Durga Puja 2026

স্বপ্নাদেশে ডাকাতি করে পুজোর সূচনা, আট পুরুষ পরেও ঐতিহ্য মেনেই উমা আসেন বাতাসপুরে

এখন পরিবারের সদস্যরা পরিশ্রম করে উপার্জনের টাকায় উমার আরাধনা করে থাকেন।

বিপিন পাল
বিপিন পাল

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১৫:৪৬

options
link
স্বপ্নাদেশে ডাকাতি করে পুজোর সূচনা, আট পুরুষ পরেও ঐতিহ্য মেনেই উমা আসেন বাতাসপুরে
দলুই পরিবারের মা দুর্গা। ছবি - সুশান্ত পাল।

একসময় পুজোর অর্থ জোগাড় করতে রাতের অন্ধকারে ডাকাতিতে বেরোতেন পরিবারের পূর্বপুরুষ। আজ সেই দিন নেই। বদলেছে সমাজ, বদলেছে জীবনযাত্রা। কিন্তু প্রায় আট পুরুষ আগে যে বিশ্বাস আর স্বপ্নাদেশকে ঘিরে শুরু হয়েছিল দেবীর আরাধনা, তা আজও একই নিষ্ঠায় ধরে রেখেছে এক পরিবার। বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের বাতাসপুর গ্রামের মা দশভূজার শতাব্দীপ্রাচীন পুজো তাই নিছক ধর্মীয় আচার নয়, এর সঙ্গে মিশে রয়েছে এক দীর্ঘ লোককথা, পারিবারিক ইতিহাস এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়ার কাহিনি।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট পুরুষ আগে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামে বসবাস করতেন মনিরাম দলুই। সেখানেই দেবী দশভূজার আরাধনা শুরু করেন। পরে নানা কারণে পরিবার নিয়ে অজয় নদ পেরিয়ে ময়ূরেশ্বরের বাতাসপুরে এসে গড়ে তোলেন বসতি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মণিকর্ণিকা কাঁদরের কাছেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। কথিত আছে, বাতাসপুরে আসার পর এক শরৎরাতে স্বপ্নে দেবীর দর্শন পান মনিরাম দলুই। সেখানেই দেবীর পুজো শুরু করার নির্দেশ পান তিনি। কিন্তু নতুন জায়গায় পুজো হবে কীভাবে? কোথা থেকে আসবে পুজোর উপকরণ? লোককথা, স্বপ্নে দেবী তাঁকে মণিকর্ণিকা কাঁদর থেকে একটি পাটা তুলে আনতে বলেন। সেই পাটাকেই বেদী করে পুজো শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

কিন্তু পুজোর অর্থ কীভাবে আসবে? এর পিছনেও আছে প্রচলিত কাহিনি। ইতিহাস বলছে, দেবীর নির্দেশেই পুজোর খরচ জোগাড় করতে ডাকাতির পথ বেছে নিয়েছিলেন মনিরাম। সেই অর্থে বাতাসপুরে একটি ছোট মাটির কুঠুরিতে শুরু হয় মা দশভূজার আরাধনা। পরবর্তী সময়ে বংশপরম্পরায় পুজোর আগে ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহের সেই প্রথাও চলে বলে স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। এখানেই শেষ নয়, এই পুজোকে ঘিরে আরও একটি রোমাঞ্চকর কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, একবার একটি ব্যাঙ্কে ডাকাতির ঘটনায় মনিরাম দলুইয়ের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হলে শুনানির সময় একটি চিল এসে তাঁর মাথায় বসেছিল বলে কথিত রয়েছে। সেই সময় বিচারকের সামনে নিজের কৃতকর্মের কারণ হিসেবে দেবীর পুজোর কথা জানিয়েছিলেন মনিরাম। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, পরবর্তী তদন্তে পুজোর জন্য অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মুক্তি পান।

Advertisement
ধীরে ধীরে চিন্ময়ী রূপে সেজে উঠছেন উমা। ছবি – সুশান্ত পাল

তবে সময়ের সঙ্গে সবটাই এখন ইতিহাস। সমাজ বদলেছে, বদলেছে মূল্যবোধও। বহু আগেই বন্ধ হয়েছে পুজোর অর্থ সংগ্রহে চুরি-ডাকাতির প্রথা। এখন পরিবারের সদস্যরা পরিশ্রম করে উপার্জনের টাকায় উমার আরাধনা করে থাকেন। চাষবাস, বেতের ব্যবসা এবং দিনমজুরির রোজগার থেকে অর্থ জমিয়ে প্রতি বছর পুজোর আয়োজন করা হয়। বাতাসপুরের এই পুজোর বর্তমান দায়িত্বে রয়েছেন মনিরাম দলুইয়ের বংশধর ভবতারণ দলুই, বংশী দলুই এবং জয়দেব দলুই। তিন ভাই মিলে বংশের পুরনো পুজোর রীতি ধরে রেখেছেন।

এই বাড়িতেই পুজো হয় উমার। ছবি – সুশান্ত পাল

পুজোর মূল উদ্যোক্তা ভবতারণ দলুই জানান, ”আমাদের পূর্বপুরুষ মনিরাম দলুই বর্ধমানের অজয় নদীর তীরে বসবাস করতেন। পারিবারিক কারণে তাঁরা বাতাসপুরে চলে আসেন। গ্রামে আর ফিরে যেতে পারেননি। তারপর ঠিক দুর্গাপুজোর আগেই মনিরাম দলুইকে মা দুর্গার স্বপ্নে দেখা দেয়। এবং বলেন, তিনি পুজো না করলে মা উপবাসে যাবেন। মনিরাম তখন মা দুর্গাকে জানান, এখানে তিনি খালি হাত-পায়ে এসেছেন, কীভাবে পুজো করবেন।” ভবতারণ দলুই এই প্রসঙ্গে জানান, মা সব পথ বলে দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, পাশেই একটি মণিকর্ণিকা কাঁদর আছে, সেখানে ডুব দিলেই একটি পাটা ভেসে উঠবে, সেটাতেই হবে পুজো। তখন মনিরাম বলেছিলেন, পুজো করতে খরচ যোগাবে কীভাবে। উত্তরে মা দুর্গা জানিয়েছিলেন, ডাকাতি করবি। সেই থেকেই বংশপরম্পরায় ডাকাতি করে উপার্জিত অর্থ দিয়েই আমাদের পুজো চলে আসছে। কিন্তু বর্তমানে সেই চুরি ডাকাতি আমরা করি না। বেতের ব্যবসা ও চাষবাস করে অর্জিত অর্থ দিয়েই আমরা তিন ভাই মিলে সেই পুজো ধরে রেখেছি। আগামী দিনেও আমাদের ছেলে মেয়েরা এই পুজো চালিয়ে যাবেন।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.