২ কার্তিক  ১৪২৬  রবিবার ২০ অক্টোবর ২০১৯ 

Menu Logo পুজো ২০১৯ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

আপনাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার সফর শুরু হল। আমার বলতে ফিসফাস কিচেন বা ফিফাকি-র সফর। প্রতি সপ্তাহে খাবার, খাওয়ার গল্প, ইতিহাস, ভূগোল নিয়ে আপনাদের সঙ্গে মোলাকাত হবে বরং। তবে আজ শুরুটা একটু অন্যরকম করে করি।

চিজ নিয়ে লিখতে বসেছিলাম! চিজ বিশ্বের প্রথম প্রসেসড খাদ্য। লিখতে বসে সবে একটা কোট করেছি যে,‘ভারতীয় নিরামিষ খাদ্যসম্ভারকে পনির একা হাতে পিছিয়ে দিয়েছে একযুগ’। আর অমনি মনে পড়ে গেল এই যুগান্তকারী মন্তব্যের মালিক নশ্বর জীবনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে উপরওলার সঙ্গে একটা ওয়াইনের বোতল আর চিজ নিয়ে বসে জীবনসঙ্গীতের রেসিপি আলোচনা করতে চলে গেলেন এই কটাদিন আগে।

অ্যান্থনি বৌরদেন, দ্য কাউবয় কুক, নো রিজার্ভেশন বা দ্য পার্টস আননোনের মতো জনপ্রিয় টিভি শোয়ের হোস্ট, কিচেন কনফিডেনসিয়াল ছাড়াও বেশ কিছু বেস্ট সেলার বইয়ের লেখক। জীবদ্দশায় যিনি রান্নাকে পিকাসোর ছবি আঁকার মতো নিজের জীবনে নিয়েছিলেন তিনি আর নেই? ভাবতেই কেমন লাগছিল।

না পাঠক/ পাঠিকারা, মারা গিয়েছেন বলেই বলে বলব না যে, অ্যান্থনি বৌরদেন আমার প্রিয় রন্ধনশিল্পী, অথবা তাঁকে দেখেই আমি এই বিষয়ে আগ্রহী হয়েছিলাম ইত্যাদি। রান্না নিয়ে আমার আগ্রহ বরং সঞ্জীব কাপুরের শো এবং মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া দেখে। (গর্ডন রামসেকে অত্যন্ত অসভ্য বলে মনে হয়, তাই ইউএসএটা আমার প্রিয় শো নয়) কিন্তু টিএলসির শো ‘দ্য পার্টস আননোন’ আমাকে রান্নাটাকে অন্যভাবে ভাবতে শেখায়। ছবি আঁকার ব্যাকরণের বাইরেও একটা জিনিস আছে। সেটা হল ইন্সটিংকট। সেই ইন্সটিংকটই আমাকে বলবে আকাশটা নীল না করে বেগুনি করে দাও আর বেগুনী বানাবার সময় কুড়মুড়ে করার সময় চালগুঁড়ি ব্যবহার করো।

আনন্দ-এর রোল ফিরিয়ে দিয়েছিলাম বলে অাফসোস হয়নি ]

আর এই ইন্সটিংকটাই উসকে দিয়েছিলেন বৌরদেন। হঠাৎ করেই। ঠিক যেভাবে বৌরদেনের নিজের রন্ধনশিল্পের প্রতি ভালবাসা জেগেছিল, ছোট বয়সে ফ্রান্সে ঠাকুর্দার পুরনো বাড়িতে এসে, নৌকাবিহারে অয়েস্টার রান্না দেখতে গিয়ে।তারপর প্রথাগত শিক্ষা বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারেনি তাঁকে। শেষে ১৯৭৮-এ নিউ ইয়র্কের দ্য অ্যামেরিকান কালিনারি ইনস্টিটিউটের কষ্টিপাথরে ঘষে যাত্রা শুরু।

এতই জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর বই কিচেন কনফিডেনশিয়াল যে, ২০০৩-২০০৫ ফক্স টিভি একই নামে একটি সিটকম প্রযোজনা করে। ২০০২ থেকেই বৌরদেন তাঁর অদ্ভুত এবং আনক্যানি রান্নার ইন্সটিংকট নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। সঙ্গে টিভি ক্যামেরা। প্রথমে আ কুকস ট্যুর, তারপর নো রিজার্ভেশন, দ্য লে ওভার আর যেটি শেষ দিন পর্যন্তও চলছিল পার্টস আননোন।

আসলে কুকিং শো তো সকলেই করে। বৌরদেন তাঁর দর্শন নিয়ে এসেছিলেন কুকিং শোয়ের একটি চরিত্র হিসাবে।সেই দর্শন, যা তাঁকে আইসল্যান্ডের পচা হাঙরের ডিশ ‘কায়েস্তুর হাকারি’ চেখে দেখতেও চোখের পাতা ফেলতে দেয় না। অথবা পেরিপেরি প্রতিযোগিতায় কচকচ করে লঙ্কা চিবিয়ে চোখের পাতা ভাসিয়ে দিতেও কুণ্ঠা বোধ করায় না।

