Taslima Nasrin

‘বাম জমানায় অন্যায় হয়েছে’, বাংলায় তসলিমাকে স্বাগত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-সহ বাংলার সারস্বত সমাজের

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতোই পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার স্থায়ী ঠিকানা চান বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অংশুমান কর।

কিশোর ঘোষ
কিশোর ঘোষ

শেষ আপডেট: জুলাই ১৪, ২০২৬, ২৩:৫৩

options
link
‘বাম জমানায় অন্যায় হয়েছে’, বাংলায় তসলিমাকে স্বাগত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-সহ বাংলার সারস্বত সমাজের
১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে সাহিত্যসভায় যোগ দেবেন তসলিমা নাসরিন।

সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক তিনি। সেই মানুষটাই ‘সাদাকে সাদা, কালোকে কালো’ বলার অপরাধে বাংলা ও বাঙালির সংসর্গ থেকে নির্বাসিত! তিনি ‘লজ্জা’ নামের উপন্যাস লিখেছিলেন। তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে হাতেকলমে সেই লজ্জার কাজ দুই দফায় করেছে বাংলাদেশ ও অতীতের পশ্চিমবঙ্গ। ২০০৭ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁকে কলকাতা থেকে বিতাড়িত করা হয় মৌলবাদীদের মন রাখতে। অবশেষে বদলের বাংলায় পাপক্ষালন। ২০ বছর পর বাংলার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)!

Advertisement

আগামী ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ বিরোধী এক সাহিত্যসভায় যোগ দেবেন তিনি। পাঠ করবেন কবিতা। ফেসবুক পোস্টে এই সুখবর জানিয়েছেন লেখিকা নিজেই। তসলিমাই তো লিখেছিলেন ‘ফেরা’! দুই দশক পর তাঁর ফেরার খবর খুশি বঙ্গীয় সারস্বত সমাজ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শহর কলকাতায় তাঁকে স্বাগত জানালেন বর্ষীয়ান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কবি অংশুমান কর। ঠিক কী বলছেন তাঁরা?

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় মনে করেন, খোলামেলা কথা বলেন বলেই তসলিমাকে পছন্দ করে না নীতিপুলিশ সমাজ। ‘ঘুণপোকা’র স্রষ্টা পশ্চিমবঙ্গে স্বাগত জানাচ্ছেন বিতর্কিত লেখিকাকে। তিনি বলেন, “অনেক দিন ধরে স্বদেশ থেকে নির্বাসিত তিনি। বাংলাদেশকে অসম্ভব ভালোবাসেন। যেহেতু বিতর্কিত চরিত্র, তাই নিজের দেশে থাকতে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের পর তাঁর ভালোবাসার জায়গা হল আমাদের শহর কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ। যদিও সেখানেও তাঁর ফেরা হয়নি দীর্ঘদিন। যদিও তসলিমার মন পড়ে থাকে এখানে। আসলে পশ্চিমবঙ্গের যে সাংস্কৃতিক পরিবেশ সেটা তাঁর খুবই পছন্দের। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ওঁকে চিনি। ওঁর প্রতি আমার একটা স্নেহ, ভালোবাসা তো আছেই। তসলিমা (Taslima Nasrin) পশ্চিমবঙ্গে আসুন, আমি চাই। এখানেই যদি তাঁর একটা স্থানীয় ঠিকানা হত, তাহলে সে খুশি হত, আমরাও খুশি হতাম। কিন্তু তিনি স্পষ্ট বক্তা, খোলামেলা কথা বলেন বলেই সামাজিক নীতিপুলিশের অপছন্দের। যাই হোক, তিনি যে ফের পশ্চিমবঙ্গে আসছেন, এটা ভালো খবর। ওঁর সঙ্গে দেখা হলে ভালো লাগবে।”

Advertisement

২০০৭ সালে তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের প্রকাশ ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। সেসময় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

পশ্চিবঙ্গই যেন তসলিমা নাসরিনের স্থায়ী ঠিকানা হয়, সেই বিষয়ে নতুন সরকারকে অনুরোধ করলেন শীর্ষেন্দু। তিনি বলেন, “তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় থাকার ব্যবস্থাটা যদি নতুন সরকার বিবেচনা করেন, তাহলে খুব ভালো হয়। অবশ্যই উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা-সহ। অনেকবার এই বিষয়ে তিনি আবেদন নিবেদনও করেছেন। কিন্তু কর্ণপাত করা হয়নি। এটা স্বাভাবিক যে, দিল্লির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ তাঁর অনেক বেশি প্রিয়। এখানে বাঙালি সমাজ রয়েছে, পাঠক-পাঠিকা রয়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতে কলকাতাতেই তাঁর একটা স্থায়ী ঠিকানা হবে।”

২০০৭ সালে তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের প্রকাশ ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। সেসময় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর নিজস্ব বৃত্তের অর্থাৎ বামমনস্ক সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তসলিমা নাসরিনের বইটির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এইসঙ্গে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা হয় তাঁকে। যদিও বামমনস্ক কবি হিসাবে পরিচিত অংশুমান কর পালাবদলের পশ্চিমবঙ্গে তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত জানাচ্ছেন।

Shirshendu Mukhopadhyay and other Bengali author welcoming Taslima Nasrin in Bengal
কবি অংশুমান কর।

