জীবনবিমা প্রকল্প ক্রয় করে খুব খুশি হয়েছেন এমন গ্রাহক পাওয়া সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের ভুল বোঝানো হয়, সঠিক তথ্য দেওয়া হয় না। ঠিক এই জায়গাটাতেই পরিবর্তন আনতে চাইছে ভারতের বিমা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ‘আইআরডিএআই’।
সুজনকুমার দাস: কিছু দিন আগে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নি করতে। কিন্তু ম্যানেজার সাহেব নাছোড়বান্দা– বোঝাতে লাগলেন, ফান্ডের বদলে তঁাদের জীবনবিমা পলিসিতে টাকা রাখা কত লাভজনক, রিটার্ন নাকি দারুণ! ‘জীবন সুরক্ষা’ চাই না, ‘সঞ্চয়’ করতে চাইছি। তাই বিনিয়োগকৃত অর্থের রিটার্ন বেশি পাওয়াটাই আমার উদ্দেশ্য বলার পরেও, তিনি নাছোড়বান্দা।
সোজা প্রশ্ন করলাম, ‘স্যর, মূল টাকা থেকে মোটা অঙ্কের ঝুঁকির খরচ কেটে নেওয়ার পর
বিমা প্রকল্প খঁাটি মিউচুয়াল ফান্ডের চেয়ে বেশি লাভ দেয় কোন জাদুতে?’ বুঝলেন ভুল জায়গায় টোপ ফেলেছেন, তাই তৎক্ষণাৎ রণে ভঙ্গ দিলেন। তবে দোষ ওঁর একার নয়, উপরতলার বেঁধে দেওয়া নির্দয় টার্গেটের বোঝাই হয়তো একজন ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে এমন মিথ্যা স্বপ্ন বেচতে বাধ্য করে।
জীবন বিমা প্রকল্প ক্রয় করে খুব খুশি হয়েছেন এমন গ্রাহক পাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের ভুল বোঝানো হয়, সঠিক তথ্য দেওয়া হয় না। ঠিক এই জায়গাটাতেই পরিবর্তন আনতে চাইছে ভারতের বিমা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ‘আইআরডিএআই’। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পরামর্শপত্রের মাধ্যমে এই পুরনো অচলাবস্থায় জোর ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যেখানে প্রথমবারের মতো বিমা সংস্থাকে সরিয়ে পলিসি গ্রাহককে কেন্দ্রবিন্দুতে বসানোর কথা বলা হয়েছে।
বিশাল বিমা খাতের প্রতিটি পয়সা আসে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বর্তমানে ভারতে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ লক্ষ কোটি টাকার প্রিমিয়াম জমা পড়ে, যার সিংহভাগই সাধারণ মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়। অথচ স্বাধীন ভারতে প্রায় পৌনে তিন দশক ধরে বিমা নিয়ামক সংস্থা ‘আইআরডিএআই’-এর নীতিতে এই সাধারণ পলিসি গ্রাহকরাই ছিলেন অগ্রাধিকারের তালিকায় সবার নিচে। গত আড়াই দশক ধরে ভারতীয় বিমাখাত যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তাতে লাভের সিংহভাগ যেত বিমা কোম্পানি এবং মধ্যস্থতাকারী ব্যাঙ্ক বা এজেন্টদের পকেটে; আর লোকসান ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি বহন করতে হত সাধারণ পলিসি-ধারককে।
তাই কেন এই সংস্কার এত জরুরি, তা বুঝতে গেলে বিমা বিক্রির ভিতরের চিত্রটা পরিষ্কার দেখা দরকার। আর্থিক পণ্য চোখে দেখা যায় না। বাজার থেকে গাড়ি কেনার সময় তার ইঞ্জিন বা মাইলেজ খতিয়ে দেখা যায়, কিংবা খাবার কিনলে সঙ্গে সঙ্গেই তার স্বাদ বোঝা যায়। কিন্তু বিমা এমন এক অদৃশ্য পণ্য, যার আসল উপযোগিতা বা সত্যতা জানা যায় পলিসি কেনার ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর পর। আর এই দীর্ঘ সময়ের সুযোগ নিয়েই বাজারে অবাধে চলে ‘মিস-সেলিং’ বা ভুল বুঝিয়ে পলিসি গছিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত। সাধারণ মানুষকে বলা হয় এতে বিশাল লাভ হবে, জমার টাকা দ্বিগুণ হবে; অথচ মেয়াদ শেষে দেখা যায় সেই বহুল প্রচারিত এনডাওমেন্ট পলিসির বার্ষিক রিটার্ন এসেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও কম। এমনকী ৮০-৮৫ বছরের প্রবীণ মানুষেকেও ভুল বুঝিয়ে আজীবন মেয়াদি জীবন বিমা গছিয়ে দেওয়ার মতো অনৈতিক ঘটনা আমাদের দেশেই অহরহ ঘটছে।
