জাতপাত, ধর্ম রাজনৈতিক সন্ত্রাস ইত্যাদির আতঙ্কে যাঁরা কের ভূখণ্ডে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, এবং সেই দুর্বিপাকে রুজি-রুটি থেকে পরিচয় সব হারাতে বাধ্য হয়েছেন, যাঁদের পিছনে ফেরার দরজা বন্ধ, তারাই রিফিউজি। ২০ জুন ছিল বিশ্ব উদ্বাস্তু দিবস।
আরও পড়ুন:
বয়সের ভারে ন্যুজ একজন বৃদ্ধ শহরের রাজপথে প্রাণস্পন্দিত দেহটাকে কোনওমতে টেনে নিয়ে চলেছেন। তাঁর কাঁধের বাঁকের একটি ঝুড়িতে কিছু জিনিসপত্র, অন্যটিতে এক মুমুর্ষু শিশু। বৃদ্ধের শেষ পার্থিব সম্বল। তাঁর নাতি। বন্যায় চাষের জমি, বাড়ি, সন্তান- সব হারিয়েছেন। কিন্তু ফের চাষের আশা সম্বল করে বংশের শেষ বাতিটিকে পুনর্জন্ম দেওয়ার সংকল্প ছাড়েননি। চরিত্রটি পার্ল, এস. বাক-এর ‘দ্য রিফিউজি’ (‘দ্য ফার্স্ট ওয়াইফ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ সংকলনের অন্তর্গত, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪)।
কারা ‘রিফিউজি’! বিশ্বের ভাল-মন্দের অভিভাবক রাষ্ট্র সংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী-জাতপাত, ধর্ম, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ইত্যাদির আতঙ্কে যাঁরা কেবল প্রাণটুকু হাতে নিয়ে বহু পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে অজানা, অচেনা কোনও দেশে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, এবং সেই দুর্বিপাকে রুজি-রুটি থেকে পরিচয় সব হারাতে বাধ্য হয়েছেন, যাঁদের পিছনে ফেরার দরজা বন্ধ, সামনে বেঁচে থাকা নিয়ে সমুদ্রসমান অনিশ্চয়তা- তারাই রিফিউজি। রিফিউজি মায়ের বুক আঁকড়ে থাকা সেই শিশুটি, যে হয়তো কোনও দিন জন্মভিটে চাক্ষুষ করবে না, বা, সেই বৃদ্ধটি যিনি স্রেফ সীমাহীন স্মৃতি ছাড়া বাকি সব ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
অসহায় মানুষের ছিন্নমূল হওয়ার ঘটনা মহাপ্লাবনের আকার নিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাগুবে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল এই মাত্র ৬ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৫ কোটি মানুষ দেশছাড়া হলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আগস্ট থেকে ডিসেম্বর, এই ৫ মাসে একই নিয়তির সাক্ষী হলেন ভারত ও পাকিস্তানের প্রায় দেড় কোটি মানুষ। ক্ষত তাতেও শুকল না। পার্টিশনের পরে বিভিন্ন সময়ে দু’-দেশের প্রায় ২ কোটি বাসিন্দার কপালে শরণার্থী পরিচয়ের অসম্মান জুটল।
বিশ্বজুড়ে এঁদের অনেকে নিজভূমে ফেরার মতো সৌভাগ্যবান ছিলেন। নয়ের দশকের হিসাবানুসারে, বছরে গড়ে ১৫ লক্ষ উদ্বাস্তু নিজের দেশে ফিরেছেন। কিন্তু হতাশার কথা- রাজনৈতিক, কুটনৈতিক পাকেচক্রে এ সংখ্যা কমছে। গত দশকে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের হার ছিল বছরে গড়ে মাত্রই ৪ লক্ষ।
এই যে বিশ্বজোড়া শরণার্থী সংকট, দুর্ভাগ্যবশত, তার সবথেকে শোচনীয় শিকার পশ্চিমবঙ্গ। স্রেফ এই রাজ্যেই দেশভাগের সময় ৭২ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেন। ১৯৪৬-‘৭০ সময়পর্বে সরকারি হিসাবে আরও প্রায় ৪০ লক্ষ বাংলাদেশি পশ্চিমবঙ্গের শরণ নেন। ১৯৬১ সালের জনবিন্যাস পরিসংখ্যান বলছে, সেই সময় কলকাতার ১৮% শতাংশ বাসিন্দা ছিলেন ‘রিফিউজি’। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের প্রবলতম শরণার্থীর ঢেউ সামলায় এই বাংলা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের জেরে সে-দেশের ১ কোটি মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে সীমান্তের এপারে আসেন। এর জেরে অবশ্যম্ভাবীভাবে বদলে যায় পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, মানসিকতা, অর্থনীতি এবং রাজনীতির অবয়ব।
এই যে বিশ্বজোড়া শরণার্থী সংকট, দুর্ভাগ্যবশত, তার সবথেকে শোচনীয় শিকার পশ্চিমবঙ্গ। স্রেফ এই রাজ্যেই দেশভাগের সময় ৭২ লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নেন।
‘রিফিউজি’ শব্দটিই যদি কলঙ্ক-মাখা হয়, তাহলে সেই কলঙ্কের জন্য দায়ী কে? প্রাথমিকভাবে সেই দেশটি, যে-দেশটি আর্থিক সামাজিক, মানসিকভাবে বাসিন্দাকে নিঃস্ব করে ছেড়েছে। সেই দেশটির কর্তব্য ছিল, নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখা। জাতপাত, ধর্ম, সম্প্রদায়, রাজনীতি-জনিত যে কোনও হিংসা থেকে আগলে রাখা। নিজ-ভূখণ্ডে সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া। যে-সমস্ত কারণে মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয় তার প্রতিকার করা। তারপরেও কারও মাথার ছাদ আর পায়ের তলার মাটি সরে গেলে এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে – সেই মানুষটি সেই মানুষটি যথাযথ মর্যাদা ও নিরাপত্তায় শিকড়ে ফিরতে পারে। দেশটির কর্তব্য, বাসিন্দাদের ছিন্নমূল হওয়ার দায় স্বীকার করে নিয়ে তার ফিরে আসার উপযুক্ত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক আবহাওয়া এবং পরিকাঠামো সুনিশ্চিত করাই শুধু নয়, প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে ফের দেশের সম্মাননীয় নাগরিক রূপে জায়গা করে করে দেওয়া। কারণ, নাগরিক যদি দেশের জন্য হয়, তাহলে দেশও নাগরিকেরই জন্য।
এর পাশাপাশি আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রেরও ঠিকানাহীন, অসহায় মানুষজনের প্রতি আইনি দায়িত্বও থেকে যায়। রাষ্ট্র সংঘের ১৯৫১ সালের ‘রিফিউজি কনভেনশন’ এবং ১৯৬৭-র প্রোটোকল অনুযায়ী শরণার্থীকে এমন কোনও জায়গায় ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তাঁর প্রাণের ঝুঁকি আছে। তাঁদের আশ্রয় চাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। শরণার্থী, বিশেষত শিশুদের আটক রাখা যাবে না। উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও রুজির ব্যবস্থা করতে হবে। এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, সব হারিয়ে আসা মানুষগুলি যেন অবহেলার, হিংসার, পক্ষপাতিত্বের এবং শোষণের শিকার না হয় সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে হবে।
বিপরীতে, আশ্রয়প্রার্থীদেরও কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। যেমন, যে-দেশ শরণ দিয়েছে, সে-দেশের আইনের ও সমাজের অনুশাসন মেনে চলা। তাঁদের আচার-আচরণে শৃঙ্খলা, রীতিনীতি বা ঐতিহ্যকে অসম্মান না করা। উদ্বাস্তুর জীবনযাপন মসৃণ রাখতে সবথেকে গুরুদায়িত্ব অবশ্যই রাষ্ট্র সংঘের বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষত, ‘ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিজ’ বা ‘ইউএনএইচসিআর’-এর। অন্য কারও হঠকারিতায় বা ব্যর্থতায় রাতারাতি সব হারানো মানুষগুলির কাছে বিশ্বকে বাসযোগ্য করে রাখার দায়িত্ব কোনও এক পক্ষের নয়। এই দায়ভার আশ্রয়দাতা দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্র, রাষ্ট্র সংঘ, বস্তুত সমগ্র বিশ্বের। সেই বিবেচনাতেই রাষ্ট্র সংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন রিফিউজিজ’ রচনা করে ৪টি পদক্ষেপে জোর দেয়- আশ্রয়দাতা দেশের উপর থেকে শরণার্থীজনিত সামাজিক, বিশেষত, আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ ভাগ করে নিতে হবে। উদ্বাস্তুদের আত্মনির্ভরতা বাড়াতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে শরণার্থী-সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে হবে এবং মূল দেশটিতে তাঁদের স্বমর্যাদায় এবং নিরাপদে ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
কিন্তু শরণার্থীদের নিজভূমে ফিরে যাওয়ার স্নান পরিসংখ্যান জানিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক বিশ্ব শিকড়-ছেঁড়া, বুকে এক অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলির সমস্যার তেমন সুরাহা করতে পারেনি। অথচ এ ছিল সভ্যতার সামনে এক নৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। হাজারো কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বেড়া টপকে পৃথিবী আগামীতেও এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে কি না, প্রতিটি বৃদ্ধ তাঁর জন্মভিটেতেই শেষ শ্বাস ফেলতে পারবেন কি না, প্রতিটি শিশুকে তার বাপ-পিতামহর ঘ্রাণ নেওয়া বাতাসেই ঘিরে থাকতে পারবে কি না-বিশ্ব উদ্বাস্তু দিবস এবারও সে উত্তর খুঁজেছে। (মতামত নিজস্ব)
সর্বশেষ খবর
-
৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার, বিশ্বকাপে ভিনদেশে ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে আয়োজকরা
-
প্লেয়ারদের উদ্দেশে ডিম, পতাকা পোড়ানো! ফিরছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ‘কলঙ্কিত’ ম্যাচের ইতিহাস?
-
নবম শ্রেণির পাঠ্যে এবার এসআইআর! এনসিইআরটি-র সিদ্ধান্তকে স্বাগত বিজেপির, প্রশ্ন বিরোধীদের
-
কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা, আর্থিক অনটন? হাতের তালুতে এক চিমটি লবণেই সমাধান! জানাচ্ছে বাস্তুশাস্ত্র
-
৬৪ বিঘায় প্রাসাদ-ভেড়ি, হিন্দু মহিলাদের বলপূর্বক বিয়ে! বিরাট উত্থান গোসাবার তৃণমূল নেতা সুবিদ আলির