Bankim Chandra Chatterjee

একজন ক্ষুরধার প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব, তবুও কেন ব্রাত্য হয়ে রইলেন বঙ্কিম?

সেই বঙ্কিম এই তথাকথিত ‘আভাগার্দ’দের চোখে, এতটা ব্রাত্য হয়ে রইলেন কেন? রইলেন, কারণ তিনি সারা জীবন তির্যকভাবে সমস্ত ভণ্ডামি এবং ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ইমেজের বিরুদ্ধে বলে গিয়েছেন।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ৪, ২০২৬, ১৭:০৪

options
link
একজন ক্ষুরধার প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব, তবুও কেন ব্রাত্য হয়ে রইলেন বঙ্কিম?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ফাইল ছবি।

কী কুক্ষণে যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ঋষি’ হয়েছিলেন! ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা পেতে হল। অথচ বঙ্কিমের ভিতর অনেক সুর সর্বদা শোনা যায়। ‘আনন্দমঠ’-এর বঙ্কিম আর ‘হায় রজনী! পাথরে এত আগুন?’-এর বঙ্কিম এক নন। বঙ্কিম ছাড়া হালের বাংলা গদ্য আমরা পেতাম না। তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র কেন উদ্বোধিত হবেন না নতুন করে!

Advertisement

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‌্যায় অবশেষে আবার তঁার প্রাপ্য জায়গা পেলেন। মানতেই হবে যে, তঁার অস্পৃশ্যতা কিছুটা হলেও ঘুচল। কেবল ‌‘বন্দে মাতরম্‌’-এর ১৫০ বছর উপলক্ষেই নয়, বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে পরিবর্তনের জোয়ারেও বঙ্কিমের উপর আবার আলো এসে পড়ল। প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে বঙ্কিমের এই এক ঘরে হওয়া শুরু হয়েছিল। কী কুক্ষণে যে তিনি ‘ঋষি’ হয়েছিলেন! কী কুক্ষণে যে জাতীয়তাবাদের উদ্‌গাতা হয়েছিলেন! ব্যস, ‘চিনের চেয়ারম্যানই আমাদের চেয়ারম্যান’ আওড়াতে-আওড়াতে ‘সাউথ সিটির ফ্ল্যাটই আমাদের ফ্ল্যাট’ বলার দিকে যারা এগিয়ে গেল তারা বঙ্কিমকে একেবারে বড় দরজা থেকে বের করে পিছনের ঘোরানো সিঁড়ির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র হয়ে দঁাড়ালেন সেই ব‌্যক্তি, যিনি ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘অপশব্দ’টি উচ্চারণ করেছেন– ‘হিন্দু’। অথচ, বঙ্কিমের লেখা গভীরভাবে পড়লে পরে তঁাকে সাম্প্রদায়িক বলে দায়ী করার তেমন জায়গা নেই।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

তিনি রামা কৈবর্তর কথা যেমন বলেছেন, হাসিম শেখের কথাও বলেছেন। আবার তিনি বারবার বলেছেন ‘হিন্দু’ হলেই লোকে ভাল হয় না, মুসলমান হলেই লোকে খারাপ হয় না, কিংবা এর বিপরীত। বঙ্কিমচন্দ্র তঁার সমসাময়িক জীবনের কথা তুলে ধরেছেন, কিন্তু সে কথা চিন-বা রাশিয়ার মন্ত্রঃপূত বাবুরা মানবেন কেন? তাঁদের চোখে তঁাদের রঙে না রাঙানো যে কোনও সমাজ-বর্ণনা ওই একটি শব্দের মধ্যেই ঠাঁই পেয়ে যাবে– ‘সাম্প্রদায়িক’। সেই একই কুযুক্তিতে শরৎচন্দ্র ‘সাম্প্রদায়িক’, তাঁর লেখালিখির জন্য; সেই অপযুক্তিতে শরদিন্দুও ‘সাম্প্রদায়িক’, কারণ তিনি ‘আদিম রিপু’-তে (১৯৫৫ প্রকাশ) পরিষ্কার লিখেছেন যে, হিন্দুর লাশ পড়ে থাকলে সোহরাবর্দির সরকার কোনও ভূমিকা নেয় না, বরং দু’-একটা হিন্দুকেই উল্টে আরও মেরে যায়।

