সোশাল মিডিয়ার অধিক ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল: ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’। এর বিপ্রতীপ ধারণাটি হল ‘জোমো’ বা ‘জয় অফ মিসিং আউট’।
‘ডিজিটাল ডিটক্স’ প্রক্রিয়া দ্বিতীয় কণ্ঠস্বরটি শুনতে সাহায্য করে। এটি প্রযুক্তি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সচেতন অনুশীলন। লিখছেন উৎপল অধিকারী।
স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়; আমাদের কাজ, বিনোদন, সামাজিকতা, খবর, কেনাকাটা এমনকী অবসর কাটানোরও প্রধান মাধ্যম। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমে ফোন দেখা, এবং ঘুমতে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সামাজিক মাধ্যম স্ক্রল করা– এ অভ্যাস বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অতিরিক্ত ডিজিটাল সংযোগ কখনও কখনও আমাদের নিজের জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই বিচ্ছিন্নতার গুরুত্বপূর্ণ মানসিক প্রকাশ ‘ফোমো’– ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’। অর্থাৎ, কোনও কিছু থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক, কিছু একটা ‘মিস’ করে যাওয়ার ভয়। অন্যরা কোথায় গেল, কী করল, কী কিনল, কার সঙ্গে দেখা করল, কোন অনুষ্ঠানে গেল– এসব ক্রমাগত দেখতে দেখতে মনে হতে পারে: আমার জীবন যেন তুলনায় অনেকাংশেই ‘কম’ (something missing)।
ফোমো-র বিপরীত ধারণাটি হল: ‘জোমো’– ‘জয় অফ মিসিং আউট’। অর্থাৎ, সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত না-থেকেও নিজের জীবনে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার স্বাধীনতা। এই দু’-ধরনের মানসিকতার মাঝখানে একটি কার্যকর সেতু হতে পারে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল ব্যবহার কমিয়ে বাস্তব জীবন, কাছের মানুষ, প্রকৃতি, চিন্তা ও নিজের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন।
নতুন খবর, ট্রেন্ড, অনলাইন আলোচনা, অফার, বিনোদন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
ফোমো নতুন নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রবণতাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। আগে কেউ কোথাও বেড়াতে গেলে, তার খবর কয়েক দিন পরে জানা যেত। এখন মুহূর্তে মধ্যে তার ছবি, ভিডিও, স্টোরি ও পোস্ট আমাদের চোখের সামনে। অন্যের জীবনের নির্বাচিত আনন্দের মুহূর্তগুলি যখন সারাক্ষণ আমাদের সামনে উপস্থিত থাকে, তখন নিজের স্বাভাবিক দিনটিকেও অনেক সময় নিষ্প্রভ মনে হয়। সমস্যা হল, সামাজিক মাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের সম্পূর্ণ জীবন দেখি না; দেখি তার বেছে নেওয়া কিছু মুহূর্ত, প্রতিসরিত মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তগুলির সঙ্গে আমরা নিজেদের বাস্তবকে তুলনা করি। অন্যের ‘হাইলাইট’ বনাম নিজের ‘ব্যাকস্টেজ’– এই অসম তুলনাই অসন্তোষ বাড়াতে পারে।

ফোমো শুধু সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন খবর, ট্রেন্ড, অনলাইন আলোচনা, অফার, বিনোদন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। মনে হয়: আমি যদি এখন ফোনটা না দেখি, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস হয়ে যাবে। আমি যদি ‘এটা’ না-কিনি, বা ‘ওটা’ না-খাই, তাহলে পরে আর পাওয়াই যাবে না হয়তো! এর ফলে আদতে তৈরি হযে যায় একটি চক্র: নোটিফিকেশন, কৌতূহল, ফোন দেখা, নতুন তথ্য, আবার কৌতূহল। ধীরে ধীরে মনোযোগ ভেঙে যায় এবং একাগ্রভাবে কোনও কাজ বা সম্পর্কের মধ্যে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফোনের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমালে একটানা কোনো কাজের দিকে মন দেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
ফোমোর বিপরীতে রয়েছে জোমো। এর মূল বক্তব্য, আগেই বলেছি, সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকা জরুরি নয়। জোমো বলতে বোঝায় নিজের সময় ও মনোযোগ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া, বন্ধুরা কোথাও গেলেও আমি দুঃখ পাব না। সবাই নতুন ট্রেন্ড অনুসরণ করছে বলে আমাকেও করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই কোনও। ফোনের প্রতিটি নোটিফিকেশনের উত্তর এক্ষুনি এই মুহূর্তে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ফোন পাশে রেখে বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, একা হঁাটা, জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখা, গাছের নিচে বসে থাকা কিংবা নিঃশব্দে নিজের চিন্তার সঙ্গে থাক– সবই জোমোর অভিজ্ঞতা বলয়ের অংশ হতে পারে। এখানে ‘মিস করা’ আর ‘ক্ষতি’ নয়; ‘না’ বলতে পারা বরং আনন্দের। সবকিছুকে অনুসরণ না করার মধ্যেই নিজের জীবনের জন্য জায়গা তৈরি হয়।
‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর অর্থ: প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা নয়। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কটিতে সচেতনতা ও ভারসাম্য আনা। কেউ কয়েক ঘণ্টা, বা একটি দিন, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময় পর্বের জন্য সামাজিক মাধ্যম থেকে বিরতি নিয়ে ডিজিটাল ডিটক্স প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারেন। এর মাধ্যমে নিজের হৃত মনোযোগের পুনরুদ্ধার বহুলাংশে সফল হয়। ক্রমাগত নোটিফিকেশন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্য মনকে বারবার এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে টেনে নিয়ে যায়। ফোনের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমালে একটানা কোনো কাজের দিকে মন দেওয়ার সুযোগ বাড়ে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বিরতি তুলনার চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সামাজিক মাধ্যম থেকে সাময়িক দূরত্ব তৈরি হলে অন্যের জীবন সম্পর্কে অবিরাম আপডেট পাওয়ার প্রবাহ কমে যায়। তখন নিজের বাস্তব জীবনকে তার নিজস্ব মানদণ্ডে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রথমে নিজের ডিজিটাল অভ্যাসকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। দিনে কতবার ফোন হাতে নিচ্ছি?
