Babur

নির্মম বাবর! পানিপথের প্রথম যুদ্ধে গ্রামবাসীদেরই ‘ঢাল’ বানিয়ে ঠেলে দেন মৃত্যুর মুখে

কম সেনা নিয়েও যুদ্ধে কার্যতই বাবর দুরমুশ করে দেন ইব্রাহিম লোধির সেনাকে।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মে ২৩, ২০২৬, ১৬:৪৬

options
link
নির্মম বাবর! পানিপথের প্রথম যুদ্ধে গ্রামবাসীদেরই ‘ঢাল’ বানিয়ে ঠেলে দেন মৃত্যুর মুখে
পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোধিকে পরাস্ত করেন বাবর।

ইতিহাস বারবার প্রতিধ্বনিত হয়। ভারতবর্ষে মুঘল শাসন শেষ হওয়ার পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ দীর্ঘ সময়। কিন্তু মুঘল সম্রাটরা ফিরে ফিরে আসেন আলোচনায়। ‘বাবরনামা’র মতো গ্রন্থে এখনও থেকে গিয়েছে ফেলে আসা দিনকাল। এই সব গ্রন্থ আমাদের বুঝিয়ে দেয়, যে কোনও যুদ্ধবাজ সর্বদাই সাধারণ মানুষকে টোপ বানিয়ে নিজের রক্ততৃষ্ণা মেটায়! অথচ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘রাজছত্র ভেঙে পড়ে; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে;/ জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে;/ রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি/ শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।’ কিন্তু একথা অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদীরা কবে আর বুঝেছে?

Advertisement

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোধিকে পরাস্ত করেন বাবর। এদেশে শুরু হয় মুঘল শাসন। সেই যুদ্ধে বাবরের কাছে ছিল মাত্র ৫ হাজার সেনা! অন্যদিকে লোধির সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে বাবরের মাথায় খেলে যায় দুষ্ট বুদ্ধি! বাবরনামায় (যা ‘তুজুক-ই-বাবরি’ নামেও পরিচিত) রয়েছে- ‘ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়ি ও শহরতলি-সহ পানিপথ আমাদের এক পাশে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। আর বাকি দিকগুলি সুরক্ষিত থাকবে শকট ও আড়ালের বেড়া দিয়ে। যার আড়ালে আমাদের পদাতিক সৈন্যরা থাকবে।’ বাবরের পৌত্র সম্রাট আকবরের নির্দেশে রচিত গ্রন্থটির এই ক’টি লাইনে ধরা রয়েছে এক নিষ্ঠুর শাসকের প্রতিচ্ছবি।

Advertisement

Advertisement

আজ থেকে মোটামুটি ঠিক ৫০০ বছর আগের কথা। সেটা এপ্রিল মাস। মধ্য এশীয় সমরনায়ক বাবর জানতেন তাঁর কাছে ফিল্ড আর্টিলারি এবং ম্যাচলক আর্কিবুস (এক ধরনের আদিম বন্দুক) রয়েছে। কিন্তু বারুদ-কামান থাকা সত্ত্বেও সৈন্যসংখ্যা যে প্রতিপক্ষের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ! কেবল অশ্বারোহী বাহিনী কিংবা বারুদের উপর নির্ভর করে যুদ্ধ জেতার পরিকল্পনা করতে রাজি ছিলেন না বাবর। তাঁকে বুঝেশুনে পরিকল্পনা করতে হয়েছিল। আর তখনই তিনি স্থির করেন, সাধারণ মানুষকে ‘ঢাল’ বানাবেন!

এক্ষেত্রে ইব্রাহিম লোদির দিকটাও একবার দেখা যাক। তিনি বাবরকে শুরুতেই প্রতিহত করেননি। বরং অপেক্ষা করছিলেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, হিন্দুকুশ পর্বত এবং চেনাব-ঝিলাম-সুতলেজ নদী পেরিয়ে এসেছিলেন বাবর। লোধি কি পারতেন না তাঁকে আগেই প্রতিহত করতে? তিনি তা করেননি। বলতে গেলে দিল্লিতে বাবর চলে আসা মানেই তিনি লোধির দোরগোড়াতেই উপস্থিত! কিন্তু তিনিও আসলে অপেক্ষা করছিলেন বাবর কী করেন তা দেখে তবেই প্রত্যাঘাত করবেন।

