শুনতে একটু হেঁয়ালির মতো লাগবে ঠিকই, কিন্তু তাতে কী? ক্রিকেটীয় পরিভাষায় অনায়াসেই বলা যায়, শূন্য রানে চার-চারটি উইকেটের পতন ঘটে গিয়েছে। এমন আগুন-ঝরা বোলিংয়ের মোকাবিলায় ইনিংস কতক্ষণ স্থায়ী হবে কেউ জানে না। প্রথম উইকেট কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী
ধর্মেন্দ্র প্রধানের। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র (সিজেপি) যন্তর মন্তর দখলের প্রথম বলি এত দ্রুত হবে, সত্যি বলতে কী কেউ ভাবেনি। না ভাবার কারণও ছিল বিস্তর। ১২টা বছর ধরে জনতার রায় মাথায় নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার যেভাবে ফঁাকা মাঠে গোল দিয়েছে, তাতে কু গাওয়ার কোনও কারণ সত্যিই ছিল না। কিন্তু ২০ জুলাই সিজেপির সংসদ অভিযান রুখতে বেপরোয়া দিল্লি পুলিশ সরকারের সব অঙ্ক গুবলেট করে দেয়। ৫ দিনের মাথায় ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরেও পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে ছিল যে, সংসদ এড়ানো ছাড়া নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর উপায় ছিল না।
আরও পড়ুন:
শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় উইকেট দু’টি ফেলল এক ওভারে। হায়দরাবাদের বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ’-এর (নালসার) শিক্ষার্থীরা উপাচার্যর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, আরশোলাদের আন্দোলন ভাঙতে পুলিশি অত্যাচারের ভিডিও যিনি দেখতে চাননি, আদালতের সময় নষ্ট না করার নির্দেশ যিনি দিয়েছিলেন, সেই প্রধান বিচারপতির হাত থেকে তারা স্নাতক ডিগ্রি নিতে নারাজ। সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য উপাচার্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে, যাঁর আলটপকা মন্তব্য থেকেই সিজেপি-র জন্ম।
আরও পড়ুন:
সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস সরাসরি মননের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন।
নালসারের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান শিক্ষকদের একাংশও। জেন জি রোষ কেমন সূর্যকান্ত তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ কীভাবে জনরোষে পরিণত হচ্ছে তা চাক্ষুষও করেছেন। দেখেছেন, কীভাবে নালসারের পাশে সমর্থনের ডালি নিয়ে দঁাড়িয়ে পড়েছে বেঙ্গালুরুর ‘ন্যাশন্যাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’ (এনএলএসআইইউ)। প্রধান বিচারপতি বিচক্ষণ মানুষ। কালক্ষেপ না করে জানিয়ে দিয়েছেন, আমন্ত্রণ গ্রহণই যখন করেননি, তখন সমাবর্তনে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
তৃতীয় উইকেটটা পড়ে যায় রাতারাতিই। নালসারের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’-র চেয়ারম্যান বিজেপির রাজ্যসভার সভাপতি মননকুমার মিশ্র স্বঘোষিত অভিভাবক সেজে সম্ভাব্য ল গ্র্যাজুয়েটদের শায়েস্তা করতে উপাচার্যকে চিঠি লিখে বলেন, তাঁদের অনুমোদন ছাড়া ২০২৬ সালের গ্র্যাজুয়েটরা কোনও রাজ্যে আইনজীবী হিসাবে নাম নথিভুক্ত করতে পারবে না। এত দিন আরশোলারা চুপ থাকা সিজেপি মননের হুমকিতে নড়েচড়ে বসে। অভিজিৎ দিপকে ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন, ‘আইন পেশার সব আরশোলা জোটবদ্ধ হলে কেমন হবে?’ সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস সরাসরি মননের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন। বিজেপি ঘরপোড়া গরু। যন্তর মন্তরের ঘা এখনও টাটকা। চার ঘণ্টার মধ্যে নিদান প্রত্যাহার করে মননকুমার মিশ্র ঢোক গিললেন।
১৮ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখলেন। মোদি আমলে এত দ্রুত মন পরিবর্তন কে কবে দেখেছে? মনে রাখা ভাল, ১৪ মাস ৫ দিন পর বিতর্কিত ৩টি কৃষি আইন প্রত্যাহত হয়েছিল। চতুর্থ উইকেটটা পড়েছে বিরোধী-শাসিত ঝাড়খণ্ডে। সেখানেও বিজয়ী শিক্ষার্থী সমাজ। তিন সপ্তাহ আন্দোলনের পর পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী
হেমন্ত সোরেন। তাঁর সরকারের জোট শরিক কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীল আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করছিলেন। সোরেনকে চিঠি লিখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসার প্রস্তাবও দেন। হেমন্তও বুঝতে পারছিলেন, দাবি
না-মানা হবে হঠকারিতার শামিল।
১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে আরশোলাদের ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন।
‘স্টাফ সিলেকশন কমিশন’ ও ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন’-এর নিয়োগ পরীক্ষা ও টিডিপিএলের মাধ্যমে হওয়া সব নিয়োগ বাতিল করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। সিবিআই তদন্তের দাবি এখনও মানেননি। পড়ুয়ারা কী করবেন তা ক্রমশ প্রকাশ্য। এরই পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে ঘটে চলেছে নানা ঘটনা। জেন জি-দের দেখে উদ্বুদ্ধ জেন আলফা, মানে ২০১০ থেকে ’২৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া কচিকাঁচার দল উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রে দাপাদাপি শুরু করেছে।
১৫ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে আরশোলাদের ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন। গ্রামগঞ্জের সরকারি স্কুলের বেহাল অবস্থা শোধরাতে তারা জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। অভিজিৎ দীপকে মহারাষ্ট্রে তঁার জেলা ছত্রপতি শম্ভাজিনগরের একটা ভিডিও ছেড়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় হোর্ডিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশের ছবি-সহ সরকারের জয়গান। দীপকের দাবি, বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার আত্মপ্রচারে খরচ করছে, তা দিয়ে গ্রামগঞ্জের স্কুলের পরিকাঠামো তৈরি করা হোক।
শিক্ষক নিয়োগ হোক। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা ঠিক করা হোক। শৌচালয় তৈরি করা হোক। পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হোক। চেয়ার-টেবিল, আলো-পাখা দেওয়া হোক। অভূতপূর্ব সাড়া পড়েছে ককরোচদের এই আহ্বানে। ১০-১২ বছরের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউ-সহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের তোয়াক্কা না করে পথ অবরোধ করেছে। তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ ও প্রশাসন। গোদি মিডিয়া নয়, সামাজিক মাধ্যম ছেয়ে গিয়েছে রাজ্যে রাজ্যে জেন আলফা-র এই প্রতিবাদে।
স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘দিমাগি নকশাল’ বলে কাদের বিঁধতে চাইলেন?
এরই পাশাপাশি ফুটে উঠছে আরও এক ছবি। সিজেপি নেতাদের ঠেকাতে রাজস্থান সরকার হুকুম জারি করেছে, কোনও সরকারি স্কুলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনও বহিরাগত প্রবেশ করতে পারবে না। ছবি বা ভিডিও তুলতে পারবে না। অর্থাৎ, সরকারি স্কুলের হাল কেমন তা সরেজমিনে দেখা যাবে না। এর থেকে কী বোঝা যাচ্ছে?
