BREAKING NEWS

১৪ আশ্বিন  ১৪২৭  বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ 

Advertisement

জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ‘থ্রি ইডিয়টস’

Published by: Sangbad Pratidin Digital |    Posted: August 12, 2016 3:49 pm|    Updated: August 12, 2016 3:49 pm

An Images

তপন বকসি: অধিরাজ বোস৷ সদ্য পঁচিশ পেরনো বাঙালি পরিচালক৷ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নয়৷ এখনও পর্যন্ত শর্ট ফিল্ম মেকার৷ কিন্তু দু’টো শর্ট ফিল্মেই মাত করেছেন সিনেমা রসিকদের৷ ‘দ্য লাস্ট ডে’ আর ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে নাইট’৷ যার মধ্যে ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে’ অনেকেরই দৃষ্টি ঘুরিয়েছে এই যুবার প্রতি৷ ওর ওই ‘ক্যাফে’ নিয়েই মুখোমুখি হলাম মুম্বইয়ের আন্ধেরির ডি বেলা ক্যাফের টেবিলে৷

তাহলে রাজকুমার হিরানি আর ওঁর ওই ‘থ্রি ইডিয়টস’ আপনার জীবনে মোড় ফেরাল?

একদম৷ আমি তখন সান্তাত্রুজের আর.এন.পোদ্দার স্কুলে কমার্স নিয়ে বারো ক্লাসে৷ ভাবছি এবার ডিসিশন নিতে হবে৷ বাড়ি থেকে বলেছিল আইন নিয়ে পড়তে৷ কিন্তু ওই সময় রাজকুমার হিরানির ‘থ্রি ইডিয়টস’ আর ওই ছবির মূলকথা ফলো ইওর প্যাশন অ্যান্ড ইউ উইল গেট ইওর সাকসেস ওয়ান ডে, আমাকে নাড়া দিয়ে গেল৷ ছোটবেলা থেকে নিজের লেখা চিত্রনাট্যে সিনেমা পরিচালনা করার ইচ্ছেটাকে যেন এই সিনেমা আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দিল৷ তখন থেকেই মনে মনে ভেবেছি রাজকুমার হিরানির মতো ছবি তৈরি করব৷ ওরকম ছবি করতে হবে আমাকে৷

কিন্তু একজন মধ্যবিত্ত ছেলের হিন্দি বলয়ে ফিল্মমেকার হয়ে ওঠার পিছনেও তো চিত্রনাট্য থাকে? সেটা কেমন? কীভাবে ঘটল এই ফিল্মমেকার হয়ে ওঠা?

বাবা স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন৷ আমি, মা, বাবা আর আমার এক ছোট বোন৷ এই নিয়েই আমাদের মধ্যবিত্ত সংসার৷ বাবার চাকরিসূত্রে আমি অনেক জায়গায় থেকেছি, ঘুরেছি৷ কখনও বাংলাদেশ, কখনও শিলিগুড়ি, কখনও দেশের আরও নানা জায়গায়৷ বিভিন্ন্ জায়গা, মানুষজন, পরিবেশ আমার মনে নানাভাবে প্রভাব ফেলে গিয়েছে৷ মুম্বইয়ে আছি শেষ দশ বছর৷ এখানেই স্কুলিং শেষ করেছি৷ তারপরে ভর্তি হয়েছি কে. সি. কলেজে৷ বারো ক্লাসের স্কুল থেকে কলেজে এসে আমার স্ট্রিম বদলে গেল৷ কমার্স থেকে মাস কমিউনিকেশনে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা শুরু করলাম৷ এই কোর্সের মধ্যেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং সিনেমা, ডকুমেণ্টারি ফিল্মমেকিং সবকিছুই রয়েছে৷ শর্ট ফিল্ম মেকিংও রয়েছে৷ আমার গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল ইয়ারে আধঘণ্টারও কম সময়ের একটা ডকুমেণ্টারি ফিল্ম তৈরির প্রোজেক্ট এল৷ হিমাচলপ্রদেশের জঙ্গলে ভাং আর অবৈধ গাঁজা চাষের ওপর তথ্যচিত্র ছিল এটা৷ এই ছবিতে অনসিন ন্যারেটর হিসাবে আমি নাসিরুদ্দিন শাহ স্যরকে পেয়েছিলাম৷ নাসির স্যরের সঙ্গে তখন থেকেই পরিচয়৷ কলেজ পাস আউট হয়ে অনেক শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি৷ অ্যাড ফিল্ম তৈরি করেছি৷ ইন ফ্যাক্ট, আমার বাইশ বছর বয়সে আমি এই ‘দ্য লাস্ট ডে’ আর ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে নাইট’ তৈরি করেছি৷ বানানোর দু’বছর পর এই ছবি দুটো ইউটিউবে রিলিজ করল৷ দু’-তিন সপ্তাহ আগে৷ আর তখন থেকেই অবিশ্বাস্য সাড়া পেয়েছি, পাচ্ছি৷

একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলে, যিনি কি না পরিবারের বড় ছেলে, তাঁকে এই পেশায় এমন এক প্রথাভাঙা পেশায় আসতে দিলেন যিনি বা যাঁরা, কুর্নিশ তাঁদের৷ তাছাড়া এমনটা সম্ভব হত কি?

অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাব আমার পরিবারকে৷ আমার বাবাকে৷ যিনি আমাকে একবারও পিছুটানে আটকে থাকতে দেননি৷ বরং আশ্বাস দিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার৷

আপনার দু’টো শর্ট ফিল্মেরই বিষয়ের মূলে রয়েছে রিলেশনশিপ৷ এই থিমটাই আপনার প্রিয় হয়ে উঠল কেন?

বরাবরই হিউম্যান রিলেশনশিপের ভিতরকার লাইট অ্যান্ড শ্যাডো আমাকে টানে৷ অনেকের মতো আমারও ব্রোকেন রিলেশনশিপের ঘটনা আছে৷ কিন্তু সেটা তো খুব কমন৷ ঘটনাটা হল সেই ভিতরকার জেব্রা ক্রসিংয়ের মতো জ্যামিতিটা আমাকে সবসময় হণ্ট করেছে৷ আমি গল্পের রসদ পেয়েছি৷ কাগজ-কলমে গল্প বলাকে ক্যামেরায় ধরতে পারার ইন্সপিরেশন পেয়েছি৷ আবারও বলছি আমি যখন এই শর্ট ফিল্মগুলো করেছি, তখন আমার বয়স বাইশ৷ গতকালই আমি পঁচিশ পূর্ণ করেছি৷ অনেকেই আমার ছবি দেখে বলেছেন একটা বাইশ বছরের ছোকরা কী করে এরকম বড়দের মনস্তত্ত্বের, রিলেশনশিপের বিষয় নিয়ে ছবি করে?

আপনার ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে নাইট’ কতক্ষণের ছবি?

তেরো মিনিটের৷ ‘দ্য লাস্ট ডে’ তো আরও কম৷ সাড়ে তিন মিনিট৷ আট বছর ধরে একই রুম শেয়ার করার পর এক বন্ধু আরেকজনকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে৷ কোনও একসময় আমি বোর্ডিংয়ে ছিলাম৷ এই গল্পের বীজ সেখান থেকে পাওয়া৷

আর ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে নাইট’?

সব ছবির পিছনেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে৷ আমারও মনে হয় কোনও না পাওয়া থেকেই বোধহয় সবচেয়ে ভাল শিল্পের জন্ম হয়৷

নাসিরুদ্দিন শাহ-র মতো অভিনেতা আপনার শর্ট ফিল্মে কাজ করে খুশি হয়েছেন৷ খুব কম কথা হল কি?

এখনও পর্যন্ত গ্রেটেস্ট অ্যাচিভমেণ্ট৷ কে না খুশি হবে এটা শুনলে?

