দেখতে দেখতে আরও একটা শীতকাল দরজায় উঁকি দিচ্ছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো বরফ পড়া শুরু হয়ে যাবে মস্কো-সহ রাশিয়ার নানা অঞ্চলে। সেই সঙ্গেই তার কিছুদিন পর থেকেই ধীরে ধীরে শৈত্যের কবলে পড়বে ইউক্রেনও। আর এহেন পরিস্থিতিতে আরও একবার প্রতিকূলতার মাত্রা আরও একবার বাড়তে চলেছে রুশ সৈন্যদের। সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের। নিষ্পত্তি কবে, আদৌ কখনও হবে কিনা, এমন অবসাদ ক্রমেই গ্রাস করছে তাদের। আর এমনই এক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রুশদের পাশে দাঁড়াতে উপস্থিত ছয় শতক আগে মৃত রাজপুত্র!
আরও পড়ুন:
তাঁর নাম দিমিত্রি দনস্কি। সেই কবে, ১৩৮০ সালে কুলিকোভোর যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন হাতের তরবারি ঝনঝনানিতে শত্রুকে চূর্ণ করে। আজও গোটা রাশিয়া যে জয়কে উদযাপন করে। এতদিনের পুরনো ইতিহাস এতদিনে প্রায় মিথে পর্যবসিত। সেই কিংবদন্তি রাজপুত্রই কিনা এবার ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধেও শামিল হয়েছেন! ব্যাপারটা কী? আসলে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই রাজপুত্রের ডান হাতের অংশ পাঠানো হয়েছে ফ্রন্টে! রুশ অর্থোডক্স চার্চের সামরিক বিষয়ক বিভাগ, যারা চার্চের ধর্মীয় নেতৃত্বেরই অংশ, জানিয়েছে, ‘সন্ত সেনাপতি’ এবার রুশ সৈন্যদের ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ অবস্থান করবেন রণাঙ্গনে। বলাই বাহুল্য, ‘অদৃশ্য’ হয়ে!

এমন একটা বিষয় ঘিরে কৌতূহল জাগাটাই স্বাভাবিক? রক্তমাংসের মানুষের লড়াইয়ে কেন হঠাৎ প্রয়াত যোদ্ধার ‘পবিত্র’ অবশেষকে আনার প্রয়োজন পড়ল? আসলে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে পড়েছে রাশিয়া। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টের দাবি, ক্রমান্বয়ে যুদ্ধ এবং প্রভূত সেনার শহিদ হওয়ার ঘটনায় রুশ সৈন্যরা চরম শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির মুখোমুখি হচ্ছে। ভিতরে ভিতরে ক্রমেই হতোদ্যম হয়ে পড়ছে তারা। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থানকে ‘ন্যায্য’ ও ‘ঐশ্বরিক অনুমোদনপ্রাপ্ত’ হিসেবে তুলে ধরতে ধর্মীয় প্রতীকসহ সম্ভাব্য সব উপায় কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে রুশ প্রশাসন। আর এর ফলে ক্রেমলিন ও রুশ অর্থোডক্স চার্চের মধ্যকার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের এক পরিচালক ও ধর্মবিষয়ক গবেষক সের্গেই চাপনিন বলছেন, “চার্চ ও রাষ্ট্র কার্যত একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে এদের মধ্যে আর কোনও পার্থক্য করাই দুষ্কর। আমার মতে এই ঘনিষ্ঠতা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।” তবে তিনি যাই বলুন না কেন, অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মে সৈন্যদের কাছে পবিত্র ধর্মীয় নিদর্শন তথা রেলিক পাঠানোর প্রথাটি কিন্তু দীর্ঘদিনের। নিঃসন্দেহে সেটাই এখন এক বিশেষ আকার ধারণ করেছে। ‘মস্কো প্যাট্রিয়ার্কেট’-এর প্রকাশনা সংস্থায় কর্মরত চাপনিন। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, “উনি (দিমিত্রি দনস্কি) নিজে মোটেই আগ্রাসী ছিলেন না, বরং ছিলেন মাতৃভূমির রক্ষক।” সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি হল, “এটি দেখানো অত্যন্ত জরুরি যে রাশিয়া কোনও আগ্রাসী শক্তি নয়, বরং আমরা নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করছি।”

