ভারত-ব্রাজিল ফুটবল ম্যাচ নিয়ে উন্মাদনার পারদ চড়ছে কলকাতায়। ম্যাচের আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে এক ফ্রেমে ধরা পড়লেন ভারত ও ব্রাজিলের দুই হেডকোচ খালিদ জামিল এবং কার্লো আন্সেলোত্তি। সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই ভারতীয় কোচকে আলিঙ্গন করে মন জয় করে নিলেন ‘ডন’ কার্লো। কেবল তাই নয়, ভারতবাসীর উদ্দেশে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন শুরু করলেন ব্রাজিল কোচ।
এই বিষয়ে আরও খবর
প্রথমবার ভারতে এসে কলকাতার মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনায় আপ্লুত ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার মার্কুইনহোস। শহরে পা রাখার পর থেকেই যে ভালোবাসা ও আতিথেয়তা পেয়েছেন, তাতে মুগ্ধ তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, “ভারতে এত উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়ার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কলকাতায় এসে খুবই আনন্দিত। ম্যাচটির দিকে তাকিয়ে রয়েছি। ভারতীয় জাতীয় দলের বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব ভালো ফুটবল খেলতে চাই। এখানে প্রথম আসা। এখনও পর্যন্ত এখানকার অভিজ্ঞতা দারুণ উপভোগ করছি।”

দলের তরুণ ফুটবলারদের কাছেও এই সফরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ব্রাজিলের এই তারকা। তাঁর কথায়, “ভারতে এসে খেলার সুযোগ পাওয়াটা আমাদের কাছে দারুণ ব্যাপার। দলের অভিজ্ঞ ফুটবলারেরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। তবে নতুন ফুটবলারদের কাছেও এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের আগে এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া আমাদের কাছে বিশেষ প্রাপ্তি। ফুটবলারদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার এবং গোটা দলের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও জরুরি। এখানকার মানুষের সমর্থন আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। কলকাতায় আসতে পেরে আমরা সবাই খুব খুশি।” তাছাড়াও ভারতীয় গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধুকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন ব্রাজিল অধিনায়ক। তাঁর কথায়, “এটা গুরপ্রীতের ৯০তম ম্যাচ হতে চলেছে। যা নিঃসন্দেহে খুবই ভালো ব্যাপার। আমার মনে হয় না ভারতীয় দলকে আলাদা করে কোনও পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন আছে। ওরা যথেষ্ট পেশাদার। ভারত ও ব্রাজিল– দুই দেশের সমর্থকদের কাছেই এটা দারুণ একটি মুহূর্ত।”
অন্যদিকে, বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে নিজেদের প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না ভারত। ব্রাজিলকে হারানোর স্বপ্ন নিয়ে সকাল সকাল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মূল মাঠে অনুশীলনে নেমে পড়ে খালিদ জামিলের দল। প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ভারতীয় শিবির। তবে বড় দলের বিরুদ্ধে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের পাশাপাশি তরুণ ফুটবলারদের সামনে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগও রয়েছে এই ম্যাচে।

ভারতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে ব্রাজিলও। নতুন সার্কেলে দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় প্রতিটি ম্যাচকেই নিজেদের পরখ করে নেওয়ার মঞ্চ হিসাবে দেখছেন আন্সেলোত্তি। ভারতীয় দলের গতি, আক্রমণভাগ এবং উইঙ্গারদের দক্ষতা নিয়ে সতর্ক ব্রাজিলের কোচ। জাতীয় দল ও ক্লাবের প্রশিক্ষণের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ক্লাবে প্রতিদিন খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার অনেক বেশি সুযোগ থাকে। কিন্তু জাতীয় দলে সেই সময়টা খুবই কম। তাই সঠিক ফুটবলার বেছে নেওয়া এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের নিয়ে কাজ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” ব্রাজিলের মতো ঐতিহ্যশালী দলের দায়িত্ব পাওয়া যে তাঁর কাছে বিশেষ সম্মানের, তা-ও বুঝিয়ে দিয়েছেন আন্সেলোত্তি। তাঁর কথায়, “ব্রাজিলের জাতীয় দলের কোচ হওয়া সত্যিই বিশেষ অভিজ্ঞতা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা খুব উত্তেজনাপূর্ণ।”
ভারত সম্প্রতি পানামার বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করেছে। ভারতীয় দলের প্রশংসা করতেও ভোলেননি ব্রাজিল কোচ। প্রতিপক্ষের শক্তির জায়গাগুলি সম্পর্কে যে তাঁরা যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েছেন, তা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আন্সেলোত্তি বলেন, “ভারতের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। পানামার বিরুদ্ধে ওরা ভালো খেলেছে। দারুণ ফল করেছে। ওদের দলে গতি রয়েছে। আক্রমণভাগেও ভালো মানের ফুটবলার রয়েছে। ভারতীয় দলের শক্তি আমরা জানি। সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করছি।”
প্রীতি ম্যাচ হলেও ব্রাজিলের কাছে এই লড়াইয়ের গুরুত্ব যে কোনও অংশে কম নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। নতুন ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়া এবং দলের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর দিকেই আপাতত তাঁর নজর। ব্রাজিল কোচের কথায়, “ব্রাজিলের জাতীয় দলের কাছে কোনও ম্যাচই শুধুমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ ম্যাচ নয়। প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন আমরা নতুন ফুটবলারদের নিয়ে নতুন একটি সার্কল শুরু করছি, তখন এই ধরনের ম্যাচ নিজেদের আরও উন্নত করার সুযোগ করে দেয়। এটা পরীক্ষা নয়। নিজেদের প্রমাণ করার ম্যাচও নয়। আমরা এখনও ম্যাচের জন্য চূড়ান্ত দল ঠিক করছি। এটা একটা সুযোগ। নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগছে। শুধু ওরা নয়, গোটা দলের সঙ্গেই কাজ করার অভিজ্ঞতা দারুণ। সবাইকে এক জায়গায় এনে বোঝাপড়া তৈরি করে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ”

ভারতের আতিথেয়তায় মুগ্ধ ব্রাজিল কোচও। তাঁর মন্তব্য, “আরও একটা কথা বলতে চাই, যেভাবে আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তাতে আমরা খুশি। এই সাংবাদিক সম্মেলনে আমরা গোটা ব্রাজিল দলের তরফে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি, আগামিকাল আমরা দারুণ একটা ম্যাচ উপহার দিতে পারব।” তবে ভারতের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে যথারীতি শান্ত তিনি। ৬৭ বছরের ইটালীয় কোচের মতে, ফুটবলে সাফল্যের জন্য ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ম্যাচের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “এটা আমার চরিত্রেরই অংশ। ফুটবলে আমি সাধারণত ধৈর্য ধরতে পছন্দ করি। কোচ হিসাবেও মনে করি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ গুণ।”
ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশ কী হবে? তা অবশ্য খোলসা করেননি আন্সেলোত্তি। তিনি বলেন, “কমিটমেন্ট, কোয়ালিটি এবং ফুটবল খেলার আনন্দ। এই তিনটি বিষয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্ন ফুটবল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। আমি চাই, ফুটবলাররা মাঠে আনন্দ নিয়ে খেলুক। প্রতিটি ম্যাচে ওদের খেলাটা উপভোগ করা উচিত।” গত বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর নতুন করে দল গড়ছে ব্রাজিল। শেষ বিশ্বকাপে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা। সেই দলের বেশ কিছু পরিচিত মুখকে বাদ দিয়ে আন্সেলোত্তি এবার তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণে নতুন দল তৈরি করছেন। ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং মারকুইনহোসের সঙ্গে আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও ব্রুনো গিমারায়েস রয়েছেন। গোলকিপার বিভাগেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। আলিসন, এডেরসন এবং ওয়েভের্তনের মতো অভিজ্ঞ তিন গোলরক্ষককে এবার দলে রাখা হয়নি। তাঁদের জায়গায় করিন্থিয়ান্সের হুগো, কোরিতিবার পেদ্রো মরিসকো এবং ক্রুজেইরোর ওতাভিয়োকে নেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় দু’টি ম্যাচ খেলার পর ভারতে এসেছে ব্রাজিল। সেই দুই ম্যাচের একটিতে ১-১ ড্র এবং অন্যটিতে ৪-২ জয় পেয়েছে তারা। ব্রাজিল কোচের মতে, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের ম্যাচগুলি নতুন দলের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। “অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের এই ম্যাচগুলি আমাদের প্রস্তুতির জন্য খুব ভালো। আমরা কী করতে পারি, তা দেখানোরও সুযোগ,” বলেন আন্সেলোত্তি। ২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে শেষবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। তার পর দীর্ঘ অপেক্ষা। এবারের ব্যর্থতাও ভুলতে পারছেন না। তাঁর কথায়, “সত্যি বলতে, বিশ্বকাপে আমরা যথেষ্ট লড়াই করতে পারিনি। সময়টা কঠিন ছিল। তবে সেটাই নতুন প্রজন্মকে আগামী দিনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে লড়াই করার জন্য অনুপ্রাণিত করবে।”
কেন ২০০২-এর ব্রাজিলের মতো সাফল্য আর আসছে না? আন্সেলোত্তির ব্যাখ্যায় ফুটবলই বদলে গিয়েছে। তিনি বলেন, “কঠিন প্রশ্ন। ২০২৬ সালে কী হয়েছে, শুধু সেটার কথাই বলতে পারি। আমাদের কিছু সমস্যা ছিল, যেগুলির সমাধান করতে পারিনি। ফুটবল অনেক বদলেছে, অন্য দলগুলিও অনেক উন্নতি করেছে। আমার ব্যক্তিগত মত, ২০০২ সালে ব্রাজিল যে প্রতিভা দেখিয়েছিল, তা অসাধারণ ছিল। এখন ফুটবল বদলেছে। এখন দলগত খেলায় আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।”
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
হিরো মচ্ছরকে কুর্নিশ, ‘বাংলা থেকেও তৈরি হবে রাষ্ট্রবাদী পাইলট’, বললেন শুভেন্দু
-
প্রেমিকার সঙ্গে মোমো ডেট! হাতেনাতে ধরতে সটান স্বামীর গাড়ির বনেটে স্ত্রী, তারপর যা হল…
-
ভারতের সঙ্গে ব্রাজিলের নির্বাচন গুলিয়ে ফেললেন ট্রাম্প! মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘ভীমরতি’তে হাসির রোল
-
‘১৫ দিনের মধ্যে ফিরে আসুন’, দল ভাঙার পরও ‘গদ্দার’দের জন্য দরজা খোলা মমতার!
-
টিম ইন্ডিয়ায় ব্রাত্য! এবার অন্য ভারতীয় দলে এন্ট্রি ভুবনেশ্বরের, এই টুর্নামেন্টে দেবেন নেতৃত্ব