Advertisement

এই যে জায়গা, এই জায়গাই চলছিল। কিন্তু তথাকথিত বামপন্থীদের রক্তক্ষরণ হতে হতে অ্যানিমিয়া এমন একটি স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে যে, উল্টোদিক থেকে বঙ্কিমের আবার নতুন করে আলোয় আসার জন্য ভীষণ প্রয়োজন।

প্রকৃতিতে যেহেতু কোনও স্থান নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভ্যাকিউয়াম থাকে না, সেই ফঁাকা জায়গা দখল করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। তারা কোন বঙ্কিমের কথা বলছে? বলছে– মূলত ‘আনন্দমঠ’-এর বঙ্কিমের কথা। ‘বন্দে মাতরম্‌’-এর রচয়িতা বঙ্কিমের কথা। এবং সেই জায়গা থেকে এমনটাও বলছে যে, বঙ্কিমচন্দ্রর ‘বন্দে মাতরম্‌’-কে এডিট করার মধ্য দিয়েই দেশভাগ প্রক্রিয়া শুরু। তাই নিয়ে ভাল বা খারাপ তর্ক অনেক দূর এবং বঙ্কিমের এই খণ্ডাংশই মূল বঙ্কিম কি না সেটাও বড় প্রশ্ন। আবার তত বড় প্রশ্ন নয়ও। এক বিখ্যাত সমালোচক রুডিয়ার্ড কিপলিং সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন– ‘কিপলিং’-এর ভিতর একটা স্যাক্সোফোন আর
ওবো একসঙ্গে বাজে’। প্রথমজন যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী কিপলিং, দ্বিতীয়জন ভারতীয় সংস্কৃতি আর পরম্পরার সামনে নতজানু কিপলিং। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে বঙ্কিমও তাই। ‘আনন্দমঠ’-এর বঙ্কিম আর ‘হায় রজনী!

পাথরে এত আগুন?’-এর বঙ্কিম তো এক নন। ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো’-র বঙ্কিম আবার আলাদা। বঙ্কিমের ভিতর অনেক সুর সর্বদাই শোনা যায়। কিন্তু এক জায়গায় এসে আমাদের মাথা নত করতেই হয় যে, বঙ্কিম ছাড়া হালের বাংলা গদ্য বা গর্ব করার মতো বাংলা গদ্যই আমরা পেতাম না।

সেই বঙ্কিম এই তথাকথিত ‘আভাগার্দ’দের চোখে, এতটা ব্রাত্য হয়ে রইলেন কেন? রইলেন, কারণ তিনি সারা জীবন তির্যকভাবে সমস্ত ভণ্ডামি এবং ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ইমেজের বিরুদ্ধে বলে গিয়েছেন। এ-কথা মনে রাখতে হবে যে, রামকৃষ্ণদেব যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বঙ্কিম কীসে সোজা?’ তিনি তখন ‘ব্রিটিশের মার’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন। ‘মানুষের কাজ কী?’ জিজ্ঞেস করায়, ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলেছিলেন, ‘আহার, নিদ্রা, মৈথুন’। বঙ্কিম ঘনঘোর ভণ্ডামির বিপ্রতীপে দঁাড়িয়ে থাকা একজন ক্ষুরধার প্রতিভাবান ব‌্যক্তিত্ব। তিনি রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত বলেছেন, সত্য ভাল, সত্যের ভান ভাল না।