আসলে রাশিয়া যুদ্ধ করার সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটা ধারণা ছিল, এই যুদ্ধ শেষ হবে দ্রুত। কিন্তু যত সময় এগিয়েছে পরিস্থিতি ততই জটিল হয়েছে। ইউক্রেনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে পশ্চিমি বিশ্ব। ফলে রাশিয়ার যুদ্ধবিজয় ক্রমশই দূরবর্তী হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল তীব্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। তবে সময় যত গড়িয়েছে গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, বদলেছে যুদ্ধের কৌশল। সম্মুখ সমরের বদলে প্রযুক্তি, বুদ্ধিমতা ও ফাঁদ পেতে শিকার ধরার মতো অভিনব সব পদ্ধতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করেছে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়াকেও রণকৌশল নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে। যুদ্ধের মাঝেই নিজের অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেছে রাশিয়া। শুরু হয়েছে একের পর এক মারণাস্ত্রের পরীক্ষা। কিন্তু কেবলই তুণে তির থাকলেই তো হল না। যে হাত ধনুকের ছিলায় শক্তিপ্রয়োগ করবে তার নৈপুণ্য, তার আত্মবিশ্বাস টলে গেলে আর যুদ্ধে জেতা যাবে না। আর সেই কারণেই হতোদ্যম হয়ে পড়া রুশ সেনার পাশে দিমিত্রি দনস্কির ‘পবিত্র’ উপস্থিতি। যে উপস্থিতি সৈন্যদের যুদ্ধে জেতাবে!
তবে ইউক্রেন যুদ্ধে ‘সন্ত যোদ্ধা’ দনস্কিই প্রথম নন। চলতি বছরের শুরুর দিকে রুশ সামরিক গৌরবের প্রতীক ও মধ্যযুগীয় শাসক প্রিন্স আলেকজান্ডার নেভস্কির পবিত্র অবশেষও সৈন্যদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আবার দনস্কির দেহাবশেষ পাঠানোর সময়টাও কী অদ্ভুত! নেভস্কির পবিত্র অবশেষ নাকি হারিয়ে গেছে, এমন একটা গুঞ্জন রয়েছে। আর তারপরই গত মাসে ক্রেমলিনের আর্চ এঞ্জেল ক্যাথিড্রালে সংস্কারকাজ চলাকালীন দনস্কির দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেল! কিন্তু আদৌ কি এমন ‘সন্ত যোদ্ধা’র স্পর্শে সৈন্যরা উজ্জ্বীবিত হবেন। রক্তমাংসের বাস্তবতার সামনে এমন ‘বিশ্বাস’ কি যথেষ্ট হতে পারে আদৌ?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে কথা বলার সময় বহু সৈন্যই জানিয়েছেন, এই পবিত্র নিদর্শনগুলিকে বিপুল অর্থবহ সহায়তা হিসেবে দেখছেন তা তাঁরা। পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলের এক রুশ সৈন্যের মতে, যুদ্ধে শহিদ তরুণ সৈন্যদের মায়েদের কাছেই এগুলির প্রয়োজনীয়তা বেশি। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন যুদ্ধের গনগনে বাস্তবতার মোকাবিলা বাস্তবসম্মত উপায়েই করা সম্ভব। দিনের পর দিন বাড়ি, পরিবার থেকে দূরে মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যে বেঁচে থাকা সৈন্যদের কাছে এক ‘সন্ত যোদ্ধা’ বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারবেন না।
সর্বশেষ খবর
-
নিজেকে রাজ্য পুলিশের ডিএসপি পরিচয় দিয়ে ৫ লক্ষ টাকা তোলাবাজির চেষ্টা, গ্রেপ্তার প্রতারক
-
চূড়ান্ত হয়ে গেল আগরকরের উত্তরসূরি! গম্ভীরের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে চার নির্বাচক
-
রেজিনগরে ঋত-তৃণমূলের ভোটের প্রচারে লজেন্স কুড়োতে গিয়ে দুর্ঘটনা! মৃত ৬ বছরের শিশু
-
প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ইন্দ্রনীল সেনের বাড়ি থেকে বেরল ইডি, আগামিকাল তলব প্রাক্তন মন্ত্রীকে
-
‘ইন্ডির পিণ্ডি চটকে গিয়েছে, দিমাগি নকশালদের পরামর্শ দিতে দিল্লিতে মমতা’, বিস্ফোরক শুভেন্দু