Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২ জুলাই ২০২৬
Bus

শহরে বাসের বিসর্জনের বাজনা! সংকট মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে সবাই

এখনও কলকাতার ৭৫ শতাংশর বেশি মানুষ নির্ভরশীল গণপরিবহণ ব্যবস্থায়।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ২, ২০২৬, ১৬:৫৫

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ২, ২০২৬, ১৬:৫৫

options
link
শহরে বাসের বিসর্জনের বাজনা! সংকট মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে সবাই zoom
ফাইল চিত্র।

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, শহরের ২১.১১% মানুষ বাস, ১৮.১% মেট্রো রেল, ৯.৯৪% লোকাল ট্রেন এবং ৯.৯% মানুষ অটোরিকশা ব্যবহার করে। অথচ গত ১০ বছরে বাসের সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। মোটরসাইকেল ও চারচাকা গাড়ির বৃদ্ধির ফলে বেড়েছে দূষণ। এই সংকট মোকাবিলায় রাজ‌্য সরকারের প্রতিকার প্রয়াসের দিকে আমরা তাকিয়ে। লিখছেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস।

গত তিন দশকে নগরায়নের ধাক্কায় অনেক বেশি মানুষ কাজের খোঁজে নতুন গন্তব্য বানিয়েছে শহরকে। ফলে শহরে জনঘনত্ব ক্রমশ বেড়ে চললেও সেভাবে গণপরিবহণের পরিকাঠামো বেড়ে উঠছে না দেশে। ইতিমধ্যে ট্রাম কলকাতায় দুয়োরানি, যা ছিল দূষণহীন ও সুলভ একটি যান শহরবাসীর জন্য। কিন্তু ট্রামের পর বাসের বিসর্জনের বাজনা এখন যখন বাজছে শহর জুড়ে, তখন কলকাতার মতো মেগাসিটিতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়ছে! কারণ, এই পড়তি আয়ের বাজারে শহরে থাকার খরচের পাশাপাশি যদি নিত্যদিনের যাতায়াতের খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে, তখন সেই নিম্ন কিংবা মধ্যবিত্তর জীবনের সংকটও বাড়ে বই কমে না! এখনও কলকাতা শহরের ৭৫ শতাংশর বেশি মানুষ নির্ভরশীল গণপরিবহণ ব্যবস্থায়।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

‘লাইফ-লাইন’ বাস
বাস, মিনিবাস কিংবা ট্রামের মতো বড় আকারের যান একলপ্তে অনেক যাত্রী পরিবহণে সক্ষম বলেই সেই বাসে-ট্রামে টিকিটের দাম তুলনায় কম হয়। একটি শহরের অল্প খরচের গণপরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে এখন জুড়ে গিয়েছে শহরকেন্দ্রিক লোকাল ট্রেন থেকে শুরু করে মেট্রো রেল– সবকিছু। কিন্তু কলকাতা শহরের ভৌগোলিক মানচিত্রে উত্তর-দক্ষিণ কিংবা পূর্ব-পশ্চিম বরাবর মেট্রো রেলের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়লেও শহরের সামগ্রিক যাত্রী পরিবহণের চাহিদা পূরণ করতে বাসের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য।

সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, শহরের ২১.১১% মানুষ বাসে, ১৮.১% মেট্রো রেলে, ৯.৯৪% লোকাল ট্রেনে এবং ৯.৯% মানুষ অটোরিকশা ব্যবহার করে শহরে পরিবহণের মাধ্যম হিসাবে। এখনও শহরের ‘লাস্ট মাইল’ যোগাযোগের অন্যতম উপায় হয়ে রয়েছে এই শহরে বাস থেকে শুরু করে অটোরিকশার মতো বাহন।

ট্রামের পর বাসের বিসর্জনের বাজনা এখন যখন বাজছে শহর জুড়ে, তখন কলকাতার মতো মেগাসিটিতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়ছে! কারণ, এই পড়তি আয়ের বাজারে শহরে থাকার খরচের পাশাপাশি যদি নিত্যদিনের যাতায়াতের খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে, তখন সেই নিম্ন কিংবা মধ্যবিত্তর জীবনের সংকটও বাড়ে বই কমে না!

