অার্থিক বৃদ্ধি নিয়ে স্বপন দাশগুপ্ত অবোধ্য সংখ্যাতত্ত্বে যাননি। কর্মসংস্থানের ভুয়ো প্রতিশ্রুতিতেও বিশ্বাসী নন। সরকারি স্তরে কীভাবে অাগামী ১ বছরে ১ লক্ষ চাকরি দেওয়া হবে, তা ভেঙে ভেঙে বলেছেন। সর্বোপরি, তঁার বাজেট অভিভাষণটি অভিনব, যেন অমূল্য নথি।
স্বপ্নের বাজেট হয়তো একেই বলে! রাজে্যর বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট যে চমকপ্রদ হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কয়েক দিন অাগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, একটি দেখার মতো ‘বাজেট’ হবে, যেখানে রাজে্যর সমস্ত স্তরের মানুষ ও এলাকার উল্লেখ থাকবে। বাস্তবেও একেবারে তাই। তৎসহ অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্তর ৫০ পাতার বাজেট-ভাষণ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী, স্বতন্ত্র। রাজ্যবাসীর জন্য এক অমূল্য নথিও।
ধৈর্য ধরে এই ভাষণটি পাঠ করলে রাজে্যর ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি ও অধিবাসীদের সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা যেমন গড়ে ওঠে, তেমনই বর্তমান সরকার কীভাবে একটি অাধুনিক পশ্চিমবঙ্গ গড়তে কর্মসূচি গ্রহণ করছে– তার একটি স্বচ্ছ ছবিও পাওয়া যায়। এলাকা ও ক্ষেত্র ধরে ধরে এত খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ বিস্ময়কর। অামরা যে প্রথাগত বাজেট-ভাষণ পড়তে এত দিন অভ্যস্ত, এটি একেবারেই তার বাইরে। বাজেট-ভাষণটির গেরুয়া মলাট থেকে শুরু করে প্রচ্ছদের ছবিও চিরাচরিত বাজেট পুস্তিকার মতো ‘শুষ্কং কাষ্ঠং’ নয়। প্রচ্ছদে রাজে্যর মানচিত্র ও কয়েকটি প্রতীকী ছবির পাশে লেখা রয়েছে: ‘পঞ্চশক্তি, সমৃদ্ধি, সোনার বাংলা’। এটিই এই বাজেটের ‘থিম’ বলা যেতে পারে।
৫টি শক্তির ভিত্তিতেই বাজেট ভাষণকে মূল ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। অতীতে বাজেট-ভাষণে দেখা যেত, সরকারের বিভিন্ন দফতর ধরে ধরে কিছু প্রকল্প ও বরাদ্দের ঘোষণা।
‘পঞ্চশক্তি’ হল– সেবাশক্তি, নির্মাণশক্তি, জ্ঞানশক্তি, জীবনশক্তি এবং শিল্পশক্তি। এই ৫টি শক্তির উপর ভর করেই কীভাবে সোনার বাংলা গড়ে উঠবে ও রাজে্যর সমৃদ্ধি অাসবে, তা ৫০ পাতার ভাষণে যুক্তিসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে । ৫টি শক্তির ভিত্তিতেই বাজেট ভাষণকে মূল ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। অতীতে বাজেট-ভাষণে দেখা যেত, সরকারের বিভিন্ন দফতর ধরে ধরে কিছু প্রকল্প ও বরাদ্দের ঘোষণা। কিন্তু সরকারের কাজ ও সমগ্র অর্থনীতিকে এইভাবে ৫টি ভাগে ভেঙে ‘উন্নয়ন’-এর একটি সামগ্রিক ছবি অঁাকার প্রয়াস সতি্যই অভিনব। এইভাবে বাজেট উপস্থাপনার জন্য রাজে্যর অর্থমন্ত্রী নিশ্চিত করেই কৃতিত্বের দাবি করতে পারেন।
শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিক রূপে দেশে খ্যাত রাজে্যর অর্থমন্ত্রী তঁার ভাষণে পরিসংখ্যানের ‘জাগলারি’ করার চেষ্টা করেননি। অার্থিক বৃদ্ধি নিয়ে তিনি অবোধ্য সংখ্যাতত্ত্বে যাননি। কর্মসংস্থানের ভুয়া প্রতিশ্রুতিতেও তিনি বিশ্বাসী নন। সরকারি স্তরে কীভাবে অাগামী ১ বছরে ১ লক্ষ চাকরি দেওয়া হবে, তা তিনি ভেঙে ভেঙে বলে দিয়েছেন। সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে শুরু করে ‘অাশা’-কর্মী, প্যারাটিচার প্রমুখ– যারা চুক্তির ভিত্তিতে সরকারের কাজ করে– তাদের প্রত্যেকের ভাতা বাজেটে বৃদ্ধি হয়েছে। রাজ্য সরকারি কর্মীদের একলপ্তে ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি তো ঐতিহাসিক! কিন্তু এসব নিয়ে ঢক্কানিনাদ করে বাজেটের মূল লক্ষ্য থেকে নজর ঘোরানো হয়নি। এটা যে কর্মীদের প্রাপ্য, তা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে।
