লাগাতার শব্দের চিমটি, এবার টিজারে মাত পুজোর শহর

বিজ্ঞাপনী প্রচারকেও চমকে হারাচ্ছে শহরের পুজো কমিটিগুলি।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯, ১৫:৫৮

options
link
লাগাতার শব্দের চিমটি, এবার টিজারে মাত পুজোর শহর

ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘আমার তো সেটিং হয়ে গেছে। আর আপনার?’

Advertisement

মনে আছে বছর দুয়েক আগে একটি সিমেন্ট সংস্থার কলকাতা কাঁপানো এই টিজারের কথা?
তার পর ‘এত বড়? সত্যিই?’– এই টিজার ছেড়ে কলকাতার সব থেকে বড় দুর্গা দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দক্ষিণের দেশপ্রিয় পার্ক। শেষপর্যন্ত সব থেকে বড় বিপর্যয়। যার ফলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সেই পুজো।

Advertisement

আরও আছে– ‘হরিশ মুখার্জির ডান হাতে পুজো এবার বাঁ হাতে’, ‘বেহালায় সরকার ম্যাজিক’! হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের বাঁ হাতে অগ্রদূত উদয় সংঘ। সেবার তারা করেছিল চাঁদ সওদাগরের পুজো। চাঁদ বাঁ হাতে মনসাকে পুজো দিয়েছিল। সেটাই ছিল অগ্রদূতের শো। বেহালায় একবার শিল্পী অমর সরকার নিজের ক্যারিশমায় পুজোর থিম সাজিয়েছিলেন। টিজার দেখে লোকে ভেবেছিল বুঝি পি সি সরকারের ম্যাজিক হবে। মনে পড়ছে? কলকাতার পুজোর বাজার মাতিয়ে নজর কেড়ে নিয়েছিল ভারী ভারী সেসব টিজার।

Advertisement

এবারও আছে। কিন্তু এবার চরিত্র পাল্টে গিয়েছে অনেকটাই। ‘এক’-এর বদলে একের পর এক টিজার। লাগাতার। বাজার দখলে আরও আক্রমণাত্মক। লাগাতার আক্রমণের রাস্তা নিয়েছে টিজার। পুজো হোক বা বিজ্ঞাপনী প্রচার, গত কয়েক বছরে পুজোজুড়ে কিছু ওয়ানলাইনার বাজারে ছেয়ে গিয়েছিল। এবার ছোট ছোট টিজার ছোড়া হচ্ছে। লাগাতার। চেহারা পাল্টে পাল্টে খুব কম সময়ের ব্যবধানে আসছে শব্দগুচ্ছ। আগেরবারের মতো মাথায় বজ্রাঘাত নয়, মগজের কোষ ধরে ধরে টোকা মারছে তারা। হোর্ডিংয়ে ছেয়ে যাচ্ছে বাজার। কলকাতার পুজোর বাজারে থিম লেখা হোর্ডিংয়ের আবিষ্কর্তা অধুনা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। নিজের সুরুচি সংঘের পুজো করতে গিয়ে প্রথম থিম লেখা হোর্ডিং দিয়েছিলেন তিনি। সেই হোর্ডিংয়ের দখল এখন নিয়েছে টিজার।

[এই বনেদি বাড়ির পুজোর বিসর্জনে গাইতে হয় ‘বঙ্গ আমার জননী…’]

মাস তিনেক আগের কথা। সবাই যখন সাঁজোয়া নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে, সেসময়েই ঠিক কানের কাছে পটকাটা ফাটায় বেহালা ২৯ পল্লি। কোনও মেসেজ নেই। শুধু লিখে দিল ‘টিজার, কামিং সুন’! কী জ্বালাতন? টিজারটা কী? বলল। আরও পরে– ‘সবে শুরু’, ‘ঝিকমিকে’, ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি’ এসব। শহরের দেওয়াল ততদিনে দখল হতে শুরু করে দিয়েছে। বড় কোনও মেসেজ নয়, ছোট ছোট একাধিক টিজার ছড়িয়ে পড়ছে দেওয়ালে। তার পর আরও। একটা ভেবে বের করে ওঠার আগেই আরেকটা।

মগজের বিরাম নেই। টুকরো টুকরো ছবি, গোটা শহরটা যেন মেসেজ—বক্স। পুজোর তখনও ঢের দেরি। কানের পাশে ঠোঁট এনে বেহালা নূতন সংঘ বলল, ‘শুরু পুজোর ফিসফাস– বাকি আর ৪ মাস’। আরও পরে দেওয়াল বেয়ে উঠতে লাগল ছবিটা। এক বাছুরকে ধাওয়া করেছে এক সিংহী। সঙ্গে বলে দিল, ‘ইওর ফলোয়ার ইজ নট অলওয়েজ ইওর ফ্যান’। বার্তাটা স্বাভাবিকভাবেই ছিল অন্য পুজো কমিটিগুলির জন্য। এমন সব টিজারে যখন হাঁসফাঁস দশা, এক স্যাঁতসেতে দুপুরে হঠাৎ চোখে পড়ল, ‘শান্তির ভাব– বেহালা ক্লাব’। সঙ্গে সঙ্গে বড়িশা যুবকবৃন্দও বলল, ‘বেহালা এবার রণোক্ষেত্র’। এবার বহুদিন পর সেখানে শিল্পী রণো বন্দ্যোপাধ্যায়, তাই।