কাঁচা বাজার থেকে কেটেকুটে বেটেবুটে ছেঁটেছুঁটে কড়াইতে চেপে বিভিন্ন টেকনিকের মাধ্যমে যে বস্তুটি আপনার লালা উদগীরণ করায় তার সঙ্গে শুধু ব্যাকরণই থাকে না। থাকে আবেগ, গোদা বাংলায় যাকে বলে প্যাশন বা ইমোশন। মোজার্টের সিম্ফনি বা মদিগলিয়ানির তুলির টানে এই আবেগই নিজের ক্ষমতা জাহির করে। বৌরদেনও সেইরকম। বিশ্বের রান্নাকে নিজের রং-তুলির টানে ইজেলে তুলে আনতেন এক অসম্ভব অনায়াস দক্ষতায়।

আয়ু ভরে ওঠে রক্তে, বিরক্তে… ]

আসুন, ওঁর দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হই, ওঁরই কিছু মন্তব্যের মাধ্যমেঃ

“মানুষের জীবনে যে কোনও সত্যিকারের না ভোলার মতো কোন খাদ্যের ক্ষেত্রে উপলক্ষ এবং স্মৃতিশক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে”।

“জীবনের গল্প খুবই জটিল। প্রতিটি পদক্ষেপে সূক্ষ্ম প্রভেদ, অসন্তুষ্টি আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আমি কী বিশ্বাস করি, উত্তর হবে সংশয়ের উপর আমার বিশ্বাস সব থেকে বেশি। আমরা জীবনকে সমস্যাসংকুল করে ফেলি শুধুমাত্র অতিরিক্ত সরলীকরণের চক্করেই...”

“সাধারণ রন্ধনের দক্ষতা আশীর্বাদের মতো। আমি মনে করি, পৃথিবীর সকল পুরুষ ও নারীর নিজেকে এবং আশেপাশের মানুষজনকে খাওয়াবার মতো রাঁধার দক্ষতা থাকা উচিত। ঠিক যেভাবে টয়লেট ট্রেনিং, একা একা রাস্তা পার হতে শেখা, বা টাকা পয়সা ঠিক ঠাক ব্যবহার করতে শেখাটা জীবনের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়, তেমনই...”

“পরীক্ষা করার ইচ্ছা, প্রশ্ন করার ইচ্ছা বা নতুন কিছু করার ইচ্ছা না থাকলে আমরা রোবটে পরিণত হব। ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎহীন বোরিং রোবটে!”

“দক্ষতা শেখানো যায়। কিন্তু কোন কিছুতে চরিত্র হয় আপনার আছে অথবা শত চেষ্টাতেও অর্জন করবেন না!”

রান্নার মাঠে চরিত্রকে নিয়ে এসে, আবেগকে নিয়ে এসে হাজার হাজার রন্ধনপটু ও পটীয়সীকে স্বপ্ন দেখতে শেখানোর জন্য অজস্র ধন্যবাদ স্যর।

শেষও করি তাঁরই কথা দিয়ে... “জীবনের চলার পথে, সামান্য কিছু পরিবর্তন করলে, নিজের সামান্য ছাপ রেখে যেতে চাইলে, তার পরিবর্তে জীবন, আপনার উপরও প্রভাব ফেলবে। আপনার উপর, আপনার শরীরের উপর, মনের উপর, হৃদয়ের উপর। প্রতিটি প্রভাবই খুব সুন্দর এবং আর এই সৌন্দর্যই আপনাকে কষ্ট দেবে প্রায়ই। তবুও এই কষ্টটুকু ছাড়া সুন্দরকে উপভোগ করতে পারবেন না আপনি।”

পরের সপ্তাহে নাহয় ফিরে আসব দুধ কেটে ছানা চিজ পনির করার গল্প নিয়ে। তবতক কে লিয়ে আলবিদা!

 

লেখক পরিচিতি: পেশায় আধিকারিক। তবে হাতা-খুন্তি-গামলাতেও তিনি সমান মনোযোগী। রাঁধতে ভালবাসেন, রেঁধে খাওয়াতেও। আরও ভালবাসেন খাওয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। রান্নাবান্না নিয়ে লেখা মানেই স্রেফ রেসিপি নয়, খাদ্যসংস্কৃতির চর্চাও। এই ব্লগ আসলে সেই সফরই। শুধু নয় খানা-পিনা, খাদ্যসংস্কৃতির অলিগলিতে সৌরাংশুর মুসাফিরানা। 

এই লেখকের অন্য ব্লগ

ট্রেন্ডিং