মেলবোর্ন ফেস্টিভ্যালে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ দেখানো হল। কেমন প্রতিক্রিয়া?
– খুব ভালো। অনেকদিন পরে বাংলা থেকে একটি রাজনৈতিক ছবি দেখে লোকজন খুশি। ছবির প্রদর্শনের পর প্রশ্নোত্তর পর্বটা খুব উপভোগ করেছি। বুদ্ধিদীপ্ত সব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি।
আরও পড়ুন:
নাটক থেকে সিনেমা করার প্রবণতা আপনার মধ্যে রয়েছে। যেমন– ‘জুলফিকার’, ‘সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই’। এবারে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় নির্দেশিত, ব্রাত্য বসুর লেখা নাটক থেকে আসছে আপনার ছবি ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’। যে নাটকটা রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল। এটা নির্বাচন করার কারণ কী?
– ২০০২ সালে নাটকটা আমার মধ্যে প্রচণ্ড রেখাপাত করেছিল। আমি এমনিতেই ব্রাত্যদার নাটকের ভক্ত। ‘অশালীন’, ‘মুখোমুখি বসিবার’, ‘রুদ্ধসংগীত’ এরকম বেশ কিছু নাটক পছন্দের। এই নাটকটা খুব সিনেম্যাটিক আর শক্তিশালী মনে হয়েছিল। যে কারণে এটা নির্বাচন করলাম, নাটকটার মধ্যে একটা শাশ্বত সত্য আছে। সেটা হল ক্ষমতার পচনের গল্প, বৃত্তের গল্প। সেই বৃত্তে যে রাজনৈতিক দলই থাকুক, একসময় সেখানে পচন ধরে আর নতুন মতবাদ, নতুন দল ক্ষমতাশীল হয়। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। সব দেশে সর্বকালে এটা প্রাসঙ্গিক। এইজন্যই ছবিটা করা।
“দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতের গল্প। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে একটা জিনিস খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল–…”
টিজারে সব্যসাচী (ঋত্বিক চক্রবর্তী) ও ইন্দ্রর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) দ্বৈরথ স্পষ্ট।
– এখানে দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতের গল্প। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে একটা জিনিস খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল– প্রেমাইসটা নাটকের এত সুন্দর, যেটা নাটকে একটু সহজে বিশ্বাসযোগ্য। ‘উইলিং সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ’ যাকে বলে। সেটা মঞ্চে একটু সহজ। সিনেমার তুলনায়। নাটক দেখা আর সিনেমা দেখার মধ্যে বিরাট তফাতও আছে।
১৯৭৬ সালে সব্যসাচীর অন্তর্ধান, তারপর তার ফিরে আসা ২০০২ সালে। গল্পটা কি একই রাখছেন?
– গল্পটা মোটামুটি এক রাখছি। কিছু বদল হয়তো পাব, সেটা ছবিতে দেখাই ভালো। মূল বিষয়টা হল– সিনেমার নিজস্ব বাস্তবতার দায় আছে, যেটা স্টেজের থেকে অনেকটা আলাদা। এটা যে সায়েন্স ফিকশন নয়, অ্যাকচুয়ালি ঘটনাটা ঘটেছে, একটা লোক ২৬ বছর পর ঘুম থেকে উঠছে, তত দিনে চারপাশ পাল্টে গিয়েছে। এটা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে আমি ডিসকোর্সে যেতে পারি। ছবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল, বাবা-ছেলের মধ্যে যে ডিসকোর্সটা হচ্ছে। এবং যেটা গুরুত্বপূর্ণ যে কীভাবে এই নতুন সময়ে একটা পুরনো মতাদর্শকে দেখছি। এই প্রক্রিয়াটাই ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর সার্বিক জায়গা।
তিনমাস হল বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। এখনও রাজ্য-রাজনীতি ঘটনাবহুল। তেমন সময়ে পলিটিক্যালি-চার্জড ছবি আনা, ব্যবসায়িক কারণে কিছুটা?
– না, এটায় আমাদের কোনও হাত নেই। অ্যাকচুয়ালি আনছেন সেন্সর বোর্ড। কারণ, সেন্সর বোর্ডে-ই ছবিটা আটকে ছিল ছ’মাস। এই ছবিটা আসার কথা ছিল জানুয়ারিতে। সেন্সর বোর্ড কিছু পয়েন্ট দিয়েছিলেন, আমরাও কিছু পয়েন্ট দিয়েছিলাম। ফাইনালি ছবিটা রিলিজ করছে।

কিছু আপস করতে হয়েছে?