এই বিভ্রান্তিকর বিক্রির মাত্রা কতটা গভীর, তা বোঝা যায় নিয়ামক সংস্থার নিজস্ব পরিসংখ্যানে চোখ বোলালে। ‘আইআরডিএআই’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রথম বছর পর পলিসি চালু থাকার হার মাত্র ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হল, মাত্র ৫ বছর পর– এই হার নেমে আসে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে। সহজ কথায়, ভারতে প্রতি ১০০ জন পলিসি ক্রেতার মধ্যে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ জনই ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পলিসি চালাতে না পেরে বা প্রতারিত হয়ে তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এই মাঝপথে পলিসি বন্ধ হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা ‘সারেন্ডার চার্জ’ এর নামে বিমা কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়। গ্রাহক আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অতিরিক্ত মুনাফা আর চড়া কমিশনের এই অন্ধ লোভের কারণে গোটা বিমা ক্ষেত্রটি নিজেই এখন এক গভীর সংকটে পড়েছে। ভারতের জিডিপি-র তুলনায় জীবনবিমার বিস্তার, যা কয়েক বছর আগেও প্রায় ৩.২ শতাংশ ছিল, তা সাম্প্রতিক তথ্যে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৮ থেকে ৩ শতাংশে। আর স্বাস্থ্য ও সাধারণ বিমার বিস্তার মাত্র ১ শতাংশের ঘরে বহু বছর ধরে থমকে রয়েছে। বিশেষ করে ‘ব্যাঙ্কাশিওরেন্স’ অর্থাৎ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বিমা বিক্রি এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক বড় আতঙ্কের কারণ। ব্যাঙ্কে স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট করতে গিয়ে বয়স্ক মানুষরা বাড়ি ফিরছেন জটিল বিমা পলিসি হাতে নিয়ে। প্রথম বছরের প্রিমিয়ামে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের কমিশন থাকায় মধ্যস্থতাকারীরা গ্রাহকের আসল প্রয়োজনের তোয়াক্কা না করে যেকোনও উপায়ে পলিসি গছিয়ে দেন। ‘আইআরডিএআই’-এর ‘বিমা ভরসা’ পোর্টাল ও ওম্বুডসমানের দফতরে জমা পড়া লক্ষাধিক অভিযোগের বড় অংশই এই অনৈতিক বিক্রির প্রমাণ।
এর ঠিক উল্টো দৃষ্টান্ত তৈরি করে পথ দেখিয়েছে ভারতের মিউচুয়াল ফান্ড শিল্প। প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৯ সালে যখন বাজার নিয়ামক সংস্থা ‘সেবি’ মিউচুয়াল ফান্ডের প্রবেশমূল্য বা ‘এন্ট্রি লোড’ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে এবং পরিচালন ব্যয় স্বচ্ছ করে দেয়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই শিল্প ধসে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটল? ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও কম খরচের হতেই সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরে এল। ২০০৯ সালে যে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের মোট সম্পদ ছিল মাত্র ৭ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি, এখন তা অভাবনীয় গতিতে বেড়ে ছাড়িয়ে গিয়েছে ৬০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি– অর্থাৎ গত দেড় দশকে গড়ে বার্ষিক প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি।
বিমা সংস্থাগুলি এত দিন এই সহজ সত্যিটা মানতে চায়নি যে, গ্রাহককে না ঠকিয়ে পণ্যের খরচ কমালে এবং স্বচ্ছতা আনলে বাজারের পরিধি অনেক বড় হয়, যার ফলে সৎভাবেই বিপুল মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
