 কোহলি: ক বাটলার বো ওকস ২৩

 রাহানে: ক কুক বো অ্যান্ডারসন ১৮,

হার্দিক: ক বাটলরা বো ওকস ১১

 কার্তিক: বো কুরান ১

অশ্বিন: এলবিডব্লুউ ব্রড ২৯

 কুলদীপ: এলবিডব্লুউ অ্যান্ডারসন ০

 সামি: নঃআঃ ১০,

ইশান্ত: এলবিডব্লুউ অ্যান্ডারসন ০।

মোট ৩৫.২ ওভারে ১০৭।

গৌতম ভট্টাচার্য, লন্ডন:  গতকালও এ দেশের ক্রিকেট অনুরাগীরা তীব্র কৌতূকের সঙ্গে বলেছেন, ক্রিকেট গড নির্ঘাৎ ইংরেজ। নইলে এ বারের হিটওয়েভের ভয়ঙ্কর বাজারে তিনি ঠিক বেছে বেছে টেস্ট ম্যাচের দিনগুলো মেঘলা আর ঠান্ডা ঠান্ডা করে দেবেন কেন? লর্ডসের বিখ্যাত সুভেনির শপের কাউন্টারের সামনে এ দিন দেখলাম সানস্ক্রিন লোশনের শয়ে শয়ে ছোট ছোট প্যাকেট পড়ে থাকা। অবশ্যই এগুলো রাখা গরমে কাহিল দর্শকদের কথা ভেবে। এ বারের ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে এই দুটো জিনিস সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে সানস্ক্রিন লোশন আর এয়ার কন্ডিশনার। সানস্ক্রিন লোশন তো অনেক দোকানে আউট অব স্টক হয়ে গিয়েছিল। আর এ দিন মনে হল এক প্যাকেটও বিক্রি হওয়া উচিত নয়। ইংল্যান্ড জাস্ট দশ-পনেরো দিনের মধ্যে তার পুরনো অভ্যেসে ফিরতে পেরেছে- হুডওয়ালা রেন জ্যাকেট।

[উইকেট নিয়ে মধ্যমা প্রদর্শন, পাক বোলারের আচরণে নিন্দার ঝড় নেটদুনিয়ায়]

    আসিফ ইকবাল থেকে শুরু করে বড়-ছোট সব বিশেষজ্ঞ আন্দাজ করছিলেন, এমন দাবদাহ যখন লন্ডন জুড়ে চলছে ভারত আরামে দুই স্পিনার খেলাবে এবং অনিবার্য গরিমা খনন করবে লর্ডস পিচ থেকে। কে জানত জলবায়ুর এমন অকস্মাৎ পরিবর্ত হয়ে ইকুয়েশন ঘুরিয়ে দেবে ইংল্যান্ডের দিকে? এজবাস্টনের মতোই বিরাট কোহলি টস হারলেন। তাতে কী! ভারতীয় মিডিয়ায় গণনা শুরু হয়ে গিয়েছে বিপক্ষে এমন ছয় জন ব্যাটসম্যান আছে যারা জীবনে কুলদীপ যাদবকে খেলেনি। ফোর্থ ইনিংসে এরা সামলাবে কী করে দুই স্পিনার, যেখানে একটা অশ্বিনেই সর্ষেফুল? ওপরে মেঘলা চাঁদোয়া বিছিয়ে থাকা অবস্থায় জিমি অ্যান্ডারসন দৌড় শুরু করলেন। চলতি সিরিজে তাঁকে যতটা ভারত খেলছে ততটা জো রুটকেও নয়। ভারতীয় ড্রেসিংরুমের তাই ধারাবাহিক পথ নির্দেশ থাকে- অ্যান্ডারসনকে অন্তত প্রথম স্পেলে উইকেট দিও না। সমস্যা হল ঠান্ডা ঘরে যারা পথ নির্দেশ দেয় তারা তো আর বাইশ গজে নেমে এমন পরিবেশে ব্যাট করছে না!