বাবরনামা

বাবর আক্রমণ করলেন। এবং শুরুতেই রীতিমতো বড়সড় ধাক্কা খেলেন। জানা যায়, তাঁর হাজার দুয়েক সৈন্য মারা যায় শুরুতেই। যেখানে হাতেই আছে মাত্র হাজার পাঁচেক সেনা, সেখানে এতজনের মৃত্যু রীতিমোত আশঙ্কাজনক। অথচ বাবর পরে দাবি করেছিলেন, এই ক্ষতি তিনি স্বীকার করেন স্রেফ লোধিকে আরও প্রলোভন দেখাতেই। এবং সেটা কাজে লেগে যায়। বাবরের সেনার প্রাথমিক ধাক্কায় লোধি ভাবতে শুরু করেন শত্রু মোটেই তত শক্তিশালী নয়। তিনি হামলা করলেন। আর ঠিক সেটাই চাইছিলেন বাবর।

আত্মবিশ্বাসী লোধির সেনা এগিয়ে এল বিশৃঙ্খল বিন্যাসে। আসলে সংখ্যাধিক্য ও রণহস্তী তাঁকে প্রবল বিশ্বাস জুগিয়েছিল। তার উপর ছিল শুরুতেই শত্রুকে জবরদস্ত মার দিতে পারার আনন্দ। এদিকে বাবর সেনা সাজালেন ‘তুলুঘনামা’ কায়দায়। আর এই রণকৌশলেরই একটা অংশের কথা আমরা শুরুতেই বলেছি। একদিকে রাখলেন শহরতলির ঘরবাড়ি, জনবসতি। অন্যদিকে শয়ে শয়ে শকট, গাছপালা, পরিখা… বাবর ভালোই জানতেন লোধির আক্রমণে কার্যতই মৃত্যুমুখে পতিত হবে সাধারণ মানুষ। কিন্তু রণকৌশল সাজাতে গিয়ে তাঁদের প্রাণকে ‘বোড়ে’ বানাতে কোনও কুণ্ঠা ছিল না তাঁর। আজকের দিনে হলে নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ধরা হত এই কাজ!

বলাই বাহুল্য, এই ‘প্ল্যান’ দারুণ ভাবে কাজ দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাবর রক্ষা করতে পেরেছিলেন নিজের সেনা। রণসজ্জার একেবারে কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন পুত্র হুমায়ুন ও বিশ্বাসী সেনাপতি মহম্মদ মির্জা। লোধির সেনা এগিয়ে আসতে ফাঁকা ময়দানে কামান দাগা শুরু করলেন বাবর। তাঁর কাছে ছিল ৪০টি হালকা কামান। ছিল আরও গোলাবারুদ। প্রেমময় দাশগুপ্ত অনূদিত ‘বাবরনামায়’ পাচ্ছি- ‘যুদ্ধ শুরু হল। কিন্তু বাবরের কৌশলের কাছে সুলতানের বাহিনী দাঁড়াতে পারল না। শকটের আড়ালে স্থান নেওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বাহিনীও সুলতানের বাহিনীকে ব্যূহ রচনা করে এবার চেপে ধরল।’

লোধির সেনা কাছে আসতেই গর্জে ওঠে বাবরের কামান। এই গর্জন ও ধোঁয়ার সম্মিলিত ধাক্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ল হাতিরা। দেখা গেল লোধির সেনাবাহিনীর উপরই চড়াও হয়েছে তারা। একদিকে কামান-গোলাবারুদ, অন্যদিকে বিশৃঙ্খল হাতির দলের তাণ্ডবে ছত্রকায় হয়ে গেল তারা। বাবরনামায় লেখা আছে- ‘দুপুরের মধ্যেই এই হৃদয়-বিদারক দৃশ্যে যবনিকা পড়ল। যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে হাজার মৃতদেহের স্তূপ। খুব অল্প আফগানই প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছে।’ ইতিহাসবিদরা বলছেন, ২৫ থেকে ৩০ হাজার সেনার মৃত্যু হয়েছিল। একদিনের যুদ্ধের নিরিখে সংখ্যাটা অনেক বেশি। বাঁচেননি লোধিও। বাবর কার্যতই থেঁতলে দিয়েছিলেন লোধির আত্মবিশ্বাস ও তাঁর গোটা সেনাবাহিনীকেই।

বাবর নিজেও অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি। তিনি মারা যান চার বছরের মধ্যেই। কিন্তু ততদিনে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর এমনভাবে গেঁথে দিয়েছেন, তা অনায়াসে পেরিয়ে যাবে আরও দুই শতাব্দী। আবার ফিরে যাই ‘বাবরনামা’য়- ‘…কাবুলের পরিবর্তে দিল্লীই এবার বাবরের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির কেন্দ্রপীঠ হয়ে উঠল। সফল হল কিশোর বয়স থেকে দেখে আসা তাঁর সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন।’

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.