Ujaan Ganguly

আমাদের গৃহযুদ্ধে বাবা-মায়ের দেওয়া গল্প বলার পোকাটা জিতে গেল: উজান গঙ্গোপাধ্যায়

২৭ বছর বয়সে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমা। 'কাতুকুতু বুড়ো' রিলিজের প্রাক্কালে দরাজ আড্ডায় কৌশিক-চূর্ণীপুত্র উজান গঙ্গোপাধ্যায়।

শম্পালী মৌলিক
শম্পালী মৌলিক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১৯:০৯

options
link
আমাদের গৃহযুদ্ধে বাবা-মায়ের দেওয়া গল্প বলার পোকাটা জিতে গেল: উজান গঙ্গোপাধ্যায়
'কাতুকুতু বুড়ো' রিলিজের প্রাক্কালে দরাজ আড্ডায় কৌশিক-চূর্ণীর পুত্র উজান গঙ্গোপাধ্যায়। ছবি- কৌশিক দত্ত 

২৭ বছর বয়সে প্রথম ফিচার ফিল্মের (‘কাতুকুতু বুড়ো’) পরিচালক। কেমন লাগছে?

Advertisement

– কাজের চাপে বুঝতে পারছি না, যে কী স্পেশাল করছি। টের পাচ্ছি, ঘুমের সময় কমে গেছে। অনেক বিভাগের কাজ, তাই রোজ একটা করে স্টেশন পার করছি। উপভোগ করছি, শিখছি। এসভিএফ-এর পুরো টিম আর এডিটর শুভজিৎ সিংহ এই মুহূর্তে লড়ছে আমার সঙ্গে। সবাই সুদক্ষ টেকনিশিয়ান। সকলে দাদা-দিদির মতো হয়ে গেছে। আমার মতো নতুন পরিচালকের ওপর যে শ্রীকান্ত মোহতা ও মহেন্দ্র সোনি আস্থা রেখেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

Advertisement

শ্রীকান্তদার কাছে চিত্রনাট্য পড়ার অবকাশ পাওয়াটাই আমার প্রধান সাহায্য মা-বাবার কাছে। ছোটবেলায় যখন পরীক্ষা দিতে যেতাম, বাবা বলতো, ‘ম্যাক্সিমাম কী হবে? ঝুলিয়ে মাঠ-ময়দান করবি!’…

Ujaan Ganguly opens up about his debut film Katukutu Buro
উজান গঙ্গোপাধ্যায়, ছবি- কৌশিক দত্ত

কৌশিক-চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র হওয়ায় সুবিধে পেয়েছেন, লোকে বলবেই। কী বলবেন?
– বাবা-মায়ের জনপ্রিয়তার জন্য মানুষের এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। এতে কোনও ‘ম্যালাইস’ দেখি না, ডিফেন্ড করতেও চাই না। বিনোদন জগতের ভালো-খারাপ দিক জানা, বিশিষ্ট শিল্পীদের সঙ্গে ছোট থেকে আলাপ, যে একটা প্রিভিলেজ হতে পারে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ভিত্তিতে সুযোগ পাইনি, চাইওনি। চাইলেই পাওয়া যায় না, যেহেতু শেষপর্যন্ত এটা ব্যবসা। আমার বাবা-মা তো এসভিএফ-এ প্রায় ১৩-১৪ বছর কোনও ছবি পরিচালনা করেননি। আমি এই ছবিটা লেখার পর মনে হল, এই হাউস এমন প্রতিষ্ঠান, যারা এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করে। শ্রীকান্তদার কাছে চিত্রনাট্য পড়ার অবকাশ পাওয়াটাই আমার প্রধান সাহায্য মা-বাবার কাছে। ছোটবেলায় যখন পরীক্ষা দিতে যেতাম, বাবা বলতো, ‘ম্যাক্সিমাম কী হবে? ঝুলিয়ে মাঠ-ময়দান করবি!’ হাসিমুখে সেটা শুনে, নিজের সেরাটা দিয়ে আসতাম, এক্ষেত্রেও তাই।

