BREAKING NEWS

৪ মাঘ  ১৪২৭  সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১ 

READ IN APP

Advertisement

চিজ বড়ি হ্যায়…

Published by: ফিসফাস কিচেন |    Posted: August 13, 2018 10:12 pm|    Updated: July 17, 2019 10:28 am

An Images

সেই প্রথম, ভানুরেখা গণেশন যখন ১৯৮১ সালে উমরাও জান সিনেমায় আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথম বললেন, “দিল চিজ কেয়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে...” -  সেই প্রথম- তার আগে আম গড়পড়তা ভারতীয় চিজ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত ছিল না। দুধ ফাটিয়ে তার খাবার টেবিলে উঠে আসতো ছানা, আর ছানা থেকে সন্দেশ, রসগোল্লা, ক্ষীর ইত্যাদি। উত্তর ভারতে অবশ্য ছানায় ময়দা মাখিয়ে দামড়া দামড়া শিল দিয়ে চাপা দিয়ে স্পঞ্জের মতো পনির তৈরি হত। আর সেই পনির ভারতীয় নিরামিষ রান্নাকে প্রায় একই জায়গায় আটকে রাখতে যথেষ্ট অগ্রসর ভূমিকা পালন করত।

তবে সেসবের আগে থেকে সারা পৃথিবীতেই চিজের জয়গান গাওয়া শুরু হয়ে গেছে। শুধুমাত্র নিরামিষ ডিশই নয়। আমিষ রান্নাতে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য এমন কি ডেসার্ট হিসাবে খেতেও চিজের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ।

আরও পড়ুন:  অধিকন্তু ন ধোসায় 

বস্তুত, চিজই বোধহয় পৃথিবীর প্রথম প্রসেসড ফুড। ঐতিহাসিক নথি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে রুটি এবং মদের সঙ্গে চিজেরও জন্ম হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার জনগোষ্ঠী দশ হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দে যখন দুধের জন্য ছাগল বা মোষকে গৃহপোষ্য করে তুলছে, তখন দুধ একদম তাজা খাওয়া হত। হয়তো কোনও যাত্রী, যোদ্ধা, চামড়ার থলের মধ্যে দুধ ভরে নিয়ে যেতে গিয়ে আবিষ্কার করে, থলের দুধের জায়গায় থকথকে একটা অবশেষ পড়ে আছে এবং তার সঙ্গে একটু অপরিষ্কার রঙের কোনও পাতলা তরল রয়েছে। এই সব চামড়ার ব্যাগগুলো তৈরি হত বিভিন্ন জীবজন্তুর পাকস্থলি থেকে। তাতে হয়তো ছানা কাটার কোনও এনজাইম রয়ে গিয়েছিল। গরম, আর ঘোড়ার ছোটার ফলে দোলায় দই কেটে ছানা ছানা তৈরি হয়েছে সঙ্গে বাটারমিল্কের মতো কোনও তরল।

চিজের যে প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় তা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়, আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৬০০০ বছরে। তারপর সুমেরিয় সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা ঘুর বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টেও দেখা পাওয়া যায় চীজের। প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন দেওয়ালচিত্রেও খাদ্যবস্তু হিসেবে চিজ দেখতে পাই।

প্রাচীন মিশরে চামড়ার থলির মধ্যে চিজ রাখা হত যাতে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যায়। এই সময় চিজ তৈরির দুটো পদ্ধতি দেখতে পাচ্ছি। একটা দুধ কাটিয়ে যেভাবে যোগার্ট, কাফির বা কুমিস তৈরি হয় সেইভাবে চিজ তৈরি হতে পারে। কাফির হল অনেকটা ভারী ছাঁচের মতো পানীয় যা শুধুমাত্র দুধ মজিয়ে তৈরি হয়। কুমিস অবশ্য ঘোড়ার দুধ থেকে হয়। সে যাই হোক একটা পদ্ধতি হল দুধ মজিয়ে বা কাটিয়ে। আর আরেকটা পদ্ধতি হল দুধ টকিয়ে দই আর পাতলা ছাঁচ তৈরি করে সেই দই মসলিনে বেঁধে ভারতে পনির বা ফ্রান্সের নর্মান্ডিতে ক্যামেবারর বা ক্রতি দে স্যাভিনিও তৈরি হয় (গোদা বাংলায় হাতে তৈরি চিজ)।

গ্রীক মহাকাব্য ওডিসিতে আছে ওডিসিয়ুস যখন সাইক্লোপসের গুহায় গিয়ে পৌঁছান, দেখতে পান যে সাইক্লোপসের র‍্যাকে ভরতি চিজ। আর পরে লুকিয়ে দেখেন যে এক চোখা দৈত্য কীভাবে ভেড়া এবং ছাগলের দুধ দুয়ে তা কাটিয়ে চিজ তৈরির জন্য রাখছে।