গত দু’-দশকে মেট্রো রেল প্রকল্পের প্রসারণ ছাড়া শহরে গণপরিবহণে কোনও উল্লেখযোগ্য বদল ঘটেনি। বরং শহরের পরিবহণের একদা অন্যতম ‘লাইফ-লাইন’ বাস পরিষেবা এই সময়কালে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

মালিকানার নিরিখে প্রায় বাসের ৮০% এবং অটোর পুরোটাই বেসরকারি মালিকানাধীন। ফলে এই শহরে গণপরিবহণ ব্যবস্থায় সরকারি মেট্রো রেল, লোকাল ট্রেন কিংবা রাজপথে কিছু পরিমাণ সরকারি বাসের অস্তিত্ব থাকলেও সড়ক পরিবহণের সিংহভাগ নির্ভরশীল বেসরকারি পরিবহণের উপরেই। দেশের নগরোন্নয়ন দফতরের মাপকাঠিতে শহরের প্রতি এক লাখ জনসংখ্যা পিছু কাঙ্ক্ষিত বাসের সংখ্যা হওয়া উচিত ৫০ থেকে ৬০, সেটা কলকাতা শহরের ক্ষেত্রে ২২.৫ আর বেঙ্গালুরু কিংবা দিল্লিতে সেই সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫ এবং ৩৫.৬। বিদেশের উন্নত গণপরিবহণের শহর হিসাবে পরিচিত সিঙ্গাপুর কিংবা লন্ডনে ওই সূচকের মান যথাক্রমে ৯৭.৫ এবং ৯৬.৭। এর থেকেই স্পষ্ট ২১ শতকের যাত্রী পরিবহণের চাহিদার নিরিখে কতটা পিছিয়ে রয়েছি আমরা!

বেহাল হাল
রাজ্যের সড়ক পরিবহণের সিংহভাগ যখন নির্ভরশীল বেসরকারি পরিবহণের উপরে, সেখানে সরকার-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। কোভিডের আগেও কলকাতা শহরে দৈনিক ৬ হাজার বাস চলাচল করত, সেটা এখন কমে দঁাড়িয়েছে তার অর্ধেক। শহরে এই বিপুল পরিমাণ বাসের সংখ্যা কমার কারণ একাধিক। বায়ুদূষণের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে ১৫ বছরের পুরনো বাস রাস্তা থেকে তুলে নেওয়ার কারণে গত কয়েক বছর ধরে বিপুল হারে বাস কমেছে শহরের রাস্তায়। পাশাপাশি, সরকারি নীতি পঙ্গুত্বের কারণে লোকসানের কবলে পড়ে শয়ে-শয়ে বাস বসে গিয়েছে রুট থেকে। এই প্রেক্ষিতে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তৎকালীন পরিবহণ মন্ত্রীকে। ফলে সেই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট যে, গণপরিবহণে শহর বেনজির সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বাস পরিবহণে।

গত দু’-দশকে মেট্রো রেল প্রকল্পের প্রসারণ ছাড়া শহরে গণপরিবহণে কোনও উল্লেখযোগ্য বদল ঘটেনি। বরং শহরের পরিবহণের একদা অন্যতম ‘লাইফ-লাইন’ বাস পরিষেবা এই সময়কালে ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

কার্যত গত কয়েক বছরে লাফিয়ে লাফিয়ে জ্বালানির দাম থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশের দাম কিংবা চালক কন্ডাক্টরের মজুরি বাড়লেও সেই অনুপাতে বেসরকারি বাস ভাড়ার পুনর্বিন্যাস হয়নি। ফলে বহু ক্ষেত্রেই বাসের ভাড়া বেড়ে চলেছে বাস-মালিকদের মর্জি মেনে। বেসরকারি পরিবহণে সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রুট নির্ধারণের ক্ষেত্রেও। শহরের বিভিন্ন রুটে যাত্রী সংখ্যার চাহিদা-জোগানের সমীকরণ বিচার না-করে বহু ক্ষেত্রে সস্তা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার নিরিখে চালু করা হয়েছে এক-একটা বাসের রুট। এমনকী, বিভিন্ন রুটে বাসের সংখ্যার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পরিবহণ অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের মূল সূত্রকে অগ্রাহ্য করেই।
রুট-রচনায় ভুল হলে রাজস্বের টানাটানির ধাক্কা সরাসরি রাজপথে এসে পড়ে বাসগুলি রেষারেষির ঘটনায়। তখন বাড়তে থাকে পথ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বাড়তে থাকে যাত্রাপথে যত্রতত্র চালকের মর্জিনির্ভর যাত্রায় বিলম্বের ঝুঁকি। আর এমন বহু ধরনের কার্যকারণ সম্পর্ক ঘিরেই তৈরি হয়েছে শহরের বাস পরিবহণের বেনজির সংকট।

গত ১০ বছরে রাজ্যের সরকারি পরিবহণ সংস্থাগুলি অদক্ষতার কারণে রুগ্‌ণ হয়ে ধসে পড়েছে। পুরনো বাসের পরিবর্তে নতুন সরকারি বাসের বরাদ্দ বাড়েনি রাজ্যের বাজেটে। এই সময়পর্বে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে পরিবহণ কর্মীর সংখ্যা। একের-পর-এক ট্রামডিপোর জমি বিক্রি করে সরকার রিয়েল এস্টেটের উন্নতি ঘটালেও সেই জমি থেকে সংগৃহীত রাজস্বে গড়ে তোলা যায়নি শহরের নতুন যান পরিকাঠামো।