জীবন বিমার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আর-এক বড় ক্ষোভের জায়গা হলো স্বাস্থ্য বিমা। ভারতের মতো দেশে যেখানে চিকিৎসার মোট খরচের প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষকে এখনও নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয়, সেখানে স্বাস্থ্য বিমাই ছিল পরিবারের একমাত্র রক্ষা কবচ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পলিসি বিক্রির সময় কোনও শর্ত না থাকলেও হাসপাতালে বিল মেটানোর সময় শুরু হয় অজস্র অজুহাত। ছোট ছোট নিয়মের মারপঁ্যাচে ক্লেম বা ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে দেওয়া কিংবা হাসপাতালের ন্যায্য বিল থেকে বড় অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ দিন দিন পাহাড়প্রমাণ আকার নিচ্ছে। গ্রাহক প্রিমিয়াম দিচ্ছেন বিপদের দিনের নিরাপত্তার জন্য, অথচ সংকটের মুহূর্তে তাদের ঘুরতে হচ্ছে প্রশাসনিক দোরে দোরে।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এই পুরনো ফঁাদে পা দিচ্ছে না। তারা মধ্যস্থতাকারীদের মিষ্টি কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে ইন্টারনেটের তথ্য এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‘এআই’-এর সাহায্য নিচ্ছে। কোনও ‘এআই’ টুল বিমা কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন পায় না কিংবা বিদেশ ভ্রমণের উপহার পায় না; তাই সে কয়েক সেকেন্ডে একটি পলিসির দুর্বলতাগুলি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরছে। এই সচেতনতার ফলেই তরুণরা এখন সঞ্চয় ও সুরক্ষাকে আলাদা করে বুঝতে শিখেছে। তারা সামান্য খরচে কোটি টাকার জীবন সুরক্ষার জন্য ‘পিওর টার্ম প্ল্যান’ কিনছে এবং বাকি উদ্বৃত্ত অর্থ অন্য লাভজনক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি ও তরুণদের এই বোঝাপড়া বিমা কোম্পানিগুলোকে নিজেদের আচরণ বদলাতে বাধ্য করছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ‘আইআরডিএআই’-এর নতুন পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। নতুন নীতিমালায় মাঝপথে পলিসি ভাঙলে ন্যায্য টাকা ফেরত দেওয়া, পরিচালন ব্যয় বা কমিশন কাঠামোতে লাগাম টানা এবং অনুপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পলিসি বিক্রি বন্ধ করার মতো জরুরি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু লড়াইটা সহজ নয়। ক্ষমতাশালী ও বিত্তবান বিমা লবি এই সংস্কার আটকাতে ইতিমধ্যেই সরকারের শীর্ষমহলে দরবার শুরু করেছে। তারা এই নিয়ম চালুর জন্য ২ থেকে ৫ বছরের লম্বা সময় চাইছে। কিন্তু যেখানে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে এমন অনৈতিক প্রথা বন্ধ করতে ৫ বছর সময় দেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা থাকতে পারে না; বরং এটি দ্রুত কার্যকর করা দরকার। পলিসিধারকদের আস্থা ও সুরক্ষার উপর দাঁড়িয়েই ভারতের বিমাক্ষেত্র এক সুস্থ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার রূপ নিক– এটাই কাম্য।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
সর্বশেষ খবর
-
‘স্ট্যান্ডিং কমিটির শীর্ষে কেন বিদ্রোহী সাংসদ?’ কাকলিতে আপত্তি জানিয়ে স্পিকারকে চিঠি অভিষেকের
-
কেন কালীঘাট এলাকার একাধিক ব্যক্তির নামে সিম তুলেছিলেন সুমিত? নেপথ্যে বড় লেনদেন! তদন্তে পুলিশ
-
মেসি-ম্যাচে বঞ্চিত দর্শকদের শুভেন্দুর উপহার, উরুগুয়ে ম্যাচে ২২ হাজার টিকিট মিলবে বিনামূল্যে
-
ভারতের লড়াইকে ‘বাহবা’ দিলেন ব্রাজিল কোচ, হেরে খালিদ দুষলেন মনঃসংযোগের অভাবকে
-
‘লেনিন, মার্কস, হো চি মিন, এরা কারা?’ রাস্তার নাম বদল নিয়ে মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী