Taslima Nasrin

‘মৌলবাদ পেরিয়ে বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে’, কলকাতা থেকে স্বদেশকে বার্তা আশাবাদী তসলিমার

নির্বাসনের দাগ মুছে প্রায় দু'দশক পর কলকাতায় ফিরেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শনিবার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর গলায় ধরা দিল এই শহরের প্রতি একরাশ অভিমান।

অরিঞ্জয় বোস
অরিঞ্জয় বোস

শেষ আপডেট: আগস্ট ১, ২০২৬, ২১:০৯

options
link
‘মৌলবাদ পেরিয়ে বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে’, কলকাতা থেকে স্বদেশকে বার্তা আশাবাদী তসলিমার
'বাংলাদেশ ফিরতে চাইলেও বাধা দেয়...', বলছেন তসলিমা নাসরিন

নির্বাসনের দাগ মুছে প্রায় দু’দশক পর কলকাতায় ফিরেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শনিবার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর গলায় ধরা দিল এই শহরের প্রতি একরাশ অভিমান। স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, দীর্ঘ বছর তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকেছে কলকাতাও। তবে ‘অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়’, এই বিশ্বাস থেকেই মৌলবাদে ডুবে থাকা বাংলাদেশের উদ্দেশে বার্তা দিলেন প্রতিবাদী লেখিকা। তাঁর আশা, সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারে ডুবে থাকা বাংলাদেশেও একদিন রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে। নারী পুরুষ সমানাধিকার পাবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করবে।

Advertisement

শনিবার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তসলিমা বলেন, “৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি মানবিকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, বাক স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলেছি। বিপদ এসেছে কিন্তু আমার বিশ্বাস বদলায়নি।” এরপরই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলে লেখিকা বলেন, “বাংলাদেশে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ভয়াবহ। রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াসিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলয় নীল-সহ অনেক মুক্তচিন্তককে মৌলবাদীরা হত্যা করেছে। তাঁদের অপরাধ ছিল, তাঁরা প্রশ্ন করেছে। ইসলামের বিধানের সমালোচনা করেছে। তাঁদের হত্যা করে সমাজকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, প্রশ্ন করলে মৃত্যু। নীরব থাকলে জীবন। তবে আমি এই জীবন মানি না। যে জীবন বাকস্বাধীনতার বিনিময়ে কিনতে হয় সে জীবন, জীবন নয়। প্রশ্নকে হত্যা করা যায় না। প্রশ্নকারীকে হত্যা করলে আরও বহু প্রশ্নকারী ফিরে আসে। যে সমাজ প্রশ্নকারীকে কারাগারে পাঠায় সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করে।”

Advertisement

তসলিমা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি একদিন বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে। নারী পুরুষ সমানাধিকার পাবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করবে। নাস্তিক ও মুক্ত চিন্তকরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই রাস্তায় হাঁটবে। আশা কোনও অন্ধআশাবাদ নয়। অন্ধকারের অস্তিত্ব জেনেও আলো তৈরি করার জেদ।”

মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করে তসলিমা বলেন, “বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকলেও অবিশ্বাসের স্বাধীনতাও থাকতে হবে। ধর্ম নিরপেক্ষতা হল, আইন থেকে ধর্মকে পৃথক রাখা। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকবে না, রাষ্ট্রের থাকবে ন্যায়।” আর সেই বিশ্বাস থেকেই মৌলবাদে নিমজ্জিত স্বদেশের উদ্দেশে তসলিমা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি একদিন বাংলাদেশেও রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক হবে। নারী পুরুষ সমানাধিকার পাবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করবে। নাস্তিক ও মুক্ত চিন্তকরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই রাস্তায় হাঁটবে। আশা কোনও অন্ধআশাবাদ নয়। অন্ধকারের অস্তিত্ব জেনেও আলো তৈরি করার জেদ।”

Advertisement

যে মৌলবাদ তসলিমাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, বাম জমানায় সেই মৌলবাদই তাঁকে কলকাতা ছাড়া করে। কলকাতায় ফিরে সেই অভিমানের বরফ মেঘ কেটেছে লেখিকার! যন্ত্রণামিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বললেন, “মনে অভিমান থাকলেও দু’হাত ভরে রয়েছে ভালোবাসা। যে শহর থেকে চলে যেতে হয়েছিল সেখানেই ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছি। ঘর কেড়ে নিয়েছে কিন্তু, ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নিতে পারেনি। মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ। আমার মন থেকে দেশকে বের করতে পারেনি। কী ক্ষতি করেছি যে চলে যেতে হয়েছিল? আজ আমি প্রশ্ন করতে আসিনি। বলতে এসেছি, ফিরে এসেছি। কলকাতায়, একটা বাক্য বলতে ১৯ বছর সময় লাগল। আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।”

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.