বোঝা যাচ্ছে, সরকারের ভয় দ্রুত কেটে যাচ্ছে। যন্তর মন্তর যে চেতনা জাগিয়ে তুলেছে, জেন জি ও জেন আলফা-র মধ্যে তা প্রবলভাবে সংক্রমিত। এত দিন যারা ভয়ে কুঁকড়ে ছিল, তারা এখন সরব। তারা প্রশ্ন করছে। সরকারকে ভীত করে তুলছে। নইলে এভাবে পটাপট উইকেটের পতন ঘটত না। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন প্রশ্ন। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘দিমাগি নকশাল’ বলে কাদের বিঁধতে চাইলেন? নকশালপন্থী ও মাওবাদীদের মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন সাতকাহন করে প্রচার করছেন, তখন হঠাৎ ‘দিমাগি নকশাল’ বলে কাদের চিহ্নিত করতে চাইলেন প্রধানমন্ত্রী?
কাদের তিনি বিপথগামী মনে করছেন? কাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে চাইছেন? বিরোধীদের? না কি জেন জি-কে?
দু’-দিন ধরে মিডিয়ায় এই নিয়ে চাপানউতর চলছে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে। কংগ্রেসের চিদম্বরম, পিডিপি-র মেহবুবা মুফতি, আপের অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নেতা বুক বাজিয়ে নিজেদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে জাহির করেছেন। সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর হাস্যকর ব্যাখ্যা বিতর্ক থামাতে ব্যর্থ। তবে কি মনে করতে হবে ‘আরবান নকশাল’, ‘খান মার্কেট গ্যাং’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, ‘আন্দোলনজীবী’ বা ‘দেশদ্রোহী’-র ধার কমে গিয়েছে? তাই ‘দিমাগি নকশাল’ নয়া সংযোজন?
আরশোলারা কিন্তু ভয় পায়নি। সিজেপি নেতাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য তারা।
যদিও কেন্দ্রের তরফে কিরেন রিজিজু মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট, ২০২৬) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে ঠিক কাদের বোঝাতে চেয়েছেন। রিজিজুর কথায় উল্লিখিত: যারা বিচ্ছিন্নতাবাদকে প্রশ্রয় দেয় ও দেশের অখণ্ডতা নষ্ট করতে চায়, যারা মাওবাদীদের পক্ষে ও সংবিধানের বিরোধী, যারা আর্টিকল ৩৭০ পুনর্বহালের দাবি রাখে, যারা
“চিকেন’স নেক”-এর ভাঙন চায়, তারা-ই প্রকৃত ‘দিমাগি নকশাল’। বিরোধীদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলেননি প্রধানমন্ত্রী।
আরশোলারা কিন্তু ভয় পায়নি। সিজেপি নেতাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য তারা। কারণ, তারা অকুতোভয়। সৌরভ দাস তাই প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লিখেছেন– “শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে আপনি এত সহজে কীভাবে নকশাল বলে দাগাতে পারেন? তারা আপনার সরকারকে প্রশ্ন করছে বলে? স্রেফ এই কারণে?
এ তো চরম ঔদ্ধত্য! সমস্যা সমাধানে চরম অযোগ্যতা। শুনুন, ‘দিমাগি নকশাল’ বা যা কিছু বলুন, এসব আর কাজে দেবে না। ঘণ্টা বেজে চলেছে। সবাই জেগে গিয়েছে।”
জাগরণ তো বটেই। নইলে এমন টপাটপ উইকেট পড়ে?
(মতামত নিজস্ব)
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
‘আমার যৌবন, বেডরুম নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন’, রামদেবকে চরম তোপ কঙ্গনার!
-
এবার উবেরেই কাটা যাবে ট্রেনের টিকিট, অ্যাপে নয়া অপশন, স্টেশন পর্যন্ত থাকছে বিশেষ ক্যাবও!
-
অতিবৃষ্টি ও ডিভিসির জলে বন্যার ভ্রুকুটি! খতিয়ে দেখতে সবং, আরামবাগ যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী
-
এবার আউটডোরেও আধার! ‘বিতর্কিত’ নিয়মে ডোমকল হাসপাতাল থেকে ফিরতে হচ্ছে রোগীদের
-
রাম মন্দিরের প্রসাদের নামে সাধারণ মিষ্টি বিক্রি! আমাজনকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা কেন্দ্রের