তৃতীয়ত, এটি ঘুমের অভ্যাসের জন্য সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের ঠিক আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস কমানো অনেকের জন্য ঘুমের পরিবেশ উন্নত করতে পারে। তাই রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ফোন দূরে রাখা একটি বাস্তবসম্মত ডিজিটাল ডিটক্স অভ্যাস। চতুর্থত, ডিজিটাল ডিটক্স মানবিক সম্পর্ককে গভীর করার সুযোগ দেয়। একই ঘরে বসে প্রত্যেকে নিজের ফোনে ব্যস্ত থাকলে শারীরিক নৈকট্য থাকলেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। খাবার টেবিলে ফোন না রাখা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় ফোন সরিয়ে রাখা ইত্যাদি ছোট এই অভ্যাসগুলিই সম্পর্কের গুণমান বাড়াতে পারে।
এসব অবশ্য এক দিনে হয় না। প্রথমে নিজের ডিজিটাল অভ্যাসকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। দিনে কতবার ফোন হাতে নিচ্ছি? কোন অ্যাপ সবচেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে? নোটিফিকেশন না দেখলে কি অস্বস্তি হচ্ছে? নির্দিষ্ট কাজের মাঝেও কি অকারণে ফোন খুলছি? এরপর অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা যেতে পারে। সব অ্যাপের প্রতিটি আপডেট জানার প্রয়োজন নেই। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করাও কার্যকর হতে পারে। দিনের কিছু সময়কে ‘ফোন-মুক্ত অঞ্চল’ করা যায়। যেমন খাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময়, পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের সময় অথবা ঘুমের আগে এক ঘণ্টা। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল বিকল্প আনন্দ তৈরি করা। শুধু ফোন কেড়ে নিলে শূন্যতা তৈরি হবে। সেই জায়গায় বই, গান, ব্যায়াম, বাগান করা, ছবি আঁকা, রান্না, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা কিংবা সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলার মতো কর্মকাণ্ড যুক্ত করতে হবে।
ফোমো আমাদের বলে ‘সবকিছু জানতে হবে, সব জায়গায় থাকতে হবে, কিছুই বাদ দেওয়া যাবে না।’ জোমো তার বিপরীতে শান্তভাবে বলে যে ‘সবকিছু আমার জন্য নয়, আর সবকিছু জানা বা পাওয়া জরুরিও নয়।’ ডিজিটাল ডিটক্স সেই দ্বিতীয় কণ্ঠস্বরটি শুনতে সাহায্য করে। এটি প্রযুক্তি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সচেতন অনুশীলন।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
দিল্লিতে ফের সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক ‘আরশোলা’দের, প্রতিবাদের নামে বিক্ষোভের ছক!
-
‘দাদাগিরি’র মঞ্চে রুক্মিণী, শুভশ্রী আর ইধিকা পালকে একসঙ্গে চাইবেন? দেব বললেন…
-
বিপজ্জনক পথকুকুরদের ইউথেনেশিয়া! ‘সুপ্রিম’ নির্দেশে নয়া পদক্ষেপ কেরল সরকারের
-
ফেসবুকে নাটোরের তরুণীর সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম! বাংলায় আসতেই বিয়েতে ‘না’ প্রেমিকের, তারপর…
-
সারা সপ্তাহের ক্লান্তি কাটছে না সপ্তাহান্তের দেড়দিনের ছুটিতে? মেনে চলুন এই ৪ পদ্ধতি