সরকারি কর্মীদের কাজ ও পরিষেবাকে কীভাবে অারও অাধুনিক ও উন্নত করা যায়, সে নিয়ে বরং ভাষণে রয়েছে একগুচ্ছ সংস্কারের প্রস্তাব, যা ‘সেবাশক্তি’ হিসাবে চিহ্নিত। এভাবেই ‘নির্মাণশক্তি’-তে রয়েছে রাজে্যর পরিকাঠামো ক্ষেত্রে একাধিক নতুন প্রকল্প ও পরিকল্পনার প্রস্তাব। যেগুলি বহু ক্ষেত্রে তৈরি হবে কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের সহায়তায়। এটি প্রত্যাশিতই ছিল। এসব প্রকল্পের রূপায়ণ যে বাংলাকে কয়েক বছরের মধে্য ঝঁা-চকচকে করবে, তা নিয়ে সংশয় নেই। সেই সঙ্গে নিয়ে অাসবে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান।
শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিক রূপে দেশে খ্যাত রাজে্যর অর্থমন্ত্রী তঁার ভাষণে পরিসংখ্যানের ‘জাগলারি’ করার চেষ্টা করেননি। অার্থিক বৃদ্ধি নিয়ে তিনি অবোধ্য সংখ্যাতত্ত্বে যাননি।
‘জ্ঞানশক্তি’ বাজেট-ভাষণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ। অাধুনিক ব্যবসা-বাণিজে্যর জন্য চাই উন্নত মানবসম্পদ। আর এই প্রশিক্ষিত মানবসম্পদই হতে পারে রাজে্য লগ্নি টানার ইউএসপি। সেটা করার রোডম্যাপ রয়েছে বাজেটের এই অংশে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল: কেন্দ্রের অর্থে উত্তরবঙ্গে একটি অাইঅাইটি ও অাইঅাইএম স্থাপন।
‘জীবনশক্তি’-তে বলা হয়েছে স্বাস্থ্য ও কৃষিক্ষেত্রে নানা সংস্কারের কথা। যা রাজ্যবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে ও ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে। এখানেও উত্তরবঙ্গের প্রাপ্তি একটি এইমস। উত্তরবঙ্গের মতো সুন্দরবন ও অাদিবাসী অধু্যষিত এলাকাগুলিও এই ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গুরুত্ব পেয়েছে। সর্বোপরি ‘শিল্পশক্তি’ অংশে রয়েছে, রাজে্য ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানো ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষে্য একাধিক প্রকল্পের প্রস্তাব। রয়েছে দূর্গাপুরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পস্থাপনের সম্ভাবনার কথা। বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে রয়েছে সংস্কারের প্রস্তাব। জমি জট কাটাতে শহরাঞ্চলে জমির ঊর্ধ্বসীমা অাইনে বদল অানার কথা বলা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা দোকান, শপিং মল, রেস্তোরঁা এসব খোলা রাখতে রাজে্যর দোকান ও প্রতিষ্ঠান অাইনে সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনর্জীবিত করার প্রস্তাব রয়েছে। সবমিলিয়ে এত দিনের জগদ্দল পাথরকে নড়ানোর একটা প্রচেষ্টা।
‘জ্ঞানশক্তি’ বাজেট-ভাষণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ। অাধুনিক ব্যবসা-বাণিজে্যর জন্য চাই উন্নত মানবসম্পদ। আর এই প্রশিক্ষিত মানবসম্পদই হতে পারে রাজে্য লগ্নি টানার ইউএসপি।
পূর্বতন সরকারের কোনও ‘সামাজিক প্রকল্প’-কে বন্ধ না করে, ডিএ-সহ সর্বস্তরে ভাতা বাড়িয়ে, নানা অাইনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে, গুচ্ছ গুচ্ছ পরিকাঠামো প্রকল্প ঘোষণা করে এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তৈরির ঘোষণা দিয়ে এক অাধুনিক বাংলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে এই অত্যাশ্চর্য বাজেটে। এই স্বপ্নের বাজেট রূপায়িত হলে ‘সোনার বাংলা’-র বাস্তব চেহারা নিঃসংশয়ে দেখা যাবে।
সর্বশেষ খবর
-
আম-লিচু ছেড়ে বানিয়ে ফেলুন নতুন ধারার ‘সামার ড্রিঙ্ক’, পুষ্টিগুণে ভরপুর কালো জামের শরবত
-
পঞ্চায়েতের গাছ বিক্রির টাকা পার্টি ফান্ডে জমা! বাঁকুড়ায় তৃণমূল নেতাকে কান ধরে ‘ওঠবস’
-
‘বাংলার কাছে প্রমাণ করুক…’, ‘দিদি নম্বর ১’ স্বস্তিকাকে শুভেচ্ছা জানিয়েও চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন রচনা!
-
তৃণমূলে গৃহদাহের মাঝেই বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে অভিষেক
-
ব্রাজিল শিবিরে স্বস্তি, স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ফিরছেন নেইমার, তবে অন্য ভূমিকায়