কিন্তু আসলে রোমানদের হাতে পড়ে চিজ তৈরির পদ্ধতি মোক্ষ লাভ করে। বিভিন্ন ধরনের কক্ষ ব্যবহার করে আর্দ্রতা, উষ্ণতা এবং সর্বোপরি পদ্ধতির উপর নিয়ন্ত্রণ আনে তারা। আগুন থেকে ধোঁয়ার ব্যবহার, বিভিন্ন রকমের হার্বসের ব্যবহার, ভিন্ন ভিন্ন দুধ অর্থাৎ গরু ভেড়া ছাগল তো ছিলই গাধা এবং ঘোড়ার দুধ ব্যবহার করে চিজ তৈরিতে বিভিন্নতা আনা হয়।

রোমান রন্ধন বিশেষজ্ঞ কলুমিলার রন্ধনশৈলীর যে গাইড রয়েছে যা আনুমানিক ৫০ খৃষ্টাব্দে তিনি লিখেছিলেন, তাতে কোগুলাম ব্যবহারে কথা বলা হয়েছে। যা কচি পাঁঠা বা ভেড়ার পাকস্থলির চতুর্থ খোপে তৈরি একধরনের এনজাইম। এছাড়াও কলুমেলা চিজ সংরক্ষণ ও শুকনোর জন্য নুনের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

[ ব্যাকরণ না-মানা রন্ধনশিল্প কিংবা পিকাসোর ছবি ]

একবার দেখি চিজের নামকরণ কোথা থেকে এল? তখনও ইংলিশ ভাষা তৈরি হয়নি, পুরনো স্যাক্সন ইংরাজিতে সেস বা সিস বলা হত, প্রাচীন স্যাক্সন ভাষায় যা ছিল কাসি, উত্তর জার্মানেও একে কাসি বলা হত যা বর্তমানে জার্মান ভাষায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কেইস। ওলন্দাজ ভাষায় কাস, স্প্যানিশ ও পর্তুগিজে কুইসো বা কুইজো বা কুইহো। অন্য দিকে চিজের ফ্রেঞ্চ বা ইতালীয় নামকরণ ফ্রোমেজ বা ফর্মাজ্জো গ্রীক ফরমোজ থেকে এসেছে- ফরমোজ হল চিজের জল ঝরানোর জন্য ব্যবহৃত ঝুড়ি। অবশ্য বোলোনা বা নাপোলি অঞ্চলে চিজকে ক্যাসোও বলা হয়।

অদ্ভুত ভাবে, রোমান সাম্রাজ্যের বাইরে চিজ সপর্কে খুব একটা জ্ঞান ছিল না। এশিয়ায় এমনকী ভারতেও দেবদেবীদের পুজোয় দুধ ব্যবহৃত হত, কিন্তু কাটা ছানা বা চিজ কখনই নয়। ভারতে তো আধুনিক যুগ পর্যন্ত ব্রাহ্মণরা ছানা বা পনির ছুঁয়ে দেখতেন না কারণ তা দুধের ‘পবিত্রতা’ নষ্ট করে বানানো।

সে যাই হোক একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে চিজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের ঝাঁ চকচকে মলের মাল্টি ন্যাশনাল আউটলেটগুলোয় উঁকি দিয়ে দেখুন। দুধ কাটিয়ে ছানা ছাড়াও প্রচুর ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চিজ আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। সে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস চিজ হোক বা ফ্রান্সের ব্রাই দে মিউ, ক্যামেবারর, রকফোর্ট, লিভারোঁ। ইতালির পার্মেসান, রিকোটা, ব্যারাটা, মোজ্জারেলা, গর্গঞ্জোলা বা গ্রীসের ফেটা অথবা ব্রিটেনের চেডার বা ডেনমার্কের বিখ্যাত ডেনিশ ব্লু। রান্নাঘরের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠে চিজ আপনার এক অনন্য সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে, থোড়-বড়ি-খাড়ার গতানুগতিকতা পেরিয়ে।

পরেরবার আসছি বিরিয়ানি নিয়ে।  

লেখক পরিচিতি: পেশায় আধিকারিক। তবে হাতা-খুন্তি-গামলাতেও তিনি সমান মনোযোগী। রাঁধতে ভালবাসেন, রেঁধে খাওয়াতেও। আরও ভালবাসেন খাওয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। রান্নাবান্না নিয়ে লেখা মানেই স্রেফ রেসিপি নয়, খাদ্যসংস্কৃতির চর্চাও। এই ব্লগ আসলে সেই সফরই। শুধু নয় খানা-পিনা, খাদ্যসংস্কৃতির অলিগলিতে সৌরাংশুর মুসাফিরানা।  

Advertisement

Advertisement