   প্রথমে চার স্লিপ। তারপর আরও একটা লোক নিজের জন্য বাড়িয়ে নিলেন অ্যান্ডারসন। পাঁচ স্লিপ টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ওভারে কবে দেখা গিয়েছে? হ্যাটট্রিকের বল-টলে হতে পারে। কিন্তু এমনই চাপ দিতে শুরু করলেন যে মনে হচ্ছিল সেই বহু পুরনো ক্যাচলাইন এ বার বদলাবার সময় হয়েছে। বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম নয়, বেন্ড ইট লাইক অ্যান্ডারসন। বেকহ্যামের সেট-পিস ফ্রি কিকের মতো অ্যান্ডারসনের এক-একটা ডেলিভারিও যেন বাঁক খাওয়ানো ছোবল। মুরলী বিজয় পঞ্চম বল থেকে সরতে না পেরে খোঁচা দিয়ে দিলেন। দিনের মেনুটাও যেন ঠিক করে দিয়ে গেলেন। ব্যাটসম্যানদের জন্য আজ শুধু ভেজিটেরিয়ান সুপ। ব্যাকফুটে থাকো, বল ছাড়তে ছাড়তে যাও। ভুলেও সামনের পায়ে এসে নন-ভেজ শটের কথা ভেবো না।

   লোকেশ রাহুল তাও একটা নন-ভেজ আইটেম পেয়ে গেলেন উল্টোদিকে স্টুয়ার্ট ব্রড হাফভলি দিয়ে দেওয়ায়। অদ্ভুত একটা আতঙ্কের গুহার মধ্যে আবার পরের ওভারে নিয়ে ফিরল ইংল্যান্ড। মাফ করবেন, নিয়ে ফেললেন জিমি। ৩৬ বছরের পেসার কেন ভারতীয় সিরিজকে অ্যাসেজ-যুদ্ধ হিসেবে ধরছেন সেটা এখনও অজানা। ভবিষ্যতে হয়তো আত্মজীবনীতে জানা যাবে তাঁর এত উষ্মা ভারতীয় দলে কার প্রতি ছিল? কোহলি? নিছক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই জেতা? অন্য কিছু?

[টিম ইন্ডিয়ার সঙ্গে অনুষ্কার ছবি, কী জবাব দিল বিসিসিআই?]

    যাই হোক, অ্যান্ডারসন দ্রুত ফেরালেন লোকেশ রাহুলকে। লং রুম প্রান্ত থেকে যখন কোহলিকে বল করতে আসছেন মনে হচ্ছিল আজ মহানাটকীয় কিছু ঘটবে। কোহলির হাতে ক্যারি ফরোয়ার্ড করা ব্যালেন্স ২০০। আগের স্কোর ইংল্যান্ডের ব্যাঙ্কগুলোর মতোই অতি কম ইন্টারেস্ট দেয়- ০.৭৫%। তবু কিছু তো দেয়। আজ দেখা গেল কোহলির ব্যাঙ্ক যেন এজবাস্টনের ইন্টারেস্টটা এখনও পাসবুকে পোস্ট করেনি। নইলে প্রথম বল থেকে ভারত অধিনায়ক এত অনিশ্চিত থাকবেন কেন? প্রথম বলে একটা সিঙ্গলস পেয়ে যেমন গুড়মুড়িয়ে উল্টোদিকে দৌড়লেন যে ডেভিড গাওয়ার বলেই ফেললেন, “কোহলি জানে শান্তি লুকিয়ে আছে নন স্টাইকার্স এন্ডে।” কেমন ত্রস্ত, চাপে পড়া, বিপন্ন দেখাচ্ছিল ভারত অধিনায়ককে। কী পরিমাণ চাপ তৈরি হয়েছে সেটা এরপর বোঝা গেল চেতেশ্বর পুজারাকে তিনি সিঙ্গলসের জন্য ডেকে এবং নিজে বেরিয়েও আবার ক্রিজে ঢুকে যাওয়ায়। পুজারার গত দশ ইনিংসের সাতটায় রানআউটের কাহিনি রয়েছে। কিন্তু এটাতে তাঁর বিন্দুমাত্র দোষ নেই। ক্যাপ্টেন যদি বিশ্বাসভঙ্গ করেন তিনি কী করতে পারেন?