৬৭ বছরে পা রেখেছে রাসবিহারীর ৬৬ পল্লি। তারাই বা পিছিয়ে থাকে কী করে? চালিয়ে দিল রেডিও। বলল, ‘৬৬.৬৭ এফএম, শুনতে থাকুন’। ব্যস! এটুকুই। কসবার বোসপুকুর শীতলামন্দিরে এবার কী হচ্ছে জানেন? মণ্ডপ যে টিনে ঘেরা। কর্তাদেরও মুখে কুলুপ। তাদের টিজার শুধু বলছে, ‘পুকুরে এবার সোনার জল’। সন্তোষপুর লেকপল্লির টিজারে কলকাতার পুজোয় মিশেছে নেদারল্যান্ডের ফুটবলের আমেজ। ’৭৪—এর বিশ্বকাপে কিংবদন্তি কোচ রিনাস মিশেল উপহার দিয়েছিলেন ‘টোটাল ফুটবল’। যেখানে আলাদা করে ডিফেন্স, ফরোয়ার্ড বলে কিছু নেই। সবাই সব জায়গায় খেলবে। সেই ধাঁচেই লেকপল্লির পুজোয় শিউলি কুড়োনো, পদ্মপাতা ছাড়ানো, প্রতিমার শোলার টোপোর পরানো থেকে চাঁদার বিল কাটা–সবাই সব কাজ করছে। তাদের ভাষায় ‘টোটাল পুজো’।

আবার উত্তরে দেখি শ্যামবাজারের পিছনে সরকারবাগান আবার একটা চশমা তুলে ধরে বলে বসল, ‘পরিষ্কার! দেখতে পাচ্ছেন তো?’
ভবানীপুর অবসর ইতিমধ্যে বেশ রঙিন প্রশ্ন করেছে, ‘কালো নাকি জমকালো?’ তার পরই একটি মানুষের মুখ দিয়ে দেখাল কেমন শিকড়-বাকড় বেরোচ্ছে তা থেকে। তারা বলে বসল, ‘ক্ষত প্রকৃতি বিক্ষত মানুষ?’

একেবারে ধাঁধা লাগিয়ে দিল উত্তরের টালা বারোয়ারি। তাদের মঞ্চ এবার ঘুরবে! হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। বেশ ক’টা টিজারে উত্তরের উত্তর দিয়ে তারা প্রথমে লিখেছিল ‘৫০ বছর এগিয়ে’ অথবা ‘পুজোর ভবিষ্যৎ, না, ভবিষ্যতের পুজো’। ৫০ বছর পর কেমন হবে দুর্গাপুজো, সেটাই তারা ভেবে রাখল। উত্তরসূরির জন্য উইল যেমন। কিছুদিন পরই তারা বলে দিল, এবার ঘুরন্ত প্যান্ডেল হচ্ছে তাদের। সারকারিনা স্টেজের কথা মনে পড়ছে না!

[আমার দুগ্গা: হজমি গুলি কেনা আর বন্দুক ফাটানো ছিল মাস্ট]

আবার দক্ষিণে। বেহালা ২৯ পল্লি ততদিনে ছোট ছোট টিজার, ছবিতে সাজিয়ে তুলেছে মা—কে। তার মধ্যেই গড়িয়ার মিতালী সংঘ নিয়ে এল বাঁশ। সেই যে লোকে রসিকতা করে বলে না– ‘বাঁশ কেন ঝাড়ে’। সেটাই তারা একটু বদলে বলল, ‘বাঁশ এবার ঝাড়ে’। বাঁশ দিয়েই যে তাদের মণ্ডপসজ্জা।
এবার ধাতুর ব্যবহার অঢেল বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনে। মজা করে তাই ‘জাতে মেটাল তালে ঠিক’। তামা দিয়ে মণ্ডপসজ্জা হচ্ছে তাদের। এর ফাঁকেই খিদিরপুর ২৫ পল্লি জানিয়ে রাখল ‘খুঁটি পুজো থেকে দুর্গা পুজো’ সবেতেই আছে তারা।

পুজোয় অন্য স্বাদ নিয়ে আসতে চাইছে উল্টোডাঙা সংগ্রামী। বলছে, কিন্তু দেবে কি? আপাতত তাদের একটি গিটার ভরসা। গাছের ডালে টাঙানো! উফ, মাথা ঝাঁঝাঁ করছে। বাদামতলা আষাঢ় সংঘ কিন্তু প্রতিবারই জমিয়ে দেয়। এবারও প্রথম কিস্তি মাত দিয়ে রেখেছে তারা। কাটাকুটিতে আড়াআড়ি জিৎ। আর কিচ্ছুটি নেই। শুধু লেখা ‘আসছে’! বড়িশা ক্লাবের ‘টার্গেট’ এবার আপনিও। উত্তরের কাশী বোস লেন কি এবার একটু ঠেস দিল? তারা বলেছে, গল্পের গরু তারা গাছে চড়ায় না। একইসঙ্গে তারা ঠেলে দিল ‘আশ্বিনে তুলো ধোনা’! তারা এবার সুর-তাল নিয়ে কাজ করছে। সুর-ছন্দের জোর লড়াই।

21105639_1426823110766399_4869915965777660342_n

পুজো জমজমাট!

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.