শেরনাজ পটেল ও নাসিরুদ্দিন শাহকে চিত্রনাট্য বোঝাচ্ছেন অধিরাজ
শেরনাজ পটেল ও নাসিরুদ্দিন শাহকে চিত্রনাট্য বোঝাচ্ছেন অধিরাজ

ইউটিউব আপনাদের মতো ভবিষ্যত্‍ প্রজন্মের ফিল্মমেকারদের দরজা খুলে দিচ্ছে৷ কতটা কৃতজ্ঞতা জানাবেন এই নতুন মাধ্যমকে?

ইউটিউব না হলে আমরা কী করতাম ভাবতেই পারি না৷ চোদ্দো দিনে আমার ‘ইণ্টেরিয়র ক্যাফে নাইট’ দেখেছেন সাড়ে আট লক্ষ দর্শক৷ আমার চিনের বন্ধু, সাউথ আফ্রিকার বন্ধু, অস্ট্রেলিয়ার বন্ধুদের, তাদের পরিবারের সবার শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছি৷ ওঁরা আমার ছবির সাবটাইটেলের দৌলতে আমার ছবিকে ফিল করেছে৷ এনজয় করেছে৷ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকেও প্রচুর সাড়া পেয়েছি৷ অনুরাগ কাশ্যপ, আমার ফিল্ম রাইটিংয়ের স্যর অনজুম রাজা বল্লি, কান্ন্ন আইয়ার, ইমতিয়াজ আলিরা আমার চিত্রনাট্য পড়েছিলেন৷ দু’-একটা মতামতও দিয়েছিলেন৷ আর ছবি ‘ইউটিউবে দেখানোর পর আমি ফোন পেয়েছি, ই-মেল পেয়েছি, মেসেজ পেয়েছি আরও অনেকের৷ আমার জীবনের মোড় ঘোরানো ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির পরিচালক রাজু হিরানি ফোন করেছেন৷ বিধু বিনোদ চোপড়াও ফোন করেছেন৷ মেল করেছেন ওই ছবির লেখক অভিজাত যোশি৷ মেল করেছেন আমির খান৷ আমি আপ্লুত৷ সেই সঙ্গে দায়িত্বও বেড়ে গেল৷

আপনার আগামী ছবি কী হবে?

রিসেণ্টলি পরিচালক বিজয় নাম্বিয়ারের জন্য ১৯৮৮ সালে তামিলে তৈরি মণিরত্নমের ‘অগ্নিনটচথিরম’-এর হিন্দি চিত্রনাট্য লিখেছিলাম৷ এবার এক বছর ধরে নিজের ফিচার ফিল্মের জন্য লিখতে থাকা চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ করব৷ বিজয় নাম্বিয়ারের জন্য লেখা চিত্রনাট্যে অভিনেতা ধনুষ নির্বাচিত হয়েছেন৷

মুম্বইয়ে নিজের বাড়ি আছে?

হ্যাঁ৷ বাবা একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন নিউ মুম্বইয়ের পাম বিচ রোডে৷ ওটা ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন৷ আমিই বলেছি৷ আর আন্ধেরি-ওশিওয়াড়ায় এখনকার ফ্ল্যাটে ভাড়া রয়েছি আমরা৷ ভাড়ায়৷ বাবা রিটায়ার্ড এখন৷ আমি বলেছি আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব৷ ভাড়া আমিই দেব৷ নিজের জন্য লেখায় তো প্রথমে টাকা পাওয়া যায় না৷ চিত্রনাট্য বিক্রি হলে পাওয়া যায়৷ আর খরচা তোলার জন্য তো অ্যাড ফিল্ম আছে৷ অ্যাড ফিল্মের টাকা জমিয়ে রেখে নিজের স্বাধীন লেখা লিখি৷ ‘ইনটেরিয়র ক্যাফে নাইট’ যেমন কয়েকজন বন্ধুরা মিলে অল্প কিছু টাকা দিয়ে বানিয়েছিলাম৷ দু’বছর পর সেই টাকা ডাবল ফেরত পেলাম৷ যাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের কিছু কিছু টাকা পারিশ্রমিক হিসাবে দিয়েছিলাম দু’বছর পর৷ এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি৷

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement