জঙ্গলের পশুপাখিরা প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত বলেই হয়তো নিজের খাবারের ব্যবস্থা করতে শিখলেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে পূর্ণতা পায় তারা। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, তাই তার স্নেহ ভালোবাসা সহমর্মিতার প্রয়োজন হয়। সেইটুকু না পেলে সত্যিকারের মানুষের মতো বাঁচা যায় কি? মধ্যবিত্ত জীবনের খুব চেনা টানাপোড়েন নিয়ে গল্প বুনেছেন পৃথা চক্রবর্তী, তাঁর পরিচালিত ‘ফেরা’ (Phera Film review) ছবিতে।
ঝাড়গ্রামের কালিন্দিপুর এলাকার বাসিন্দা পান্নালাল বা পল্টু (সঞ্জয় মিশ্র) স্থানীয় ক্লাবের ফুটবল কোচ। যদিও শহরতলী অঞ্চলে একদিকে ফান্ডের সমস্যা অন্যদিকে শহরের হাতছানি, এই দুয়ে মিলে খেলার পরিবেশ ইদানীং বিঘ্নিত। পান্নালালের ছেলে পলাশ (ঋত্বিক চক্রবর্তী) কলকাতায় চাকরি করে। একসময় বাবাকে ছেলের সঙ্গে কলকাতায় এসে থাকতে হয়। দুজনের সম্পর্ক খুব একটা মধুর নাহলেও প্রয়োজনের তাগিদে একসঙ্গে থেকে যাওয়া আর ক্রমশ একে অন্যের প্রয়োজন অনুভব করার মধ্যে দিয়ে ছবি এগিয়ে চলে।
নব্বইয়ের দশকে একটা প্রচলিত শব্দবন্ধ ছিল ‘জেনারেশন গ্যাপ’। এই গ্যাপের কারণেই এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের ভালো লাগা মন্দ লাগা, চিন্তাভাবনা বা সমস্যাকে বুঝতে পারে না। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

নব্বইয়ের দশকে একটা প্রচলিত শব্দবন্ধ ছিল ‘জেনারেশন গ্যাপ’। এই গ্যাপের কারণেই এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের ভালো লাগা মন্দ লাগা, চিন্তাভাবনা বা সমস্যাকে বুঝতে পারে না। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। সেই দুই প্রজন্মের ওপরদিকে যারা ছিল তারা আজ বৃদ্ধ। আর সেদিনের কিশোর কিশোরীরা আজ পূর্ণবয়স্ক। সমস্যা আরও জটিল ও ক্রমবর্ধমান। বয়স্ক প্রজন্ম তাদের মূল্যবোধ আঁকড়ে জীবনের শেষটুকু কাটিয়ে দিতে চায়। সেই ভাবনায় জুড়ে থাকে তার সন্তান সন্ততিও। অন্যদিকে কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বয়সে পেশার প্রতি আনুগত্য ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রয়োজন অনেকটা বেশি থাকে স্বাভাবিক কারণেই। যে যার নিজের জায়গায় থেকে একেবারে সঠিক এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যখন একটু এগিয়ে এসে অন্যপক্ষের দিকে হাত বাড়াতে হয় তখন? সহযোগিতা, সহানুভূতি আর কৃতজ্ঞতার মনোভাব সেখানে অবশ্য প্রয়োজন। কারণ এখানে কেউ পর নয়, বরং পরম আপনজন। সেই অনুভূতির জায়গায় ঘাটতি হলেই বাড়ে অসন্তোষ। ছবির বিষয় নির্বাচনে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে বেছে নিয়েছেন পৃথা।

বিষয় বৈচিত্র্যে খুব অভিনব না হলেও অন্যভাবে চিরাচরিত এই সমস্যাকে সামনে এনেছেন পরিচালক। অভিনয়ে চমক হিসেবে সঞ্জয় মিশ্র এ ছবির বিশেষ সম্পদ বলাই বাহুল্য। তবে তাঁর উচ্চারণ কিছু জায়গায় কানে লাগে। তবে সেটুকু তিনি পুষিয়ে দিয়েছেন গোটা ছবি জুড়ে অব্যক্ত অভিব্যক্তিতে। যোগ্য সঙ্গত করে গিয়েছেন ঋত্বিক। বাড়ির মালকিনের চরিত্রে সোহিনী সরকার যথাযথ। তবে পলাশের প্রাক্তন হিসাবে প্রিয়াঙ্কা সরকারের চরিত্রটি প্রায় কোনও গুরুত্বই পায়নি। আনন্দ চরিত্রে সুব্রত দত্ত মানানসই। তবে ছবির দৈর্ঘ্য কিছুটা কমানো যেতে পারত। রনজয় ভট্টাচার্যের সুরে তাঁরই গাওয়া ‘চলো আজ আবার’ গানটি শ্রুতিমধুর।