– না, একটা বিন্দু আপস করতে হয়নি। যে কারণে এতটা সময় লাগল। আপস করলে জানুয়ারিতেই রিলিজ হতে পারত।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছবির ট্রেলার লঞ্চ হল। এটাও তো একটা বার্তা। যখন কিছুদিন আগে সেখানে অশান্তির আবহ তৈরি হয়েছিল।
এই বার্তা প্রসঙ্গে আপনি কী বলবেন?
– না, সেরকম নয়। যেহেতু এটা দুটো প্রজন্মের রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য নিয়ে, ঘাত প্রতিঘাত নিয়ে, সেই জায়গা থেকে যেহেতু ইন্দ্র তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছে, তাই আমরা চেয়েছিলাম এমন কোনও জায়গায় ট্রেলার রিলিজ করতে, যেখানে রাজনীতি খুব সক্রিয় এবং সচল। সেটা যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সিও হতে পারত।
“কোনও রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গে একশোভাগ মেলে না কোনও সময়েই, ফলে আমি কোনও পার্টি করি বা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, এটা জোর গলায় বলতে পারব না।…”
আপনার সোশাল মিডিয়া পোস্টের বাইরে গিয়ে বলছি, নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ কি ছবিতে প্রতিফলিত হয় বা ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এ কি এসেছে?
– আমার ছবি এবং সোশাল মিডিয়ায় যা আমি লিখি, পুরোটাই ইস্যু বেসড। একটা বিশেষ ইস্যু নিয়ে আমার কিছু মতামত থাকে। কিন্তু সেটা যেহেতু কোনও রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গে একশোভাগ মেলে না কোনও সময়েই, ফলে আমি কোনও পার্টি করি বা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, এটা জোর গলায় বলতে পারব না। আমার কাছে ছবির বিষয় এবং সোশাল মিডিয়ায় কথা বলার বিষয়, প্রত্যেকটাই ইস্যুভিত্তিক। মানে আমি যখন ‘গুমনামি’ নিয়ে কাজ করছি, আমার কাছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুই হলেন প্রসঙ্গ। একইভাবে যখন ‘পদাতিক’ নিয়ে কাজ করছি, মৃণাল সেন, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ আমার ইস্যু।
আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, রাজনৈতিক কমপ্যাটিবিলিটি না থাকলে সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে বা পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। ‘উঙ্কল টুইঙ্কল’ ছবিতে সেই জায়গাটা…
প্রচণ্ড ভাবে এসেছে। ছবির শিরদাঁড়াই সেটা। বাবা-ছেলের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে সংঘাতটাই ছবির ইমোশনাল ব্যাকবোন।
“রুদ্র হোক, পরম হোক বা শতরূপ– যেই হোক, নানান কনক্লেভে, নানা লোকেদের সঙ্গে আড্ডা হয়, কথা হয়। তরুণজ্যোতির সঙ্গেও আমার প্রচুর কথা হয়।…”
আপনি পরিচালক, আপনার চারপাশে ঘনিষ্ঠ অভিনেতাদের মধ্যে রুদ্রনীল ঘোষ যেমন রয়েছেন, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও রয়েছেন। এঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা। এবং আপনার নিজের বিশ্বাস। এই সহাবস্থান সম্ভব করলেন কী করে?