রাজ্যের সড়ক পরিবহণের সিংহভাগ যখন নির্ভরশীল বেসরকারি পরিবহণের উপরে, সেখানে সরকার-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। কোভিডের আগেও কলকাতা শহরে দৈনিক ৬ হাজার বাস চলাচল করত, সেটা এখন কমে দঁাড়িয়েছে তার অর্ধেক।

আধুনিক বাস
এখন শহর ও শহরতলির মানুষের জীবনে গতির হাল ফেরাতে গেলে অবিলম্বে গণপরিবহণের হাল ধরতে হবে রাজ্যের নতুন সরকারকে। ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে জ্বালানির দাম লাফিয়ে বেড়েছে অনেকটাই। এই প্রেক্ষিতে তেলের দাম আরও বাড়লে যে রাস্তায় বাস, ট্যাক্সি থেকে অটোরিকশার ভাড়ায় কোপ পড়বে– বলা বাহুল্য। এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে রাজ‌্য সরকারের পরিবহণ-নীতি আরও সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন রাজ্যের গণপরিবহণ ব্যবস্থা সচল রাখার স্বার্থেই।

২১ শতকে ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে যখন ‘অ্যাপ’নির্ভর মোটরবাইক থেকে ট্যাক্সি পরিষেবা চালু হয়েছে শহরে, তখন বেসরকারি বাস পরিষেবা পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রেও অ্যাপ নির্ভর বাসের গতিবিধি যাত্রীদের গোচরে আনার পরিকল্পনা করা জরুরি। সেই ক্ষেত্রে যাত্রীদের পথে পথে বাসের খোঁজে হাপিত্যেশ করে রাস্তায় অহেতুক সময় নষ্ট করতে হবে না। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় প্রকাশিত যে, কলকাতা শহরের সিংহভাগ যাত্রী (৭২%) বেসরকারি বাসের ভয়াবহ ভিড় ও অনিয়মিত সময়সূচিকেই বাসযাত্রার মূল সমস্যা হিসাবে মনে করছে। অনিয়মিত বাসের সূচির কারণে কখনও দেখা যায় রুটের চালু বাস ফঁাকা, আবার কখনও ভিড়ে ঠাসা। আর রাত যত গভীর হতে থাকে রাস্তা থেকে দ্রুত উধাও হতে থাকে বাস। ফলে কলকাতার মতো মেগাসিটিতে সূর্যাস্তের পরে কাজের বাজারেও সন্ধে নামে বাসের ভয়ে।
বাসের সময়সূচি অনিয়মিত হয়ে উঠলে বাসের উপর যাত্রীদের ভরসা কমতে থাকে। উলটে বাড়তে থাকে অটো কিংবা মেট্রো রেলের উপর নির্ভরতা। ফলে বাস থেকে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাসের আর্থিক সংকটও বেড়ে চলে।

দূষণ ও গণপরিবহণ
বাসের মতো গণপরিবহণ মানুষের সুলভে যাতায়াতের চাহিদাকে পূরণ করার পাশাপাশি শহরকে দূষণমুক্ত রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সন্দেহ নেই– যাত্রীপিছু দূষণের পরিমাণ মোটরসাইকেল কিংবা চার চাকার গাড়ির চেয়ে বহুগুণে কম বাস কিংবা মেট্রো রেলে। অথচ, গত দশ বছরে শহরে বাসের সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। গণপরিবহণে বাসের এই ঘাটতি পূরণ হচ্ছে শহরের রাস্তায় মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে চার চাকা গাড়ির বৃদ্ধি দিয়ে। লক্ষ-লক্ষ এমন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে বাড়ছে শহরে যানদূষণ এবং বায়ুদূষণ।

এমন প্রেক্ষিতে শহরে দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি বা ‘পিপিপি’ মডেলে যৌথ মালিকানায় শহর-শহরতলি জুড়ে বিদ্যুৎচালিত বাসের প্রসার। এই প্রেক্ষিতে শহরের মেট্রো রুটগুলিকে মূল ‘আর্টেরিয়াল রুট’ হিসাবে ধরে– বাস এবং অটোকে– তার পরিপূরক রুট হিসাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি পরিবহণের মিশেলে গড়ে তুলতে হবে শহরে গণপরিবহণের ‘বিকল্প’ ব্যবস্থা। আশা, নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় বিবেচিত হবে রাজ্যের সমাজ-জীবনের এই অতি প্রয়োজনীয় চাহিদাটি।

(মতামত নিজস্ব)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.