    সঞ্জীব চন্দ্রের সেই বিখ্যাত গল্পের দুই ছাত্রের মতো একজন নিজে আপেলটা খেয়ে নেওয়ায় অন্য ছাত্র বলেছিল, নিজে খেয়ে নিলি? ছাত্রটি বলল, তুই হলে কী করতি? দ্বিতীয় ছাত্র বলেছিল, আমি হলে তোকে আগে দিতাম। প্রথম ছাত্র অম্লানবদন- আমি তো ঠিক তাই করেছি।

    লর্ডসের কোহলির সঙ্গে গল্পের ছাত্রর মিল নেই। কোহলি-আচ্ছন্ন জনাকয়েক ভারতীয় সমর্থকের সঙ্গে মিডিয়া লাউঞ্জের ঠিক নীচে দেখা হল। ক্রিকেটের আঙ্গিকে কোহলির রানআউটের মালা বেন স্টোকসের মতো। অমার্জনীয় অপরাধ। পার্টনারকে ডেকে এবং নিজে বেরিয়েও ফেরত চলে যাওয়া। সমর্থকদের ব্যাখ্যা অন্যরকম: কোহলি ভেবে দেখলেন কে ক্রিজে থাকলে টিমের ভাল? উত্তর পেলেন বিরাট তুমি থাকলে।

  বিরাটের উত্তরের জন্য না ভেবে লর্ডস প্রেসবক্স তখন আরও একটা প্রশ্নের উত্তর চাইছে, আপনারা কে কে সেই ৪২ অল আউটের দিনে হাজির ছিলেন? এই মাঠে ভারতীয় ক্রিকেটের সেই বহুলজ্জিত সামার অব ৪২। চুয়াল্লিশ বছর আগের কথা। অথচ অন্তত চার-পাঁচজনকে দেখা গেল যাঁরা সে দিন প্রেসবক্সে ছিলেন। এই ভারত কোহলিকে নিয়েও যে পরিমাণ কাঁপছে তাতে তিন উইকেটে ১৫ থেকে বড় কোনও দুর্ঘটনায় পড়বে না তো? ঠিক এই সময়ে বৃষ্টি নেমে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের বস্ত্রহরণ মুলতবি করে দিল। হয়তো বা উদ্ধারও। অ্যান্ডারসনের বল দেরিতে ভাঙা ছাড়াও সিমে পড়ে এমন অতর্কিত মুভমেন্ট হচ্ছিল যে খেলা সত্যিই কঠিন। ভারতের মাঠেও অ্যান্ডারসন যথেষ্ট সফল। ১০ টেস্টে ২৬ উইকেট নিয়েছেন। মাত্র ৩৩ গড় নিয়ে। যা শ্বেতাঙ্গ পেসারদের মধ্যে এক ম্যাকগ্রা ছাড়া কারও নেই। কিন্তু ভারতের মাটির অ্যান্ডারসন শুধুই অ্যান্ডারসন। বিলেতে এ বারের অ্যান্ডারসন হলেন অ্যান্ডরসন এইচডি। ছবি আরও ভাল, সূক্ষ্মতা আরও ভাল। সামগ্রিক ফিলটা আরও ভাল!

