পাহাড়ের বুকে নির্মল ইতিহাস, পুরজার ‘মিশন পসিবল’

পুরজা আরও একবার ‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গ জয় করতে চেয়েছিলেন। ৩০ জুলাই কারাকোরামের ‘ব্রড পিক’ সামিটের সময় সেই স্বপ্ন চূর্ণ হল।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ৬, ২০২৬, ১৫:৫৮

options
link
পাহাড়ের বুকে নির্মল ইতিহাস, পুরজার ‘মিশন পসিবল’
নির্মল পুরজা। ফাইল চিত্র।

‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া ২০১৯ সালে ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গ সামিট করেছিলেন কিংবদন্তি অভিযাত্রী নির্মল পুরজা– ৬ মাস ৬ দিনে। এই অভিযান ‘মিশন পসিব্‌ল’ নামে খ্যাত। সে রেকর্ড ভেঙে গেলে, পুরজা আরও একবার ‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গ জয় করতে চেয়েছিলেন। ৩০ জুলাই কারাকোরামের ‘ব্রড পিক’ সামিটের সময় সেই স্বপ্ন চূর্ণ হল। তুষারধস কেড়ে নিল নির্মল পুরজা-সহ আরও ১০ জন এলিট অভিযাত্রীকে। লিখছেন পারমিতা রায়

Advertisement

হার মানলেন বিশ্ববিখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজা (সবাই ভালবেসে ডাকতেন ‘নিমস্‌দাই’)। হার মানলেন প্রকৃতির কাছে। ৩০ জুলাই পাকিস্তানের কারাকোরামের ‘ব্রড পিক’-এ (পৃথিবীর দ্বাদশ উচ্চতম শৃঙ্গ। ৮,০৪৭ মিটার) সামিট চলাকালীন ভয়ংকর তুষারধসের কবলে পড়ে মৃত্যু হল নির্মল-সহ ‘এলিট এক্সপেড’ দলের ১০ জন অতিদক্ষ পর্বতারোহীর।

Advertisement

নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসই বটে! কারণ, এই সময়ে ব্রড পিক আরোহণের পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। কারাকোরাম রেঞ্জে ‘গাশারব্রুম ২’ অভিযানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে রওনা দেওয়ার ঠিক আগে, দলের নেতা নির্মল পুরজার ভাবনার পরিবর্তন ঘটে। ‘গাশারব্রুম ২’ সামিট শেষ করে ২৭ জুলাই, সোমবার, এক্স হ্যান্ডেলে নির্মল পুরজা সে-কথা ঘোষণা করেছিলেন‌। জানান: ‘THE MISSION SHIFTS. THE COMPASS HOLDS.’ ব্যাখ্যা করেন যে, পাকিস্তান ছাড়ার আগে যদি তিনি ব্রড পিকে সফল সামিট করতে পারেন, সেক্ষেত্রে ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গের মধ্যে বাকি থাকবে কেবল ‘চো ওয়ু’ (৮,২০১) আরোহণ। আর, সেটি সম্পন্ন হলে– তিনিই পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি রূপে পর্বতারোহণের ইতিহাসে ‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বের প্রতিটি ৮ হাজারি শৃঙ্গের সফল আরোহণকারী পর্বতারোহী হবেন।

Advertisement

তিনি আরও লিখেছিলেন যে, সুযোগ কখনও জানান দিয়ে আসে না, যাঁরা নীরবে কাজ করে যান, সুযোগ তাঁদের কানে কানে ফিসফিস করে কথা বলে। প্রার্থনা করেছিলেন– ‘ব্রড পিক, তোমার কাছে আমি শুধু নিরাপদে ওঠা আর নামার পথটুকু চাই। কোনও পর্বতকেই আমি হালকাভাবে নিই না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য! ব্রড পিকেই ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রাণঘাতী তুষারধসে নিমেষে শেষ হল একরাশ স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা এক দ্রুতগামী অধ্যায়ের।

নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে ‘মিশন পসিব্‌ল’-এর উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় ‘নেটফ্লিক্স’-এর সাড়াজাগানো তথ্যচিত্র ‘ফরটিন পিক্‌স: নাথিং ইজ ইমপসিব্‌ল’ (২০১৯)।

এ স্বপ্নের শুরু ঠিক কবে? নেপালের সামরিক গোর্খা পরিবারে জন্মে, পারিবারিক রীতি মেনে, সামরিক জীবনই বেছে নিয়েছিলেন নির্মল পুরজা। ২০০৩ সালে ১৮ বছর বয়সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টে যোগ দেন। ২০০৯ সালে গ্রেট ব্রিটেনের স্পেশাল ফোর্সে নির্বাচিত হন। ক্রমে পর্বতারোহণের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। ২০১২ সালে প্রথম সামিট করেন লোবুচে পিক (৬,১১৯ মিটার)। কিন্তু আংশিকভাবে কাজের জায়গা আর ভালবাসার পাহাড়কে নিয়ে জীবন চালাতে চাইলেন না তিনি‌। চাকরিতে ইস্তফা দিলেন ২০১৮ সালে। পেনশন, এবং ব্রিটেনের বাড়ি বিক্রি করে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পর্বত অভিযানের জন্য পর্বতপ্রমাণ অর্থের সংস্থান করে নেপালে ফিরে নতুন জীবন শুরু করলেন ব্রিটিশ-নেপালি নির্মল পুরজা।

আধুনিক পর্বতারোহণের গতিধারার আমূল পরিবর্তন ঘটল ‘মিশন পসিব্‌ল’ (অফিশিয়াল নামকরণ: ‘প্রোজেক্ট পসিব্‌ল ১৯/৭’, সাল’ ২০১৯) প্রকল্পের ভিতর দিয়ে। একের-পর-এক রেকর্ড করলেন নির্মল পুরজা‌। সক্ষমতার চরম শিখরে পৌঁছে ৭ মাসে ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গজয়ের যে-সংকল্প করেছিলেন নির্মল, দুনিয়াকে চমকিত করে ৬ মাস ৬ দিনে ‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া সেটি সফল করে তোলেন। সামাজিক মাধ্যমে ‘মিশন পসিব্‌ল’ তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর, এই আশ্চর্য ঘটনা আন্তর্জালবাহিত হয়ে চোখের সামনে মানুষ দেখছে, উপলব্ধি করছে নির্মল পুরজা যে বলেছিলেন ‘অসম্ভব’ বলে কিছু নেই। মানুষ ইচ্ছা করলে সব সম্ভব করতে পারে।

তিনিই বিশ্বে প্রথম, যিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভারেস্ট, লোৎসে আর মাকালুর শৃঙ্গ স্পর্শ করেছিলেন। নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে ‘মিশন পসিব্‌ল’-এর উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় ‘নেটফ্লিক্স’-এর সাড়াজাগানো তথ্যচিত্র ‘ফরটিন পিক্‌স: নাথিং ইজ ইমপসিব্‌ল’ (২০১৯)। আর তাঁর আত্মজীবনী ‘বিয়ন্ড পসিব্‌ল: ওয়ান সোলজার ফরটিন পিক্‌স– মাই লাইফ ইন দ্য ডেথ জোন’ বিশ্ববাজারে বিক্রি হয়েছে হু হু করে। হয়ে উঠছেন জীবন্ত কিংবদন্তি, ‘গ্লোবাল আইকন’।

বাংলার পাহাড়প্রেমী মানুষের স্মৃতিতেও নির্মল পুরজার অজস্র স্মৃতি জমে আছে।

২০২১ সালে ১৬ জানুয়ারি ‘নিমস্‌দাই’, কিলি পেম্বা শেরপা-সহ ১০জন নেপালি পর্বতারোহী যখন ‘কে ২’ সামিট করে নেপালের জাতীয় সংগীত গাইছিলেন– তখন সেই জয় আলাদা মাত্রা পেয়ে যায়। প্রথমত, এর আগে আর কেউ শীতকালীন ‘কে ২’ সামিট করতে সক্ষম হননি। দ্বিতীয়ত, টিমের প্রত্যেকেই নেপালি। এত দিন নেপালি শেরপাগণ ‘রুট ওপেন’-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়ে শৃঙ্গ আরোহণ করলেও ‘সহায়ক’ রূপেই গুরুত্ব পেয়েছেন। ‘গাইড’ হয়ে থেকেছেন (উজ্জ্বল ব্যতিক্রম: তেনজিং নোরগে)‌। নির্মল পুরজা সেই ‘সহযোগী’ তকমা মুছে নেপালিদের পর্বতারোহণের স্পর্ধাকে সামনে আনলেন, মান্যতা দিলেন। এজন্যই তিনি নেপালের জননায়ক।

‘নিমস’ স্বয়ং ব্র্যান্ড। গঠন করেছেন ‘নিমস্‌দাই ফাউন্ডেশন’, স্ত্রী সূচি পুরজা এই ফাউন্ডেশনের কাজে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘এলিট এক্সপেড’ (২০১৭) সংস্থা। নিমস্‌দাই, মিংমা ডেভিড শেরপা, তেজন গুরুং মিলে তৈরি করেন। অভিযান পরিচালনা ছাড়াও নেপালি পর্বতারোহী ও শেরপাদের উপযুক্ত সম্মান এবং স্বীকৃতির জন্য এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। তবে ২০২৩ সালে নির্মল পুরজার রেকর্ড ভেঙে যায়। নরওয়ের পর্বতারোহী ক্রিস্টিন হরিলা ৬ মাস ৬ দিনে ১৪টি ৮ হাজারি পিক সামিটের রেকর্ড ভেঙে দেন। ৮ হাজারের বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট এই ১৪টি শৃঙ্গ আরোহণ করতে ক্রিস্টিন সময় নেন ৩ মাস ১ দিন। যদিও অনেক বিতর্ক। তবু রেকর্ড তো রেকর্ডই। এবং তা তৈরিই হয় ভাঙার জন্য।
নির্মল পুরজা এবার অন্য রেকর্ড তৈরি করতে ব্রতী হলেন। তিনি ১৪টি ৮ হাজারি পিক ‘সাপ্লিমেন্টাল অক্সিজেন’ ছাড়া আবার সামিট করার পরিকল্পনা করেন।

পরের ঘটনাবলি এখন জানা। ব্রড পিকে অসমাপ্ত রয়ে গেল সেই নির্মীয়মাণ ইতিহাস। বাংলার পাহাড়প্রেমী মানুষের স্মৃতিতেও নির্মল পুরজার অজস্র স্মৃতি জমে আছে। মনে থাকার কথা, ২০১৯ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়ে মৃত দুই অভিযাত্রী বিপ্লব বৈদ্য এবং কুন্তল কঁাড়ারকে। অক্সিজেনের অভাবে তঁারা যখন মৃতপ্রায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট শেষে ফেরার পথে ‘ডেথ জোন’-এ নির্মল আপন অক্সিজেন দিয়ে তঁাদের বঁাচানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রয়াসের মধ্যেই চেনা যায় নির্মলের আত্মিক বিশুদ্ধতা, পাহাড় ও অভিযাত্রীর প্রতি ভালবাসা।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক স্কুল শিক্ষক
[email protected]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.