বঙ্কিমের এই সাহসই ভণ্ডদের সহ্য হয় না। যারা প্যালেস্তাইন নিয়ে কথা বলতে পারে, কিন্তু নোয়াখালির গণহত্যা নিয়ে একেবারে নীরব; যারা ভিয়েতনাম নিয়ে কথা বলবে, কিন্তু চট্টগ্রামের চাকমাদের বাড়িতে আগুন লাগানো হলেও কথা বলবে না; যারা নিজেদের ভণ্ডামির কারণে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে রামচন্দ্রকে গালি দিতে দিতে শেষে কেরলমে রামায়ণ মাস পালন করছে; যারা ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ভারত শাসন করা একটি জোটের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে ভুলে যায় যে, তাদের নিজেদের ভোট ৪ শতাংশও নয়; তাদের চোখে বঙ্কিমচন্দ্র কেবলমাত্র নৈহাটিরই বঙ্কিম, তারা বঙ্কিমকে তার বাইরে বেরতে দেয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আবারও বাংলা এবং বাঙালিকে একটি কেন্দ্রীয় জায়গায় নিয়ে এসেছেন। যারা একসময়, ‘বন্দে মাতরম্‌’ মন্ত্রটিকেও অবমাননা করত ‘কংগ্রেসি গুন্ডাদের স্লোগান’ বলে, তাদের তাই এখন মুখ লুকনোর জায়গা নেই।
এই এত অবধি সত্যিই একটা ভাল লাগার অনুভূতি কাজ করছে। কিন্তু এরপর যদি ভাবা হয়, বঙ্কিম সর্বহারা বাঙালির, উদ্বাস্তু বাঙালির, ঢাকা-ময়মনসিং-ফরিদপুরের বাসভূমি ছেড়ে দণ্ডকারণ্যে কিংবা কুপার্স ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া বাঙালির পরিত্রাতা হয়ে উঠবেন, তাহলে অবশ‌্য কোথাও একটা ফঁাক থেকে যাবে। বাঙালির জন্য বড় মাপে কিছু করতে হলে শুধু বঙ্কিমচন্দ্রকে দিয়ে কার্যোদ্ধার করা যাবে না, সেখানে রবীন্দ্রনাথকে আনতে হবে। এই কথা বঙ্কিম নিজে থাকলেও বলতেন। বঙ্কিমকে কেন্দ্রে রেখে বাঙালির ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তা পূর্ণতা পাবে তখনই যখন তঁার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও যুক্ত করা যাবে। সারা ভারতে কেবল ‘বন্দে মাতরম্‌’ শেখানোর জন্য বাঙালি গাইয়েরা চাকরি পাবে না, তাদের কর্মসংস্থান তখনই হবে– যখন দেশে বিভিন্ন ভাষায় রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর ব্যবস্থা করা যাবে।

তার মানে, বঙ্কিমচন্দ্র আবারও অন্তরালে চলে যাবেন, তা কিন্তু একেবারেই নয়। বঙ্কিমের নামে অবশ্যই একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হোক আর তার সঙ্গে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ কিংবা ‘গঙ্গা-যমুনা’ সরকারের আমলে বাঙালির জন্য অনেক চাকরি সৃষ্টি হোক। সেই চাকরিগুলির জন্য চাই প্রতিষ্ঠান। এবার সেই প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে বঙ্কিমকে কেবলমাত্র একটি মন্ত্র বানিয়ে রেখে দিলে তা কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হবে না। মানুষ কেবলমাত্র নিয়মের ক্রীতদাস নয় যে তার জীবনে কোনও কল্পনার বিস্তার থাকবে না। আর হালের যা কল্পনা তাই আগামীর বাস্তব।
তাই বাঙালিকে বঙ্কিমচন্দ্রর নামে জাগ্রত করতে হলে, আবারও বলতেই হচ্ছে, কোথাও একটা রবীন্দ্রনাথের পথ অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বভারতীর খোলনলচে বেশ খানিকটা বদলে, সুধীর চক্রবর্তীর আক্ষেপের ভাষায়, ‘মদের শান্তিনিকেতন’-কে বদলে, ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ করার পাশাপাশি একটা নতুন, ‘বঙ্কিমভারতী’-র দরকার– যা বহু মানুষকে মাথা উঁচু রেখে অন্ন উপার্জনের রাস্তা দেখাবে। হাওয়ায় ভাসতে থাকা ‘বন্দে মাতরম্‌’ ফুসফুসের চেহারা নিতে পারবে।

(মতামত নিজস্ব)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.