সফরের উদ্দেশ্য আগেভাগে ঘোষণা করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার দিল্লি এসেছিলেন। বিজেপি-বিরোধী সর্বভারতীয় জোট গঠনের সলতে পাকানোর দায়িত্ব কাউকে না ছেড়ে নিজেই হাতে নিয়েছেন তিনি। বিরোধী ঐক্যের জমি প্রস্তুতির কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই- দিল্লি সফর কি সেই আভাস দিচ্ছে? লিখছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘরে ফেরার আগে জীবনানন্দীয় স্টাইলে ‘আবার আসিব ফিরে’ উচ্চারণের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “এখন যাচ্ছি। কিন্তু এবার থেকে দু’মাস অন্তর দিল্লি আসব।” বেশ বোঝা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক দিল্লি সফর ওঁকে কতটা চনমনে করে তুলেছে।
সফরের উদ্দেশ্য আগেভাগে ঘোষণা করেই মমতা এবার দিল্লি এসেছিলেন। কী করতে চান, সেই বার্তা ২১ জুলাইয়ের ভার্চুয়াল সভায় সরাসরি দিয়েওছিলেন। বিজেপি-বিরোধী সর্বভারতীয় জোট গঠনের সলতে পাকানোর দায়িত্ব কাউকে না ছেড়ে, নিজেই হাতে নিয়েছেন। রাজ্যে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করার পর রাজনীতির লোহা এখনও গরম। দেরি না করে তাই ঘা-মারার হাতুড়ি হাতে তুলেছেন। কতটা সফল হবেন, পরের কথা। আপাতত তাঁর এই সফর রাজনীতির পানাপুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো এক তরঙ্গ তুলেছে। সব মহলই একটু নড়েচড়ে বসেছে।
[আরও পড়ুন: তবে কি এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী?]
রাজনৈতিক কোনও সফরের গুরুত্ব কতটা, তা মাপার একটা সাধারণ মাপকাঠি হল মিডিয়া। নানা সময়ে মমতা দিল্লি এসেছেন। তাঁকে নিয়ে স্বাভাবিক কৌতূহলও মিডিয়া দেখিয়েছে। কিন্তু এবারের সফর যেন ব্যতিক্রম। বহু বছর পর ন্যাশনাল মিডিয়াকে দেখা গেল, মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে এতটা মাতামাতি করতে। উথাল-পাথালহীন একপেশে রাজনীতিতে মিডিয়ার ক্লান্তিবোধ সেই মাতামাতির কারণ হতে পারে।
রাজনীতি ও হিমবাহ প্রায় সমতুল্য। দৃশ্যমান যতটা, অগোচরে থাকে তার চেয়ে ঢের বেশি। আলোচনা যদিও চলে ওই দৃশ্যমানতা ঘিরেই। সেই নিরিখে বিরোধী ঐক্যের জমি প্রস্তুতির কাজটাই মমতাকে কেন্দ্র করে পাক খেয়ে চলেছে। জট ছাড়িয়ে জোট গঠন কতটা মসৃণ, কতটা সর্বজনীন এবং অ-বিতর্কিত হতে পারে, এই মুহূর্তে আলোচনার শীর্ষে তারই অবস্থান ও প্রাধান্য।
প্রশ্ন পাক খাচ্ছে প্রধানত দু’টি বিষয়কে কেন্দ্র করে। বিরোধী জোট কতটা মজবুত হতে পারে এবং বিজেপিকে তা কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারবে কি না। অন্যভাবে, বিজেপি কি এই কারণে বিচলিত? কিঞ্চিৎ নার্ভাস?