   শুধু তো বিরাট নন, তিনি বেগ দিয়েছেন নিজের সেরা সময়ে থাকা সেই ভারতীয়কেও। যিনি লর্ডস মাঠের সঙ্গে চিরকালীন গাঁটছড়ার অভাবকে আরও কনফার্ম করে এ দিন আর আসতে পারলেন না। ঘণ্টা বাজিয়ে লর্ডস টেস্ট উদ্বোধন করার কথা ছিল তাঁর। সেটা অন্য কেউ করল। তিনি অবশ্য রেখে গেলেন ছেলে অর্জুনকে। যে বলবয় হিসেবে থাকল গোটা দিন। তার বাবা সাতাশির বিশ্বকাপে ভারতের ম্যাচে বলবয় ছিলেন। ছেলে বলবয়ের কাজ করল অনূর্ধ্ব উনিশ ভারতীয় দলে ঢোকার পরেও। এ দিনের বলবয় মানে প্রচুর কাজ। অ্যান্ডারসনের এমন রুদ্রমূর্তির দিনে বল কুড়োনোর ব্যাপার নেই। একদিক থেকে তিনি ১০ ওভার, ৪ মেডেন, ১৮ রান, ২ উইকেট। কিন্তু বৃষ্টিকে তো কুড়োতে হল। দিনের বিভিন্ন সময়ে বারবার এলো এবং মাঠকর্মীদের মতো কভার নিয়ে দৌড়তে হল অর্জুনকে। শুধু এ দিন নয়, এখানেও মাঠকর্মীদের বৃষ্টিতে কোনও আচ্ছাদনের ব্যবস্থা নেই। এটাই হয়তো তেণ্ডুলকর পরিবারের ক্রিকেটিয় দর্শন যে, ক্রিকেট মাঠে কোনও কাজই ছোট নয়। ক্রিকেটের সামনে নম্র থাকো। তার সাধনা করো। খেলাটাও তোমায় দেখবে।

   কে বলতে পারে ইংল্যান্ডে বছর চারেক বাদে পরের সফরে বাঁ হাতি পেসার অর্জুন দলে ঢোকার উপযুক্ত হবে কি না? যদি ঢোকে দাদাদের সুইং ও সিমের সামনে অসহায়তা তার মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে থাকা উচিত। মাঠের দক্ষিণ দিকের একটা বক্সে ক্রিকেট দেখছিলেন জাহির আব্বাস আর দিলীপ দোশি। জাহির ইংল্যান্ড কন্ডিশনে লেট মুভমেন্ট বরাবর ভাল খেলেছেন। সৌরভ থেকে আজহার- অনেকে তাঁর কাছে পরামর্শ নিয়ে উপকৃত। শুনলাম বহুলবিখ্যাত ভারতীয় ব্যাটিংয়ের এই অবস্থা দেখে তিনি বিস্ফারিত। আজকের পুজারা দুর্ঘটনার পরেও অবশ্য কোহলি—মুগ্ধতায় পলি পড়ার কোনও আশঙ্কা নেই। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধের সময় নীচে নেমে জো রুটের একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম। শয়ে শয়ে ক্রিকেট সমর্থক দেখছিলেন যেহেতু নার্সারি এন্ডে বড় স্ক্রিনে সেটা দেখানো হচ্ছিল। তাতে নিজের দেখা সর্বকালের সেরা এগারোয় ইংরেজ অধিনায়ক পাঁচ নম্বরে রাখলেন বিরাটকে। তিন তেন্ডুলকর আর চার কালিস।

   বিরাটের তাই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা তাঁর অধিনায়কত্ব আক্রান্ত হলে। এই নিয়ে টানা ৩৭ টেস্টে একটাতেও তিনি আগের ম্যাচের দল খেলাননি। টেস্ট ক্রিকেটে যা ভাবা যায় না। আজকের মতো আবহাওয়া আরও লজ্জা থেকে তাঁকে বাঁচিয়ে বাঙ্কারে ফেরত পাঠিয়েছে। রোজ রোজ ক্রিকেট-ঈশ্বরকে ভারতীয় নাও মনে হতে পারে!

 

 

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং