আসন্ন ভোটযুদ্ধে ‘বামদুর্গ’ বরানগরের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (Sayantika Banerjee)। ২০২৪-এর উপনির্বাচনে বিধানসভা কেন্দ্রে জেতেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্যা, ২০২৩-এ ‘মহানায়ক’ সম্মানজয়ী। গ্ল্যামার জগত ছেড়ে বর্তমানে ফুলটাইম রাজনীতিতে। সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বরানগরের তারকা ভোটযোদ্ধা।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: ‘অভিনেত্রী’ সায়ন্তিকা নয়, ‘রাজনীতিবিদ’ বলবো। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড বহুদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। বরানগরের রাস্তায় ঘুরলেই আপনাকে দেখা যায়। আপনাকে কাজের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না, এমন অভিযোগ এখানকার মানুষ করেন না। লড়াই কতটা কঠিন?
উত্তর: কঠিন নয়, আমি মনে করি, যে-কাজটাই করবো, তা নিষ্ঠা সহকারে করা উচিত। অভিনয়জগত ছেড়ে দিয়েছি, বলবো না। আমার উপরে যে কঠিন দায়িত্ব (বিধায়কের) দেওয়া হয়েছিল, তা ঠিকমতো পালন করাটা আমারই কর্তব্য। ‘নায়িকা, তাই দেখা যায়নি এলাকায়; এসি গাড়ি থেকে হাত নাড়িয়ে চলে গেছে’— আমজনতার সাধারণত এমন ধারণাই থাকে। আমি চেয়েছিলাম তা ভাঙতে। হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না। কোনও দায়িত্ব পেলে, তা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মেয়ে সায়ন্তিকা ব্যানার্জি নয়।

প্রশ্ন: আপনার প্রচারের কৌশল অত্যাধুনিক। ঘরে ঘরে পৌঁছন, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেন, ‘আশীর্বাদ করবেন, ঘরের মেয়ে এসেছি’। অথচ আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষ বারবার ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। বিপক্ষকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: ভোটটা তো আর সোশাল মিডিয়ায় হয় না! সোশাল মিডিয়া বা নিউজ চ্যানেলে রোজ মুখ দেখায় মানেই মানুষ তাঁদেরকে ভোট দেবে, এমন নয়। তাছাড়া, বিজেপি বরাবরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘কপি’ করে। তিনি যে-প্রকল্পই ঘোষণা করেন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ হোক বা ‘যুবসাথী’— প্রথমে ওরা বলে ‘ভিক্ষে’! তারপর ‘লাডলি বহেন যোজনা’ নাম দিয়ে তার অনুকরণ করে। বিহারে ভোটের সময় এই প্রকল্পই হাতিয়ার করেছিল ওরা। তৃণমূলকে কপি করা ওদের ‘রাজনৈতিক ট্রেন্ড’।
আমি প্রচারে বলছি যে অনেক কাজ করতে পেরেছি। অনেক কাজ অসম্পূর্ণ। একবারও এমন দাবি করছি না যে, সব করে নিয়েছি! মিথ্যে কথা বলবো না; মিথ্যে প্রতিশ্রুতি তৃণমূল কংগ্রেস দেয় না। মানুষ সুযোগ দিলে আগামীদিনে বাকি থাকা কাজ শেষ করবো।
প্রশ্ন: বরানগরের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিকাশিব্যবস্থার। জল জমে যায় বৃষ্টি হলেই। বিভিন্ন ওয়ার্ডে নাকি পানীয় জলের সমস্যাও রয়েছে। বিধায়ক হিসেবে ফেরেন যদি, প্রথম প্রায়োরিটি কী হবে?
উত্তর: বিধায়ক হিসেবে ফিরবোই। এখানে ‘যদি’র কোনও জায়গা নেই। কারণ আমি কাজ করেছি। যদি বিধায়ক হওয়ার পর কেবল এলাকায় এসে হাত নাড়িয়ে, সম্বর্ধনা নিয়ে চলে যেতাম, তাহলে আত্মবিশ্বাসী হতাম না। পরিশ্রম-ডেডিকেশন-অনেস্টির কোনও বিকল্প হয় না। একজন জনপ্রতিনিধির পক্ষে দেড় বছরে যতটুকু করা সম্ভব, করেছি। এখানে জল জমার সমস্যা রয়েছে ঠিকই। বরানগর একটা গামলার মতো, ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই এখানে জল জমে। এখানে নিকাশিব্যবস্থাটা কঠিন কারণ, বিটি রোড আর জিএলটি রোডের নিচে যে পাইপলাইনগুলো রয়েছে, সেসব ব্রিটিশ আমলে বসানো। সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য যে ফান্ডের প্রয়োজন, কোনও পৌরসভার কাছে তেমন পরিকাঠামো থাকা সম্ভব নয়।
আমি কিন্তু এড়িয়ে চলি না। ২০২৪-এর উপনির্বাচনে যখন প্রথমবার বিধায়ক হয়ে এসেছিলাম, তখন আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল এখানকার রাস্তা ঠিক করা। গত দেড় বছরে আমি স্টেট ফান্ড থেকে সাত কোটি টাকা (ফান্ড) এনেছি। তা দিয়ে সারা বরানগরের রাস্তা হয়েছে। বিইউপি ফান্ড থেকে হাই-মাস্ট লাইটের ব্যবস্থা করেছি। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এখানে একবার জল জমলে পাঁচদিন নামত না। মা-মাটি-মানুষের সরকার আসার পর সেটার পুরোপুরি নিষ্পত্তি করতে পেরেছি, বলব না। হ্যাঁ, এখনও এক-দু’ঘণ্টা জল থাকে। আমাদের কাজ এটাই দেখা যে, আগামী দিনে যেন সেটাও না জমে। ২০২৪-এর আমাদের ইস্তেহারেই ছিল ‘বরানগর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’। নিকাশি ব্যবস্থা সারাতে, পাইপলাইন বসাতে অনেকখানি ফান্ডের প্রয়োজন। সে কাজ এগোচ্ছে, তবে দেড় বছরে সম্ভব নয়। অন্তত পাঁচ বছর লাগবে। প্রচারে একবারও এমন দাবি করছি না যে, সব করে নিয়েছি! মিথ্যে কথা বলব না; মিথ্যে প্রতিশ্রুতি তৃণমূল কংগ্রেস দেয় না। মানুষ সুযোগ দিলে আগামিদিনে বাকি থাকা কাজ শেষ করব।
বামেদের বলবো, প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছেন যখন, নিজেদের ভোটটা ধরে রাখার চেষ্টা করুন। মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নেন তাঁদের ভোট দেবেন, তাহলে দেবেন! আমি যতই বলি, ‘আমাকে ভোট দেবেন’, মানুষ সামনে ‘হ্যাঁ’ বলবে। কিন্তু ইভিএম-এ গিয়ে কোন বোতামটা টিপতে হবে, সেটা তারা এখন থেকেই ঠিক করে ফেলেছে।
প্রশ্ন: অনেকেই বলছেন, বরানগরে ভোটের (West Bengal Assembly Election) রাজনীতির ক্ষেত্রে বামেরা একটা বড় ফ্যাক্টর! গতবার আপনার বিপক্ষে বাম প্রার্থী তন্ময় ভট্টাচার্য দাঁড়িয়েছিলেন। ভোট কাটাকাটির অঙ্কে আপনি খানিকটা বেনিফিট পেয়েছিলেন, দাবি বাম সমর্থকদের। এবারে সায়নদীপ দাঁড়িয়েছেন। বামেদের ভোট কাটা কি কিছুটা কঠিন হবে?
উত্তর: কোন দল কোন প্রার্থী দিয়েছেন, কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেটা আমাদের মাথাব্যথা নয়। আমাদের একমাত্র চিন্তা, তৃণমূল কংগ্রেসের উন্নয়ন মানুষের কাছে তুলে ধরা। মানুষ তা বিচার করে ভোট দেবেন। বামেদের কথা উঠলোই যখন, বলি, ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তাঁরা। আজও যখন মিটিং-মিছিলে বের হন, প্রচুর মানুষ থাকে। কিন্তু সেই ভিড়টা আর ইভিএম মেশিন পর্যন্ত পৌঁছায় না। ‘ব’-এর নিচে ফুটকি লাগিয়ে ‘রাম’ হওয়া একটা বড় বিষয়। বিজেপির কোনও নীতি-আদর্শ নেই, কিন্তু বামেদের আছে বলেই আমি মনে করি। তাঁদের বলব, প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছেন যখন, নিজেদের ভোটটা ধরে রাখার চেষ্টা করুন। মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নেন তাঁদের ভোট দেবেন, তাহলে দেবেন! আমি যতই বাকিদের মতো বলি, ‘আমাকে ভোট দেবেন’, ‘একটা সুযোগ দেবেন’, মানুষ সামনে ‘হ্যাঁ’ বলবে। কিন্তু ইভিএম-এ গিয়ে কোন বোতামটা টিপতে হবে, সেটা তারা এখন থেকেই ঠিক করে ফেলেছে। বাম একদিন বিজেপির জোটসঙ্গী হবে, এমনটা আমরা প্রত্যাশা করি না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে রাজনৈতিক লড়াই হোক।
আমি না-হয় এখন নেমেছি। আমার এজেন্টরা তিন মাস ধরে দিনরাত এক করে রাস্তাতেই রয়েছে। বাড়ির লোকজন ছেড়ে, এসআইআর-এর কাজে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে তারা। ওরা যার হয়ে ভোট চাইতে যাবে, সেও যদি ওদের সঙ্গে একটু রোদে না পোড়ে, তাহলে ওরা উৎসাহ পাবে কোত্থেকে? প্রফেশনাল কমিটমেন্টই আমার কাছে অগ্রগণ্য। সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই। আত্মীয় প্রয়াত হলেও শুটিং করতে গিয়েছি। পাব্লিক রিপ্রেজেন্টেটিভ হওয়াটা সহজ কাজ নয়। এতগুলো মানুষ- কারও বাড়িতে জল আসছে না। কারও বাড়ির সামনে জল জমে যাচ্ছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গিয়েছে, লাইট অফ হয়ে গিয়েছে, সবটাই খেয়াল করতে হয়। কাজ না করলে মানুষ ভোট দেবে না। এটা ‘টু প্লাস টু’-এর মতো সিম্পল অঙ্ক। পরিশ্রম আর সততার কোনও বিকল্প হয় না।
প্রশ্ন: সততার কথা বলছেন। বিরোধীরা কিন্তু দাবি করে, তৃণমূল সরকার ভাতা দিয়ে ভোটে জিতছে। সরাসরি আপনাকে না বললেও সরকারের বিরুদ্ধে এই দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠে বারবার। কী উত্তর দেবেন?
উত্তর: কে কী বলছে, সেটা দেখা আমার কাজ নয়। আমি কী করেছি, সেটার ডিভিডেন্ট পাচ্ছি কি-না, তা দেখাই মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন: প্রতিদ্বন্দ্বী সজল ঘোষকে কোনও বার্তা দিতে চান?
উত্তর: গণতান্ত্রিক লড়াই হোক। রাজনৈতিক লড়াই হোক। মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক। সাধারণত আমরা দেখি, মানুষ সরকার নির্বাচন করছে। বিজেপির আমলে দেখছি, সরকার এসআইআর-এর মাধ্যমে তার ভোটার নির্বাচন করছে। উনি (সজল ঘোষ) রাগ করছেন, কারণ জানেন উনি হারবেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা বিজেপির আইডিওলজির মধ্যেই পড়ে। তাছাড়া তারা নারীবিদ্বেষী। বিজেপির এত রাগ কেন? কারণ তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হেরে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি একজন ছেলে হত, তাদের এত রাগ হত না! মহিলার কাছে হেরে মেল ইগো হার্ট হয়েছে। এখানকার হেরো প্রার্থীরও এটাই রাগ যে ‘একজন নায়িকার কাছে হেরে গেলাম’! মহিলার কাছে হেরে যাওয়া বিজেপির মানতে অসুবিধা হয়!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জুলাইতেই জ্বালানি মানচিত্রে নতুন অধ্যায়, অশোকনগরে শুরু বাণিজ্যিক তেল উত্তোলন
-
মেসির মায়ামিতে নিষ্প্রভ রোনাল্ডো! কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ড্র’য়ে নকআউটে কঠিন লড়াইয়ে পর্তুগাল
-
রেকর্ড বুকে কেন, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, জিতেও নকআউটে কঠিন লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়া
-
সিআইডি সেজে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য রাস্তা থেকে অপহরণ করে ডাকাতি, তদন্তে পুলিশ
-
‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে কাঁপল করাচির সেনা দপ্তর, চলল গুলি, মৃত্যু তিন পাক সেনার