বাম জমানায় অন্যায় হয়েছে বলেও মত দিচ্ছেন অংশুমান। তিনি বলেন, “আমি আগেও বলেছি, আবারও এক কথা বলব। আমি লেখকের চূড়ান্ত স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। বাম জমানায় অত্যন্ত অন্যায় কাজ হয়েছিল। তারপর তৃণমূল জমানায় তসলিমা নাসরিনকে আসতে দেওয়া হয়নি। তিনি সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক। আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি এই সরকারকে, যে তারা তসলিমাকে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন, তিনি একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। নতুন সরকার আসার পর এর চেয়ে ভালো খবর আমি পাইনি। এখনও পর্যন্ত এই সরকার যা যা করেছে, তার মধ্যে এই কাজটাকেই আমি সবচেয়ে বেশি সাধুবাদ জানাচ্ছি। আমি চিরকাল লেখকের স্বাধীনতার পক্ষে থেকেছি, ভবিষ্য়তেও থাকব।”

তসলিমা ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পোস্টে সাহিত্যিককে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্যোক্তা সেক্যুলার মিশন, এইচআরবিএফএফ।

শীর্ষেন্দুর সুরে সুর মিলিয়ে তসলিমার পশ্চিমবঙ্গে থাকার বিষয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ করলেন অংশুমান। তিনি বলেন, “তসলিমা বহুবার কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে থাকার জন্য আবেদন-নিবেদন করেছেন। সেটাই স্বাভাবিক, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। লেখকের জীবন যদি নিজের ভাষার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত না হয়, তবে সেই ভাষায় সাহিত্য রচনা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, আবেদন রাখব সরকারে কাছে— একজন বাঙালি হিসাবে তসলিমার জন্য যেন পশ্চিবঙ্গে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।”

কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানোর বিষয়ে যাঁরা বারবার সওয়াল করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রতিক্রিয়া, “তসলিমা নাসরিন যেদিন কলকাতা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, দলমত নির্বিশেষে সেই দিনটা ছিল লজ্জার এবং যন্ত্রণার দিন। আমি সেই সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই ঘটনার, তৎকালীন সরকারের ভূমিকার নিন্দা করেছিলাম। এর জন্য বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি আমাকে হুমকি দিয়েছিল। ২০১১ সালে সরকার পরিবর্তন হলেও তসলিমাদির ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। পরবর্তীকালে তসলিমা নাসরিনের দু-তিনটি বইপ্রকাশ অনুষ্ঠান আমি গিয়েছি। কিন্তু বাংলার অন্য কোনও সাহিত্যিককে দেখিনি। যাঁরা মুক্তমনা বলে দাবি করেন সোশাল মিডিয়ায়, তাঁদের টিকির দেখা মেলেনি তসলিমা সংক্রান্ত কোনও অনুষ্ঠানে। দেবাশিস চক্রবর্তী, মোহিত রায়ের মতো কেউ কেউ তসলিমার কথা বলতেন, আগে যেমন অম্লান দত্ত, শিবনারায়ণ রায়রা বলতেন। “

বিনায়ক আরও বলেন, “আমরা নিরন্তর চেয়েছি তসলিমা পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসুন। চেয়েছি ‘লজ্জা’, ‘দ্বিখণ্ডিত’ যেন নিষিদ্ধ না হয়। কারণ আমরা চাই প্রত্যেকে তাঁর নিজের কথাটা বলুক। জোর করে কারও মুখ বন্ধ যেন করে দেওয়া না হয়। যদিও বিগত সরকার চলেছে মৌলবাদীদের সন্তুষ্ট করার পন্থায় কিংবা ভোটব্যাঙ্কের কথা ভেবে। অতএব, প্রায় কুড়ি বছর পর যে তসলিমা নাসরিন পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন, এটা বিপুল শ্লাঘার এবং আনন্দের বিষয়। যাঁরা লেখিকাকে ফিরিয়ে আনছেন তাঁদেরকে আমার শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা। এখানে বলে রাখি, আমিও তাঁদের সঙ্গে আছি। রবীন্দ্রসদনে ১ আগস্টের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, পাশাপাশি তসলিমার কলকাতায় আসা বাংলাদেশের বাড়ন্ত মৌলবাদের বিরুদ্ধেও বার্তা। নতুন সরকারের আমলে যে তসলিমা রাজ্যে আসছেন, এর ফলে মুক্তচিন্তার পালে বাতাস লাগবে। আমি চাই কেবল কলকাতায় আসা দিয়েই যেন বিষয়টা শেষ না হয়। তসলিমাদি যেন স্থায়ী ভাবে কলকাতাতেই থাকতে পারেন।”

তসলিমা ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের পোস্টে সাহিত্যিককে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্যোক্তা সেকুলার মিশন, এইচআরবিএফএফ। অন্যতম উদ্যোক্তা মোহিত রায় ‘সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল’ কে জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত থাকবেন। এছাড়াও থাকবেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বাকিদের নাম পরে ঘোষণা করা হবে।

মোহিত রায় বলেন, ‘‘অনুষ্ঠানটি মূলত মুক্তি চিন্তার। মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। তবে এটা কোনও সরকারি বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়। তসলিমা নাসরিন তাঁর নিজের কবিতা পাঠ করবেন, তাঁর কবিতার উপর তৈরি গান নিয়ে ঘণ্টাখানেকের অনুষ্ঠান হওয়ারও কথা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী থাকায় তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত। বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর উনি ভেবেছিলেন কলকাতায় সাহিত্যের সমাদর হবে। কিন্তু ৬-৭ বছর পর বুঝতে পারেন যে এখানকার পরিবেশ তেমন নয়। ইসলামিক মৌলবাদীদের কাছে মাথা নত করেছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। সর্বাগ্রে ছিলেন বামপন্থীরাই।” সেই অন্ধকার অধ্যায়কে ভুলে আলোকিত উদযাপনের সাক্ষী হবে পশ্চিমবঙ্গ, আগামী ১ আগস্ট।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.