Advertisement

বাবা-মা একই পেশায়। এক্ষেত্রে সারাক্ষণ স্ক্রুটিনির মধ্যে থাকবে আপনার কাজ। তুলনা আসবেই।
– তুলনা হলে সম্মানিত বোধ করব, বা নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করব। ওঁদের সুনাম যেন বজায় রাখতে পারি, সকলের আশীর্বাদ চাই। মা-বাবার পরিচালক সত্তা ও কাজের পরিবেশেই আমি বড় হয়েছি। তবু আমার প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি ওঁদের থেকে স্বাভাবিক নিয়মে আলাদা হবেই। এক থাকবে মূল্যবোধ ও দর্শন। বাবার ছবির চিত্রনাট্য আমি-মা একসঙ্গে বসে আলোচনা, তর্ক, পরিমার্জন করি। যা আমার জন্য বড় লার্নিং প্রসেস ছিল।

রাপূর্ণা এই ছবির নায়িকা তো বটেই, কিন্তু তার থেকেও বেশি আমার বন্ধু।

Ujaan Ganguly opens up about his debut film
প্রেমচর্যার মাঝেই ‘কাতুকুতু বুড়ো’তে রাপূর্ণা-উজান

সুকুমার রায়ের ‘কাতুকুতু বুড়ো’ ছবিতে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অ্যানিমেশনের জায়গা রয়েছে। খুব ফ্রেশ দেখাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে প্রেমের ছবি এবং সুপার হিরোর গল্প উঠে আসবে, তাই তো?
– যখন অক্সফোর্ডে পড়ছি, তখন নেটফ্লিক্সের ‘কুরুক্ষেত্র’ সিরিজের লেখা ও পরিচালনার কাজটা পাই। তখন আমি ২৩, সেই কাজটা তিনবছর ধরে করতে গিয়ে অ্যানিমেশনের দিগন্ত খুলে যায় আমার কাছে। অ্যানিমেশন আমার বন্ধু। চিরকাল আমার কাছে থাকবে। ‘কাতুকুতু বুড়ো’ তার ব্যতিক্রম নয়। ছোট থেকেই সুপারহিরো গ্রাফিক নভেলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। কলেজেও কোর্সের অংশ ছিল। ‘দ্য ওয়াচম্যান’ পড়েছি। তাই প্রথম ছবিতে তার ছায়া থাকবেই। তার সঙ্গে থাকবে প্রেম আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য। আশা করি নতুন পরিচালকের সীমিত রিসোর্সে বানানো এই জগৎটা ভালো লাগবে।

বাবা খুব কন্ট্রোলফ্রিক। তাই বাড়িতে বসে বসে আমার টিমের দাদাদের ফোন করে সারাক্ষণ আপডেট নিত।

ছবির নায়িকা তথা গায়িকা রাপূর্ণা ভট্টাচার্যর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে চর্চা চলছে। প্রথমে প্রেম, তার পরে ছবিটা হল তো?
– রাপূর্ণা এই ছবির নায়িকা তো বটেই, কিন্তু তার থেকেও বেশি আমার বন্ধু। ও, তুর্যা, ঋত্বিকা, বহ্নিশিখা আমরা একটা গ্যাং। দল বেঁধে আমরা আড্ডা মারি, ঘুরে আসি, খেতে যাই। আমাদের বন্ডিং এই ছবির বিরাট পাওয়া। ব্যক্তিগত আর কিছু জানানোর থাকলে ঠিক সময় মতো সবার আগে আমিই জানাব, প্রমিস!

Ujaan Ganguly on Debut Film Katukutu Buro, Parents Kaushik-Churni & His Filmmaking Journey
বাবা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে উজান।

শুনেছি ছবির শুটিংয়ে বাবার জন্য নো-এন্ট্রি বোর্ড রেখেছিলেন। অন্যদিকে মা চূর্ণী আপনার অন্যতম অভিনেত্রী। এই তফাত কেন?
– মা একটা বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন আমার ছবিতে। ওই চারদিনের শুটিং ছাড়া মায়েরও নো-এন্ট্রি ছিল। অথচ মাকে আলাদা করে বলতেই হত না। তবে বাবা খুব কন্ট্রোলফ্রিক। তাই বাড়িতে বসে বসে আমার টিমের দাদাদের ফোন করে সারাক্ষণ আপডেট নিত। শটের ফাঁকে সেই কলগুলো ধরাও পড়ে যেত। মা বাড়ি ফিরলে জিজ্ঞেস করত। তখন বাবার হাজারটা প্রশ্ন থাকত। সবই আসলে ভালোবাসার চাপ, আবেগ। প্রথম ছবিতে নিজেকে বুঝে নিতে চেয়েছি। ঠিক-ভুল যাই করি, নিজের মতো করে করেছি, আমার পুরো টিমের সাপোর্ট নিয়ে। আশা করি বাবা-মায়ের ফাইনাল ছবিটা ভালো লাগবে প্রিমিয়ারে দেখে।

