স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লার প্রাকার থেকে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেশের রাজনীতিতে বরাবর খুব গুরুত্ব পায়। স্বাধীনতার পর থেকেই বলা হয়ে থাকে, এই ভাষণ মোটামুটিভাবে দেশের অাগামী এক বছরের রাজনীতি ও অর্থনীতির পথনির্দেশ করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদি এই ভাষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে রেকর্ড করতে পারেন। এবার তিনি তঁার ত্রয়োদশতম ভাষণটি দিয়েছেন। জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর পর তিনিই ১৩ বার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি দিলেন। নেহরু ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত টানা ১৭ বার এই ভাষণ দিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দিয়েছিলেন মোট ১৬ বার। কিন্তু তিনি মোদির মতো টানা ১৩ বার ভাষণ দিতে পারেননি।
মোদির লালকেল্লার ভাষণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিচার বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গিয়েছে। বিরোধীরা জবাব দিতে শুরু করেছেন। সরকারের তরফেও ব্যাখ্যা এসেছে। প্রত্যাশামতোই মোদির ভাষণে এবার গুরুত্ব পেয়েছে দেশের তরুণ সমাজ। যাদের মূল অংশটিকে ‘জেন জি’ বলা হচ্ছে। ‘যন্তর মন্তর’-এ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে ‘নিট’ পরীক্ষার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জেন জি’ সমাজের দেশে তোলপাড় ফেলা আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর লালকেল্লার ভাষণে যে তরুণ প্রজন্ম প্রাধান্য পাবে, তা ভীষণভাবেই প্রত্যাশিত ছিল। চর্চা চলছে সওয়া ঘণ্টার ভাষণে মোদি ঠিক কতবার তরুণদের কথা বলেছেন। সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য উঠে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মোদি প্রায় ৫০ বার তরুণদের কথা বলেছেন। অর্থাৎ, প্রতি দেড় মিনিট অন্তর তিনি একবার করে তরুণ প্রজন্মের কথা স্মরণ করেছেন।
আসলে ‘যন্তর মন্তর’-এর আন্দোলন যেভাবে দেশের শাসক গোষ্ঠীকে ভাবিয়ে তুলেছে, তা সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি।
কয়েক দিন আগেই ‘জেন জি’ ও পরবর্তী ‘জেন আলফা’-র সঙ্গে বেনজির বৈঠক করেছিলেন সংঘপ্রধান মোহন ভাগবত, যেখানে তিনি দেশের এই নবীন প্রজন্মের সমস্ত দাবিদাওয়াকে যৌক্তিক বলে মেনে নিয়ে এই বলে প্রত্যেককে আশ্বস্ত করেছেন যে, দুই প্রজন্মের মধ্যে বিরোধ বাধলে তাঁর সমর্থন সবসময় তরুণ প্রজন্মের দিকেই থাকবে। আসলে ‘যন্তর মন্তর’-এর আন্দোলন যেভাবে দেশের শাসক গোষ্ঠীকে ভাবিয়ে তুলেছে, তা সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি। আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হয়েছে। সংঘ পরিবার ও বিজেপির সংগঠনের নিরিখে ধর্মেন্দ্র প্রধান একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁর সরে যাওয়া সংঘ রাজনীতির কাছে কোনও লঘু বিষয় নয়।
যদি ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটকে একটি ভিত্তি রূপে দেখা যায়, তাহলে ‘জেন জি’-র মনোভাব কেন্দ্রের শাসক দলের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ‘জেন জি’ প্রজন্মের ‘সদস্য’ বলতে ধরা হয় তাঁদের– যাঁদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। এই প্রজন্মটি বড় হয়ে উঠেছে ইন্টারনেটের অগ্রগতি ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে। ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে যাঁরা ভোট দেবেন, তাঁদের ৩০ শতাংশের বেশি এই ‘জেন জি’ প্রজন্মের সদস্য। বলা যায় দেশের ‘জেন জি’ প্রজন্মের প্রায় গোটাটাই ২০২৯ সালের ভোটার। কারণ, ২০১১ সালে যাঁদের জন্ম, তাঁদেরও একটি বড় অংশ ২০২৯ সালের ভোটের আগে ১৮ বছর পূর্ণ করে ফেলবে। অতীতে দেশের কোনও ভোটে ‘জেন জি’ প্রজন্মের প্রায় পুরো অংশকে ভোট দিতে দেখা যায়নি।
২০২৯-এ যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘জেন জি’-এর সমর্থন পাওয়াটাই মোদির জয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘
২০১৪ সালে যখন মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন, তখন ‘জেন জি’ প্রজন্ম ভোটারই হয়নি। ২০২৯ সালের ভোটে ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশই হবে ‘জেন জি’ প্রজন্ম। এটি দেশের রাজনীতির এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন। এই ‘জেন জি’ প্রজন্মের সিংহভাগ অাবার বড় হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারকেই দেখে আসছে। ফলে দের যাবতীয় ক্ষোভ-বিক্ষোভ, হতাশা-প্রত্যাশা এই মোদি সরকারকে ঘিরেই।
‘যন্তর মন্তর’ দেশের ‘জেন জি’ সম্প্রদায়ের বড়সড় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখেছে। এই ক্ষোভ দেশের বেহাল শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতিকে ঘিরে। এর সঙ্গে রয়েছে বেকারত্বের জ্বালা-যন্ত্রণা। ‘জেন জি’ সম্প্রদায় ইন্টারনেট থেকে দুনিয়ার তথ্য জেনে বড় হয়েছে। এই প্রজন্ম কাউকে রেয়াত করতে রাজি নয়। ২০১৪ সালে মোদিকে ‘জেন জি’-র মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০১৯ সালেও ভোটেও ‘জেন জি’-র সংখ্যা ছিল নগণ্য। ২০২৪ সালে ‘জেন জি’ ভোটারদের একটি অংশ যে শাসকদলকে বেগ দিয়েছিল, তা স্পষ্ট বিজেপির সংখ্যাটা লোকসভায় ২৪০-এ নেমে আসা থেকেই।
২০২৯-এ যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘জেন জি’-এর সমর্থন পাওয়াটাই মোদির জয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘যন্তর মন্তর’-এর আন্দোলন চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছনোর অাগে থেকেই মোদিকে বারবার ‘জেন জি’-র মন টানার জন্য সচেষ্ট হতে দেখা গিয়েছে। ‘জেন জি’-র কাছে পৌঁছনোর জন্য তিনি ‘রিল’ ও সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীর এবারের লালকেল্লার ভাষণও অাবর্তিত হয়েছে এই তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়: মোদির এবারের ভাষণে একবারও উল্লেখ ছিল না পাকিস্তানের। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়েও কোনও হুঁশিয়ারি দেননি তিনি।
সংবাদমাধ্যমের একটি হিসাব বলছে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রথম লালকেল্লার ভাষণে তরুণ প্রজন্মের কথা উল্লেখ করেছিলেন মাত্র ১৬ বার। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেটা কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৫। ২০২৪ সালে তৃতীয়বার জয়ের রাস্তায় যুবসমাজ কিছুটা কাঁটা হওয়ার পর মোদির লালকেল্লার ভাষণে তরুণ প্রজন্মের উল্লেখ বেড়ে ২০-২৫ বারে পৌঁছয়। এবার সব রেকর্ড ভেঙে সেটাই প্রায় ৫০-এ পৌঁছল। ১ কোটির বেশি তরুণকে কৃত্রিম মেধার প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য নিখরচায় অনলাইনে ট্রেনিং, ২০৩৬ সালের অলিম্পিককে মাথায় রেখে প্রতিভার অন্বেষণ, ডেটা সেন্টার তৈরির লক্ষ্যে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ, উন্নয়নের জন্য সপ্তধারায় জোর ইত্যাদি বিভিন্নভাবে মোদির ভাষণের আগাগোড়া নজরে সেই তরুণ প্রজন্ম।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়: মোদির এবারের ভাষণে একবারও উল্লেখ ছিল না পাকিস্তানের। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়েও কোনও হুঁশিয়ারি দেননি তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা একমাত্র বর্ষিত হল ‘দিমাগি নকশাল’-দের নিয়ে। তিনি জানালেন সংহিস মাওবাদ খতম, কিন্তু তরুণ প্রজন্মকে বেপথু করতে রয়ে গিয়েছে ‘দিমাগি নকশাল’-রা। এই ‘দিমাগি নকশাল’ কারা, তা নিয়ে আপাতত শুরু হয়েছে বিতর্ক। ‘দিমাগি নকশাল’ কি তাঁরা-ই, যাঁরা ‘যন্তর মন্তর’-এর আন্দোলন সংঘটিত করল? কংগ্রেস দাবি করেছে, ‘দিমাগি নকশাল’ নামে মোদির নিশানায় বিরোধীরা। ‘আরবান নকশাল’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর পর দেশের রাজনীতি যে এবার থেকে মাঝেমধ্যেই উত্তপ্ত হবে ‘দিমাগি নকশাল’ নিয়ে, তা বলা বাহুল্য।
সর্বশেষ খবর
-
দেবের ‘দাদাগিরি’তে সজল-কুণাল-মদনের সঙ্গে কৌস্তভ-নওশাদ, শতরূপ কোথায়? প্রোমো দেখে প্রশ্ন নেটপাড়ার
-
চলতি মাসেই গ্রেপ্তার! বিজেপি কর্মী অভিজিৎ খুনে আরও ২ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠন
-
দিল্লির জল বোর্ডের টেন্ডারে ১.৫২ কোটির দুর্নীতি, ফের গ্রেপ্তার আপ নেতা সত্যেন্দ্র জৈন
-
‘বন্দে মাতরম’-এর আগেই গাওয়া যাবে রাজ্যসঙ্গীত, বড়সড় সিদ্ধান্ত মাদ্রাজ হাই কোর্টের
-
অন্নপূর্ণার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে ধন্যবাদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের