প্রয়াত স্বপনসাধন বোস ওরফে সকলের প্রিয় ‘টুটু বোস’। মঙ্গলবার গভীর রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজ আক্ষরিক অর্থেই সংবাদ প্রতিদিন যেন ‘ছায়াহীন’ হল তার ‘বনস্পতি’কে হারিয়ে। ময়দানের মহীরুহ পতনে ক্রীড়াদুনিয়া তো বটেই এমনকী রাজনৈতিকমহলের গণ্ডি পেরিয়ে সেলেবপাড়াতেও শোকের ছায়া। স্বপনসাধন বোসের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কারও গলা বুজে এল, কেউ বা আদ্যন্ত ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হয়েও স্মরণ করলেন সেই বাঙালিকে যিনি শিল্প-বাণিজ্যের সঙ্গে ভারতের ক্রীড়া মানচিত্রে বাংলার ফুটবলকে এক উজ্জ্বল স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন।
এই বিষয়ে আরও খবর
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় উঠে এল এক ‘মাঠের রাজা’র আখ্যান। তিনি বললেন, “আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি এই আইকনিক ব্যক্তিত্বের মাঠের রাজত্ব দেখে। খুব খারাপ লাগছে। টুটুদা বড্ড ভালো মানুষ ছিলেন। আমার খুবই প্রিয় একজন। আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। কিছুদিন আগেই খুব জাঁকজমক করে ওঁর জন্মদিন পালন হল, আমিও গিয়েছিলাম। খুব মজার মানুষ ছিলেন। টুটু বোস মানেই আমাদের কাছে মাঠের রাজা। টুটুদা নেই, কাল রাতে খবরটা শুনেই আমার খুব খারাপ লেগেছে। ভালো মানুষ, আইকনিক ব্যক্তিত্বরা একে একে চলে যাচ্ছেন ময়দান থেকে। বোস পরিবারের সকলকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি। এই কঠিন সময়ে আমার সমবেদনা রইল। আজ একটাই কথা বলার, যতদিন মাঠ-খেলধূলা থাকবে, ততদিন টুটুদা আমাদের মাঝে থাকবেন।”
“মোহনবাগানের সমার্থক ও সমর্থক এই কিংবদন্তীর সাথে কখনও আলাপ হবে ভাবিনি। ওঁর ফুটবল অনুরাগ ও অতিথিসেবার ঐতিহ্য উত্তরসূরীরা আন্তরিকভাবে পালন করে চলেছেন ও…”
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর শোকবার্তা, “খুব দুঃখজনক! মঙ্গলবার রাতে আচমকাই খবরটা এল আমার কাছে। খেলার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উনি। অনেক অনুষ্ঠানে টুটুবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। উনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। যখনই দেখা হয়েছে, খুব আনন্দ করে গল্প করতেন। জিজ্ঞেস করতেন, সামনে আমার কী কী সিনেমা রিলিজ করছে? বা নতুন আর কী কাজ রয়েছে? ওনার আমন্ত্রণে বহু খেলার অনুষ্ঠানেও গিয়েছি বহুবার। বোস পরিবারের সঙ্গে আমার বরাবরই সুসম্পর্ক। সৃঞ্জয়, ওঁর স্ত্রী নীলাঞ্জনা, এই কাগজ প্রতিদিন-এর সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তাই ভাবি, মানুষ চলে গেলেও তাঁর বিশাল প্রতিপত্তি, লিগ্যাসি, পরম্পরা রয়ে যায়। টুটু বোস অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, ভবিষ্যতে সেগুলো যাতে আমরা ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, ওঁর ভাবমূর্তি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেটাই কাম্য।”
“আমি হার্ডকোর ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হয়েও একথা বলছি। বাঙালি উদ্যোগপতি হয়ে এত বছর ধরে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র।…”
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে ‘টুটুদা’ মানেই আভিজাত্য আর আতিথেয়তার এক পরম নিদর্শন। পরিচালক বললেন, “টুটু বোস- ছোটোবেলা থেকে শোনা এই নাম। মোহনবাগানের সমার্থক ও সমর্থক এই কিংবদন্তির সাথে কখনও আলাপ হবে ভাবিনি। বালিগঞ্জের বোসবাড়িতে দুর্গাপুজোর এক সকালে তাঁর সাথে পরিচয়। দিলখোলা এই মানুষটির সেই প্রথম দিনের আতিথেয়তা কোনোদিন ভুলতে পারবো না। ওঁর ফুটবল অনুরাগ ও অতিথিসেবার ঐতিহ্য উত্তরসূরিরা আন্তরিকভাবে পালন করে চলেছেন ও চিরকাল করবেন। ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”

আদ্যন্ত লাল-হলুদ দলের সমর্থক হয়েও ‘স্বপ্নসাধন বোস’ আবির চট্টোপাধ্যায়ের কাছে ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে আবেগের আরেক নাম। অভিনেতার মন্তব্য, “ছায়াহীন প্রতিদিন- আক্ষরিক অর্থেই ঠিক কথা। ‘টুটুবাবু’ একটি নাম। মোহনবাগান দলের জন্য জান-প্রাণ দিয়ে ওঁর লড়ে যাওয়া এবং অভিভাবকত্বকে কুর্নিশ জানাই। আমি হার্ডকোর ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হয়েও একথা বলছি। বাঙালি উদ্যোগপতি হয়ে এত বছর ধরে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ওঁর পরিবারের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক টুম্পাইদা (সৃঞ্জয় বোস),রুপাইদি (নীলাঞ্জনা বোস) এবং অরিঞ্জয়ের কথা বলব, এবং পরিবারের সকলের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।”
“যে মানুষটি আমাদের বাংলার ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতেন, ভালো হওয়া নিয়ে ভাবতেন, তেমন একটা মানুষ চলে যাওয়া মানে আমাদের মাটিতে থাকা বটবৃক্ষ চলে যাওয়া। যে গাছ ছায়া দিত, ভবিষ্য়তের বার্তা দিত। আমি অত্যন্ত মর্মাহত।…”
রুদ্রনীল ঘোষের স্মৃতিচারণায় উঠে এল সেই বটবৃক্ষের কথা, যিনি বাংলা ও বাঙালির উন্নতিসাধনের কথা বরাবর ভেবে এসেছেন। সদ্য বিধায়ক হওয়া তারকার মন্তব্য, “চরম বেদনার খবর, টুটুবাবুর (Tutu Bose) চলে যাওয়াটা। শুধুমাত্র শিল্প-বাণিজ্যের জগৎ নয়, মোহনবাগানও শুধু নয়, তার বাইরের একটা বিরাট পরিসর, তাঁকে চিনত, জানত এবং শ্রদ্ধা করত। ঠিক তেমনই বছর কুড়ি আগে আমার সঙ্গে কোনও এক অনুষ্ঠানে ওঁর পরিচয়। সাংঘাতিক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি কথা বলেছিলেন। তখন সৃঞ্জয় বোসের সঙ্গে আমার সদ্য বন্ধুত্বের শুরু। এত বড়মাপের মানুষ হয়েও বাকি পশ্চিমবঙ্গের নানান অলি-গলি, পাকস্থলীর মূল খবরগুলো কী, সেসব তিনি বিলক্ষণ জানতেন এবং কে, কেমন, কোথায়, কী কাজ করছে, তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। এহেন এতবড় একজন ব্যক্তিত্বের এসব খোঁজ রাখার বিষয়টি আমাকে খুব বিস্মিত করেছিল। তারপর পারিবারিকভাবে পরিচয় হয়। বোসবাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছি। রাজনীতির বাইরে গিয়ে সৃঞ্জয়-নীলাঞ্জনা ও অরিঞ্জয়-সহ পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গেও সখ্যতা বাড়তে শুরু করে। যাঁরা গুণী মানুষ, তাদের সমাদর কীভাবে করতে হয় কিংবা আভিজাত্যের সঙ্গে বজায় রাখতে হয়, তা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতাম, যখন টুটুবাবুর বাড়ির উঠোনে আমাদের আড্ডার আসর বসত। উনি ব্যস্ত থাকতেন, দুবাই বা বাইরে। তাই দেখা কম হত পরবর্তীতে। যে মানুষটি আমাদের বাংলার ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতেন, ভালো হওয়া নিয়ে ভাবতেন, তেমন একটা মানুষ চলে যাওয়া মানে আমাদের মাটিতে থাকা বটবৃক্ষ চলে যাওয়া। যে গাছ ছায়া দিত, ভবিষ্য়তের বার্তা দিত। আমি অত্যন্ত মর্মাহত।

“ওই আন্তরিকতা, স্নেহ, মমত্ববোধ, ওঁর দু’ চোখ দিয়ে ঝরে পড়ত। কোনও বিপদে-আপদে বাড়িতে প্রথম যে ফোনটি আসত, সেটা টুটুদার ফোন। অবাক লাগত! অনেকবার ভেবেছি, এহেন শিশুর মতো সারল্য নিয়ে…”
শোকজ্ঞাপনের সময়ে গলা বুজে এল গার্গী রায়চৌধুরীর। বোস বাড়ির বন্ধু-অভিনেত্রী বললেন, “টুম্পাই, রূপাই আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু তো শুধু নয়, পারিবারিক বন্ধুও বটে। কিন্তু ওঁদের বাবা আমার কাছে অনায়াসেই টুটুদা। বলা ভালো, আমার মতো আরও অনেকের কাছেই উনি টুটুদা। প্রথম আলাপে কখনও বুঝতে দেননি যে উনি আমাকে প্রথম দেখছেন। ওই আন্তরিকতা, স্নেহ, মমত্ববোধ, ওঁর দু’ চোখ দিয়ে ঝরে পড়ত। কোনও বিপদে-আপদে বাড়িতে প্রথম যে ফোনটি আসত, সেটা টুটুদার ফোন। অবাক লাগত! অনেকবার ভেবেছি, এহেন শিশুর মতো সারল্য নিয়ে এই মানুষটি এত গভীর হন কী করে? এমন এক আন্তরিকতার বীজ ওঁর মধ্যে ছিল, যা বটগাছ হয়ে অনেককে ছায়া দিয়েছে। এবং ভবিষ্যতেও দেবে। আমার প্রার্থনা , উনি যে ছায়াটা রেখে গেলেন, যে অন্তরের শিক্ষাটা সকলকে দিয়ে গেলেন, আমরা যেন সেপথ ধরে আরও অনেকগুলো বছর চলতে পারি। ভালো থাকুন টুটুদা, আপনি থাকবেন আমাদের মধ্যে, আমার মধ্যে আজীবন।”
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
মেসির মায়ামিতে নিষ্প্রভ রোনাল্ডো! কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ড্র’য়ে নকআউটে কঠিন লড়াইয়ে পর্তুগাল
-
রেকর্ড বুকে কেন, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, জিতেও নকআউটে কঠিন লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়া
-
সিআইডি সেজে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য রাস্তা থেকে অপহরণ করে ডাকাতি, তদন্তে পুলিশ
-
‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে কাঁপল করাচির সেনা দপ্তর, চলল গুলি, মৃত্যু তিন পাক সেনার
-
লেনিন নয়, হৃদয় সম্রাট শিবাজি! ‘লাল’ যাদবপুরে পালিত ‘হিন্দু সাম্রাজ্য দিবস’