একথা ঠিক, ভোটের এতদিন আগে থেকে বিরোধী জোট গঠনের এমন উদ্যোগ আগে দেখা যায়নি। দৃশ্যমান এই তাগিদ সত্য হলে বলতেই হবে, বিজেপির সর্বগ্রাসী চরিত্র ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণবাদের ব্যাপকতা তার কারণ। লোকসভা ভোটের তিন বছর বাকি থাকতে জোটবদ্ধতার এই ঔৎসুক্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিরোধী পরিসর কতটা সংকুচিত ও বিরোধী রাজনীতি কতখানি কোণঠাসা। তাছাড়া, কেন্দ্রীয় স্তরে জোটরাজনীতির যেসব নমুনা জনসমক্ষে রয়েছে, যা কিনা ভোটের কড়া নাড়ার সময় কোনওরকমে গড়ে তোলা এবং সেই কারণেই ঠুনকো প্রতিপন্ন হয়েছে, তার প্রতি জনতার আস্থা হ্রাস পেয়েছে। সেই কারণে জোট যেমন হয়েছে, ভোট মিটলে জোট তেমন ভেঙেও গিয়েছে। ভোটের আগে হাতে-গরম জোট গঠনে কাজের কাজ যে হয় না- সেই উপলব্ধিই এবার আগেভাগে কোমর কষে নামার কারণ হলে এক রকম। না হলে সেই থোড়-বড়ি-খাড়ার অনিবার্য বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
বিরোধী জোটের মজবুত হওয়ার প্রশ্নটি অতএব কয়েকটি ‘যদি’-র উপর নির্ভরশীল। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন জোটের সম্ভাব্য শরিক হিসাবে যাদের দেখা হয়, দিল্লি এলেই যে-নেতাদের সঙ্গে মমতা সচরাচর দেখা করেন, কথা বলেন, হয়তো ভরসাও রাখেন, তাঁদের বাইরে রয়েছে আরও এক স্বতন্ত্র বৃত্ত। সেই বৃত্তের চারটি দলের মতিগতির উপর মজবুতির প্রশ্নটি ঝুলে থাকবে। এখনও পর্যন্ত তাদের কাছে টানার সেরকম কোনও উদ্যোগ কিন্তু চোখে পড়েনি। গত সাত বছরের চিত্রনাট্য দেখাচ্ছে, ‘ঝাঁকের কই’ না হয়ে ওই দলের নেতারা বাস্তবকে স্বীকার করে ঘরের চেনা উঠোনে নিজেদের আবদ্ধ রাখতে ভালবেসেছেন। ওড়িশার নবীন পট্টনায়েককে বিজেপি তাই ঘাঁটায় না। অন্ধ্রপ্রদেশের জগনমোহন ও তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাওকে নরমে-গরমে বশে রেখেছে। উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর চারধারে টেনে দিয়েছে লক্ষ্মণের গণ্ডি। নির্বিবাদে রাজ্য চালনার লাইসেন্স না দুর্নীতিদমন দণ্ডের ভীতি- বিজেপিকে না ঘাঁটানোর নেপথ্যে কোন তাগিদ এই দলগুলোকে তাড়া করে ফিরছে, সেই জল্পনা রাজনৈতিক পরিসরে বারবার উঠেছে। কারণ যাই হোক, প্রতিদান প্রতিফলিত রাজ্যসভায়। গত সাত বছরে বিতর্কিত একটা বিলও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী’-রা উচ্চকক্ষে আটকাতে পারেনি! এই আনুগত্য আদায় করতে পারা সংসদীয় গণতন্ত্রে অবশ্যই শাসকের কৃতিত্ব।
এই বৃত্তের মনোহরণের কোনও চেষ্টা জোটপন্থী মহলে আদৌ রয়েছে কি? মুখ্যমন্ত্রীর এবারের সফর তো অবশ্যই, অন্যত্রও তার কোনও আভাস কিন্তু নেই। সফর ঘিরে আভাস যেটুকু ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তা তৃণমূল নেত্রীর নেতৃত্বদানের ক্ষমতা ও গুণ-সম্পর্কিত। নইলে দলীয় বৈঠকের পর সংসদীয় দলের সদস্যরা তাঁকে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ বলে চিহ্নিত করতেন না। মমতা নিজেও সেই দাবিকে হেঁয়ালিতে মুড়ে রাখতে ভালবেসেছেন। জোটের নেতৃত্ব নিয়ে মিডিয়ার প্রশ্ন ও তাঁর ‘জ্যোতিষী নই’-জাতীয় জবাব তার প্রমাণ।
কংগ্রেসকে বাইরে রেখে বিজেপি-বিরোধী কোনও জোট সম্পূর্ণ হতে পারে না। ১০ জনপথে গিয়ে সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মমতার বৈঠক সেই সত্যকে মান্যতা দিয়েছে। এবং তা দেওয়া হল সলতে পাকানোর আদিতেই। এখান থেকেই জন্ম সেই অমোঘ প্রশ্নের। জোটের মুখ কে হবেন? লোকসভার পর পর দু’টি নির্বাচনে এটা প্রমাণিত, মুখহীন জোট ও অ-জমাট দই প্রায় সমার্থক। শুধু জাতীয় স্তরেই নয়, পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির তরী তীরে না ভেড়ার অন্যতম কারণ ছিল তাদের ‘মুখহীনতা’। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদি সফল না ব্যর্থ, ভাল না মন্দ, কাজের না অকাজের- এসব বিতর্ক পাশ কাটিয়ে তাই উঠে আসছে সম্ভাব্য বিরোধী মুখের কোলাজ। সত্যি এই যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো সর্বজনগ্রাহ্য কোনও বিরোধী মুখ এই মুহূর্তে দেশবাসীর সামনে নেই। সেই শূন্যতা আগেভাগে ভরানোর জন্যই কি এত আগে থেকে তৃণমূলনেত্রীর এমন তাগিদ? প্রশ্নটা উঠেছে। রাজনৈতিক জল্পনার পালে বাতাস জুগিয়েছেন মমতা স্বয়ং ও তাঁর হেয়ালি।
রাজনীতিক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জার হওয়ার পূর্ণ হক মমতার আছে। টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রাজনৈতিক উত্তরণের এই অভীপ্সা সংগতও। জোটের মুখ হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকা শরদ পাওয়ার বয়সের ভারে দীর্ণ। দুরারোগ্য ব্যাধি তাঁর বাগ্মিতায় থাবা বসিয়েছে। সোনিয়া গান্ধী ইউপিএ-র মুখ হলেও ২০০৪ সালে নিজেকে আড়ালে রেখে মনমোহন সিংকে তুলে ধরেছিলেন। শারীরিক সক্ষমতার মানদণ্ডে তিনিও নড়বড়ে। রাহুল এখনও নিজেকে নিয়ে নিশ্চিত নন। নেতৃত্ব দেওয়ার নমুনা ও নজির রাখতেও ব্যর্থ। তুলনায় মমতা অভিজ্ঞ। তাঁর নিরলস লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা, সাধারণ জীবনযাপন, ঝুঁকি গ্রহণের সাহস, জনমুখী ভাবমূর্তি, দেশ শাসনের আকাঙ্ক্ষা ও সর্বভারতীয় পরিচিতি রয়েছে। নিজেকে তিনি মোদির চ্যালেঞ্জার হিসাবে তুলে ধরতে চাইলে এই আবহে হয়তো তা বেমানানও হবে না। কেননা, বিজেপি যে অজেয় নয়, আঞ্চলিক স্তরে সেই প্রমাণ তিনি রেখেছেন। যদিও জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনও অভিজ্ঞতায় আজও তিনি পরীক্ষিত নন।
বিজেপি বিচলিত- এমন কোনও ইঙ্গিত কোথাও নেই। তিন বছর পরের দৃশ্যকল্প নয়, তাদের ভাবনায় এখন শুধুই উত্তরপ্রদেশ। আঞ্চলিক দলের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা নিয়ে তারা যত না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত কংগ্রেসের পুনরুত্থান ঘিরে। কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার ডাক দেওয়া সত্ত্বেও আর্যাবর্তে কংগ্রেসই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জার। রাজনৈতিক আক্রমণের মূল লক্ষ্যও তাই হতমান ও ক্ষয়িষ্ণু ওই দল এবং তাদের পরিবারতন্ত্র! মাটি কোপানো ও সলতে পাকানো শেষ হলে জোটের মুখ নিরীক্ষণে স্বাভাবিক কারণেই বিজেপি আগ্রহী হবে। তাছাড়া, মোদি বনাম কে, জনতাও সেই প্রশ্নের উত্তর চাইবে।
[আরও পড়ুন: মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই, গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দেশ]
সর্বশেষ খবর
-
পাঞ্জাবে ৪ বছরে শিশুকে ছিঁড়ে খেল পথকুকুর! আর্তনাদ শুনে ছুটে এসেও বাঁচাতে পারল না মা-বাবা
-
প্রেমিকার বাড়িতে ডেকে ৩ মাসের স্ত্রীকে খুন! নেপাল পালিয়েও হল না রক্ষা, পুলিশের জালে অভিযুক্তরা
-
শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিনে পতাকা উত্তোলনের সময় মর্মান্তিক ঘটনা, মৃত্যু বিজেপি কর্মীর!
-
বারুইপুর কাণ্ডে জিরো টলারেন্স, এবার যুক্ত হল গণধর্ষণের ধারাও, পুলিশ হেফাজতে দুই
-
এবার ওয়ানডে ফরম্যাটের এশিয়া কাপ, চূড়ান্ত দিনক্ষণও! বাংলাদেশে যাবেন রোহিত-কোহলিরা?