হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হওয়া রোগীকে বাঁচিয়ে নজির বাঙুরের

শিবঠাকুরের কৃপাতেই ফিরেছে স্বামী, বিশ্বাস রোগীর স্ত্রীর।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮, ১০:৩৯

options
link
হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হওয়া রোগীকে বাঁচিয়ে নজির বাঙুরের

গৌতম ব্রহ্ম: সারা শরীর নীল হয়ে গিয়েছে। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে বিন্দুমাত্র অক্সিজেন নেই শরীরে। চিকিৎসকরাও বিস্ময়ে হতবাক। এ হেন এক রোগীকে বাঁচিয়ে তুলে তাঁরা একটাই কথা বলছেন, এ মিরাকেলের থেকেও বেশি কিছু। কোনও ব্যাখ্যা নেই।

Advertisement

বিশ্বাস না হলে আবার পড়ুন। ১ শতাংশ অক্সিজেন স্যাচুরেশনে পৌঁছেও ফিরে এলেন বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক। যা বিশ্বাসই করতে পারছেন না ডাক্তারবাবুদের একাংশ। এমার্জেন্সি থেকে সুকুমার হালদারকে যখন আইটিইউ-তে নিয়ে আসা হয় তখন তাঁর শ্বাসনালি বা ট্র‌্যাকিয়া প্রায় বন্ধ। শ্বাস বেরোচ্ছেও না, ঢুকছেও না। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৬০ শতাংশ। দ্রুতগতিতে অক্সিজেনের মাত্র কমছে। একটা সময় তা পৌঁছে গেল একে। হ্যাঁ, পালস অক্সিমিটার দেখে চমকে উঠেছিলেন সিসিইউ-র ডাক্তারবাবুরা। মাত্র ১ শতাংশ ‘অক্সিজেন স্যাচুরেশন’। সারা শরীর নীল হয়ে গিয়েছে। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে ‘সায়ানোজড’। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৬০ শতাংশের কম হলেই রোগীকে বাঁচানো মুশকিল হয়। সেখানে একজন রোগী মাত্র ১ শতাংশ অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে!

Advertisement

এখানেই শেষ নয়। অক্সিজেনের অভাবে রোগীর হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফুসফুস তো আগেই বিকল ছিল। আর মিনিটখানেক এই অবস্থা চললেই ‘ব্রেন ডেথ’ হত রোগীর। এই পরিস্থিতি থেকে সুকুমারকে বাঁচিয়ে তুলল টালিগঞ্জের এম আর বাঙুর হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট। নয়া নজির তৈরি করল চিকিৎসাবিজ্ঞানে। রোগী এখন বিপন্মুক্ত। সিসিইউ থেকে জেনারেল বেডে।

Advertisement

[বিটকয়েন পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা, পুলিশের জালে ৬ অভিযুক্ত]

সুকুমারের বাড়ি কাকদ্বীপের চণ্ডীপুর রোডে। গলায় ক্যানসার। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে বলে ‘ল্যারিঙ্গিয়াল কার্সিনোমা’। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন চলেছে। অস্ত্রোপচারও হয়েছে। অস্ত্রোপচারের জায়গাতে ফের সংক্রমণ। দু’দিন ধরে শ্বাসকষ্ট। কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতাল থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি যখন টালিগঞ্জের এম আর বাঙুর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় সুকুমারকে তখন তাঁর হাঁপ উঠে গিয়েছে (গ্যাসপিং)।

ইএনটি সার্জন ইউ কে মজুমদার রোগীকে দেখেই সিসিইউ-তে রেফার করেন। একতলার এমার্জেন্সি থেকে দোতলার সিসিইউ-তে আসতে আসতেই রোগীর অবস্থার অবনতি হয়। শরীর নীল হতে থাকে। সিসিইউতে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মানসকুমার নাথ প্রথমে সুকুমারকে এন্ডোট্র‌্যাকিয়াল টিউব পরানোর চেষ্টা করেন। কিন্ত ট্র‌্যাকিয়ার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে জরুরি ভিত্তিতে সিসিইউ-তে রেখেই রোগীর ট্র‌্যাকিওস্টোমি করা হয়। দেওয়া হয় ভেন্টিলেশনে। ততক্ষণে রোগীর হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। নীল হয়ে যাওয়া শরীরে ক্ষীণ স্পন্দন। সর্বোপরি পালস অক্সিমিটার রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখাচ্ছে ১ শতাংশ।

মানসবাবু যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সিপিআর দিয়ে সুকুমারের হৃদযন্ত্র চালু করেন। বাকিটা রূপকথার মতো। ভেন্টিলেশন থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রোগীকে এইডিইউ-তে সরানো হয়। মঙ্গলবার দেওয়া হয় জেনারেল বেডে। সুকুমারের স্ত্রী করুণা হালদার জানিয়েছেন, ‘শিবঠাকুরের কৃপায় ডাক্তারবাবুরা যমের দুয়ার থেকে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। আর কী বলব?’

[বিধবা মহিলার নলিকাটা দেহ উদ্ধার, চাঞ্চল্য মেটিয়াবুরুজে]

যমের দুয়ারই বটে। সুকুমারের ‘কেস’ শুনে ডাক্তারবাবুরাই চমকে উঠছেন। বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ রাজা ধর জানিয়েছেন, ‘পালস অক্সিমিটারে ১৫-২০ শতাংশের বেশি অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপা মুশকিল। আর এখানে ১ শতাংশে নেমে যাওয়া একটি মানুষকে বাঙুরের চিকিৎসকরা বাঁচিয়ে তুললেন। এটা অবিশ্বাস্য!’ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অরিন্দম বিশ্বাসও জানিয়েছেন, ‘আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস ৬০-৭০ শতাংশ এবং পেরিফেরাল ব্লাড গ্যাস ৮০-৯০ শতাংশের নিচে নামলেই রোগীকে বাঁচানো মুশকিল। ১ শতাংশ অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব! কেসটি নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত।” বাঙুরের ডাক্তাররা অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের পালস অক্সিমিটারে কোনও ভুল নেই। তাঁদের যন্ত্র ১ শতাংশ অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপতে পারে। যে কেউ এসে পরীক্ষা করে যেতে পারেন। চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী একটি বহুজাতিক সংস্থার আধিকারিক সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘১ শতাংশ রিডিং আসা মানে তো রোগী মারা গিয়েছেন!’

সুস্থ মানুষের শরীরে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৭-১০০ শতাংশ। সিওপিডি রোগীদের মধ্যে কম থাকে। ৬০ শতাংশের নিচে চলে গেলে রোগীকে বাঁচানো মুশকিল। কিন্তু এক্ষেত্রে রোগী ১ শতাংশে পৌঁছেও বেঁচে ফিরেছে।

[লাইনে বেআইনিভাবে শুটিং করলেও পদক্ষেপে যাচ্ছে না রেল]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.