– (হাসি) আমার চারপাশে শতরূপও আছে। ও ভালো অ্যাক্টর। ওকে আমি ‘কিলবিল সোসাইটি’-তে সুযোগ দিয়েছি।
প্রধানত অভিনেতাদের কথাই বলছিলাম।
– রুদ্র হোক, পরম হোক বা শতরূপ– যেই হোক, নানান কনক্লেভে, নানা লোকেদের সঙ্গে আড্ডা হয়, কথা হয়। তরুণজ্যোতির সঙ্গেও আমার প্রচুর কথা হয়। ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ ওঁর খুব ভালো লেগেছিল। তারপর কথা হয়েছিল। এরকম অনেকেই আছেন, তার মধ্যে কুণালদা, সজলবাবুও রয়েছেন। নানা রাজনৈতিক মতাবলম্বী মানুষদের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব আছে। সেটা আছে, কারণ আমার মনে হয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ মানুষের একটা অংশ। পুরো সেই মানুষটা নয়, সেই জন্যই আমার অসুবিধা হয় না। আমি লিভ অ্যান্ড লেট লিভ-এ বিশ্বাস করি। ওই বিখ্যাত উক্তি– আমি তোমার সঙ্গে একমত হচ্ছি না, কিন্তু আমি তোমার মত প্রকাশ করার অধিকারের জন্য আমৃত্যু লড়তে পারি। আমার কোনও কিছু নির্বাচনের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক মতাদর্শ আসে না। ইনফ্যাক্ট, আগের রেজিমের সময় রুদ্র যখন কাজ পাচ্ছিল না, আমি ধারাবাহিকভাবে রুদ্রকে কাজ অফার করেছি।

‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর গান শ্রোতারা ভালোবাসছে। তমালিকা গোলদার ছবির সুরকার। আপনি নিজে মিউজিক নিয়ে অত্যন্ত প্যাশনেট। গান লেখেন, সুরও দেন। এই ছবির ক্ষেত্রে তমালিকাকে কোনও ইনপুটস দিয়েছেন?
– ইনপুটস ডেফিনিটলি দিয়েছি। কিন্তু সেগুলো খুবই অর্নামেন্টাল। মানে সানাইয়ের মিক্সিং কতটা সাট্ল হবে বা প্রকট হবে, এইরকম।
আপনি তো নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসেন, এক্ষেত্রে কতটা বিশ্বাস্য?
– সবটা নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসি না। মূল জিনিসটা থাকলে তার গার্নিশিং নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসি। কাউকে রঁাধুনি হিসেবে নিযুক্ত করে, সারাক্ষণ রান্নাঘরে নির্দেশ দিই না। তমালিকা যেদিন আমাকে মেল করেছিল, সেদিনই ডিশটা রান্না হয়ে গিয়েছিল। যে, আমি লিখি, সুর করি এবং এটা আমার একটা গান, বলে তমালিকা ‘যে অঁাধারে’ গানটা পাঠিয়েছিল। যেটা সঞ্চিতা গেয়েছিল। ওঁর ভার্সনটাও অ্যালবামে আছে। এবং খুব ভালো। তারপরে সরস্বতীর বরপুত্রী শ্রেয়া ঘোষাল গানটা গায়।
রাপূর্ণা ভট্টাচার্যর ‘না থাকা প্রিয়’ গানটাও দারুণ।
– (হাসি) আমি রাপু ভার্সেস শ্রেয়া এমন ফাইটে যেতে চাই না। রাপুর এই গানটা বাংলা গানে একটা ঘটনা।
অনেক সময় ছবির গান বাদ দিতে বলা হয়। কিন্তু আপনি রাজি হন না আগেও বলেছেন।
– সেটা ফেস্টিভ্যালে বলে। এখানে কেউ বলে না। বিদেশি ফেস্টিভ্যাল একটু নাক উঁচু তো, যে গানে কী হয়! বলে গান ছেঁটে ‘ফেস্টিভ্যাল কাট’ করা যায় না! এ ক্ষেত্রেও বাদ দিইনি। এ জন্য বড় বড় ফেস্টিভ্যাল মিস করেছি।
(সাক্ষাৎকার শেষে পরিচালক ফিরে গেলেন ‘কুইন ভিক্টোরিয়া আর গোয়েন্দা কানাইচরণ’ ছবির শুটিংয়ে। রাজা রামমোহন রায় মেমোরিয়াল মিউজিয়মের প্রাঙ্গণে, যেখানে ছিলেন যিশু সেনগুপ্ত, অনুজয় চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর চক্রবর্তী প্রমুখ।)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
কলকাতায় অপরাধের ‘হটস্পট’ কোনগুলি? ওসিদের কী নির্দেশ দিলেন পুলিশ কমিশনার?
-
সিকিম ঘুরতে যাচ্ছেন পুজোতে? বড় বদল পর্যটনে, জেনে নিন নয়া নিয়ম-নীতি
-
‘৯০ শতাংশ ভোটার সরে যেতে দ্বিধা করবে না’, বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণে’ সতর্কবার্তা সংঘ মুখপত্রে
-
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, ছড়াল টলিউড অভিনেত্রীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি! ধৃত ‘প্রাক্তন’ প্রেমিক
-
কলকাতা-হাওড়া পুরভোটে রণকৌশল কী হবে? বৈঠকে তৃণমূলের ঋতব্রত শিবির