মা ছোটবেলা থেকেই আমাকে ছোট-বড় সব সিদ্ধান্তে অপশন দিয়েছেন। বাবা চাইলে আমাকে অনেক ছবিতে কাস্ট করতে পারতেন, করেননি। আমাকে নিজের মতো ভাবার স্পেস দিয়েছেন।

Ujaan Ganguly Interview: Debut Director Talks Katukutu Buro, Storytelling and Family Legacy
মা-বাবার সঙ্গে উজান গঙ্গোপাধ্য়ায়। ছবি: শুভ্ররূপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

চূর্ণী চেয়েছিলেন পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যান আরও। কৌশিক চেয়েছিলেন সিনেমার দিকে এগিয়ে যান। গৃহযুদ্ধ হয়নি?
– গৃহযুদ্ধ অবশ্যই হয়েছে! ওঁদের সঙ্গে, নিজের মনের মধ্যে। অক্সফোর্ডে ফার্স্ট ক্লাস উইথ ডিসটিংশন পাওয়ার পর আমার প্রফেসরদের মতন মা-ও আশা করেছেন যে আমি রিসার্চ করব। ওদিকে বাবা বিভিন্ন ছবির আইডিয়া নিয়ে আমার সঙ্গে পাশাপাশি আড্ডা চালিয়ে গেলেন। স্লো পয়জনিং বলা যায়। এই লড়াইয়ে আমাকে দেওয়া বাবা-মায়ের গল্প বলার পোকাটা জিতে গেল ফাইনালি। আসলে মা চাননি সিনেমা জগতে যে অনিশ্চয়তা তাঁরা দেখেছেন, সেটা আমিও ফেস করি। যখন বুঝলেন যে আমি ফিল্ম, অ্যানিমেশন, লেখালিখি আর অভিনয় নিয়ে খুশি থাকব, মা মেনে নিয়েছেন। ওঁরা কোনওদিন আমাকে কোনও কিছুতে জোর করেননি। মা ছোটবেলা থেকেই আমাকে ছোট-বড় সব সিদ্ধান্তে অপশন দিয়েছেন। বাবা চাইলে আমাকে অনেক ছবিতে কাস্ট করতে পারতেন, করেননি। আমাকে নিজের মতো ভাবার স্পেস দিয়েছেন।

পরিচালনাই শুধু নয়, ছবিতে গান গেয়েছেন, গান লিখেছেন, সুরও করেছেন। বেশি দায়িত্ব নেওয়া হয়ে গেল না?
– আমি যেদিন শ্রীকান্ত স্যরের কাছে চিত্রনাট্য পড়ি, শোনার পর হঠাৎ বলেন, ‘এটা তুই ডিরেক্ট কর। ঠিক যেরকম শোনালি, সেটাই বানিয়ে দে।’ চিত্রনাট্য পড়ার সময় নিজের মতো বাছাই করা রেফারেন্স গান বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক চালিয়েছিলাম, ব্যস! উনি বলেন, তোর ইচ্ছে মতন গান, একটা নতুন, ইয়াং টিম নিয়ে তৈরি কর। দেবায়ন আর সিজির বানানো সাউন্ড স্কেপও পছন্দ হয়ে গেল। তার সঙ্গে আমার ট্যাক্সিতে ঘামতে ঘামতে লেখা রাফ লিরিক্স– এরকম করেই নানান বিভাগে জড়িয়ে পড়লাম। বুঝেছিলাম প্রযোজনা সংস্থা একদম ফ্রেশ কিছু চাইছে আমাদের কাছে। দু’পক্ষই চ্যালেঞ্জ আর পাঙ্গা দিচ্ছে আর নিচ্ছে। আমাদের মিউজিক টিম সত্যিই কৃতজ্ঞ এই সুযোগটার জন্য। আপাতত ২৪ জুলাই ‘কাতুকুতু বুড়ো’ রিলিজের অপেক্ষায় (হাসি)।

লোকেশন : দ্য সেনেটর হোটেল

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.