অতুলচন্দ্র নাগ: ফোন কল কিংবা ই-মেল৷ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের ভুয়ো পরিচয় দিয়ে জেনে নেওয়া হয় এটিএমের তথ্য৷ ব্যস তারপরই কেল্লাফতে৷ ওই গ্রাহকের টাকা অ্যাকাউন্ট থেকে পেটিএম বা মোবাইল মানিতে ট্রান্সফার করে অনলাইনে চলে দেদার কেনাকাটা৷ আর এটিএম কার্ডটি যাঁর, তিনি সর্বস্বান্ত। অনলাইন এবং অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রতারণার পর্দা ফাঁস করতে প্রতিদিনের অন্তর্তদন্ত।
[ছুটিতে দিঘার হোটেলের ভাড়া আকাশছোঁয়া, কোন চক্র সক্রিয় জানেন?]
স্মার্ট গলা৷ কখনও পুরুষ, কখনও তরুণী৷ একেবারে কর্পোরেট৷ মনে হবে সত্যিই কোনও ব্যাঙ্কের আধিকারিক বা ম্যানেজার৷ সেইরকম পরিচয় দিয়ে ভাবগম্ভীর গলায় বলবেন, “ব্যাঙ্ক থেকে বলছি, আপনার এটিএম কার্ড-এর ভ্যালিডিটি আজ শেষ হয়ে যাবে৷ তাই এটিএম কার্ডের পিন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিন৷” এইরকম গুরুগম্ভীর গলার কাছে আপনি বোকা বনে আপনার এটিএম-এর যাবতীয় তথ্য দিয়ে দিলেন৷ তার কিছুক্ষণ পরই টের পাবেন কতটা সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। দ্রুত আপনার মোবাইলে চলে আসবে মেসেজ৷ সেখানে দেখা যাবে আপনার অ্যাকাউণ্ট থেকে হাজার হাজার এমনকী লক্ষাধিক টাকাও তোলা হয়ে গিয়েছে৷ এভাবেই ‘এটিএম ক্রাইম’ চলছে৷ আর এই অপরাধে যুক্ত থাকা দুষ্কৃতীদের ফাঁদে পা দিয়ে বোকা বনছেন অনেকেই৷
[লণ্ঠন অন্ধকার, অসাধু চক্রের ‘হাতযশে’ কেরোসিনে চলছে বাস]
যত কাণ্ড ঝাড়খণ্ডে
ভুয়ো ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের পরিচয় দিয়ে এটিএম-এর তথ্য জানতে ফোন শুধু সাধারণ মানুষের কাছে নয়, আসছে পুলিশ-সহ আমলাদের কাছেও৷ বিভিন্ন অফিসে আমলাদের একেবারে সিরিয়াল নম্বর ধরে এই ফোন আসছে৷ সতর্ক না হলেই ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থাকা সমস্ত টাকাই কার্যত হাতিয়ে নেবে দুষ্কৃতীরা৷ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ থেকে পুলিশ নানাভাবে প্রচার করলেও ওই চক্রের ফাঁদে বারবার ধরা পড়ছেন গ্রাহকরা৷ চলতি বছরে পুরুলিয়ায় এমন ফোন যে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে কত গিয়েছে, তার হিসাব নেই বিভিন্ন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে৷ নানা অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে এই ফোন আসে৷ এই নম্বরগুলি যাতে ছড়িয়ে না যায়, তাই দুষ্কৃতীরা নানা ধরনের সিম ব্যবহার করে৷ কোনওরকম ডকুমেণ্টস ছাড়াই হাতের কাছে ঝাড়খণ্ড থেকে সিম কার্ডগুলি তোলে দুষ্কৃতীরা৷ পুলিশের তথ্য বলছে, এই অপরাধের ‘আঁতুরঘর’ এখন ঝাড়খণ্ড৷
[ক্রেতা ভেবে পুলিশকেই ফোন! জালে নারী পাচারকারী]
ছুটির দিনে অপরাধের জাল
এই ‘এটিএম ক্রাইমে’ দুষ্কৃতীরা মূলত ‘ব্যাঙ্ক হলিডে’কে বেছে নেয়৷ দ্বিতীয়-চতুর্থ শনিবার, রবিবার কিংবা কোনও ছুটির দিন৷ দুষ্কৃতীদের এই গোটা অপরাধটিই সংগঠিত হয় মোবাইল ও ইন্টারনেটে৷ বলা যায় ‘অনলাইন ক্রাইম’৷ এটিএম-এর নানা তথ্যাদি জেনে নিজের ‘পেটিএম’, ‘মোবাইল মানি’-সহ নানা অ্যাপে টাকা ট্রান্সফার করে নেয় তারা৷ কিংবা চলে অনলাইনে কেনাকাটা৷ এমনকী, লাপু সিমে (যে সিম দিয়ে রিচার্জ করেন দোকানদাররা) টাকা ট্রান্সফার করে নেয়৷ তারপর মোবাইল, ডিস টিভিতে রিচার্জও করে নেয়৷
[সরকার পাঠাচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, কোন চক্র উধাও করছে রেশনের চাল-গম?]
টাকা ডেবিট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকরা ব্যাঙ্কে জানালে কর্তৃপক্ষ যাতে দ্রূত কোনও পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাই ‘ব্যাঙ্ক হলিডে’তেই এই ক্রাইম বিভিন্ন মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছ থেকে অপরাধীরা মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে৷ তারপর সেই নম্বর ধরে চলে ফোন৷ ফোনে ট্রু কলার থাকায় গ্রাহকদের নাম, ঠিকানাও অত্যন্ত স্মার্টভাবে বলে দেয় দুষ্কৃতীরা৷ ফলে অপর প্রান্তে থাকা গ্রাহকরা বুঝতেই পারেন না তারা কীভাবে দুষ্কৃতীর ফাঁদে পা দিয়েছেন৷
বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর নানা ছক
অনেক সময় আবার গ্রাহকদের ব্যাঙ্কের নামও বলে দেয় ওরা৷ শুধু তাই নয় এটিএম কার্ডের ষোলোটি নম্বরের মধ্যে চারটি, আটটি এমনকী বারোটি নম্বর পর্যন্ত বলে দেয়৷ তারপর শেষ চারটি নম্বর জানতে চান৷ উল্টো প্রান্তে গ্রাহক বিশ্বাস করতে বাধ্য হন ফোন আসা ব্যক্তি ব্যাঙ্কেরই অফিসার৷ কিন্তু কোনও ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনও ফোন করে আপনার এটিএম তথ্য চায় না৷ এ বিষয়টি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে প্রচার করলেও দুষ্কৃতীদের ফাঁদে পা গলিয়েই দিচ্ছেন গ্রাহকরা৷ কিন্তু প্রশ্ন, একজন গ্রাহকের এত তথ্য দুষ্কৃতীরা পাচ্ছে কী করে? এর উত্তর নেই পুলিশের কাছেও৷ তাহলে কি সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের নিচুতলার সঙ্গে এদের যোগ রয়েছে? এখনও সেইরকম তথ্য প্রমাণ হাতে না এলেও বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ৷ প্রতারকরা কোনও গোপন ক্যামেরা বা অন্য কোনও ডিভাইস যেমন স্কিমারের মাধ্যমে বা এটিএম ব্যবহারের সময় পিছনে উঁকি মেরে তথ্যাদি জেনে নিতে পারে৷ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এই কার্ড ব্যবহারের সময়ও তথ্য চলে যায় প্রতারক বা দুষ্কৃতীদের কাছে৷ তাছাড়া গ্রাহকদেরকে ই-মেল করেও কখনও কখনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জেনে নেয় এরা৷ ই-মেলে তারা জানায়, ‘আপনি অনেক টাকা পুরস্কার জিতেছেন কিংবা আপনার ব্যাঙ্কের তথ্যাদি আপডেট করা প্রয়োজন৷ এই জন্য দেওয়া লিংক-এ ক্লিক করুন৷ এখানে ক্লিক করলেই প্রতারকরা জেনে যায় সমস্ত তথ্য৷ তাই সাবধান৷
[পাচারের ছক বদল, অনলাইনে বিক্রি হাতির দাঁত-সাপের বিষ]
কোন পথে জালিয়াতি
বিনা ডকুমেণ্টসে একাধিক সিম তোলা হচ্ছে। দুষ্কৃতীরা বেছে নিচ্ছে ব্যাঙ্ক হলিডেগুলিকে। গোটা অপরাধই হয় মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে। এটিএমের তথ্য জেনে নিজের পেটিএম, মোবাইল মানিতে টাকা ট্রান্সফার করিয়ে নেয়। অনলাইনেও কেনাকাটা করে আপনার অ্যাকাউণ্ট ফাঁকা করে দেয়।
[ঘিতে মিশছে রাসায়নিক-চর্বি, কীভাবে ভেজাল ধরবেন?]
জালিয়াতদের চমক
ফোনে ট্রু কলার থাকায় গ্রাহকদের ঠিকানা জেনে দুষ্কৃতীরা গ্রাহকদের ব্যাঙ্কের নামও বলে দেয়। এটিএম কার্ডের ষোলোটি নম্বরের মধ্যে চারটি, আটটি এমনকী বারোটি নম্বর পর্যন্ত বলে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।
কীভাবে সতর্ক হবেন?
আপনার ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনও পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করে কোনও ই-মেল পাঠায় না৷ এই লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করলে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউণ্ট-র তথ্যাদি জেনে যাবে দুষ্কৃতীরা৷ কখনই এই ধরনের ই-মেল দেওয়া লিঙ্ক-এ ক্লিক করবেন না৷
[দেখতে ছানা টাটকা, দুধ কাটাতে ব্যবহার হচ্ছে ‘বিষ’]
এটিএম কার্ড ধারকদের পাঁচ রক্ষাকবচ
এটিএম কার্ডের খাপে পিন নম্বর লিখে রাখবেন না৷ এটিএম কার্ডের পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড কখনই কাউকে বলবেন না৷ সাবধান থাকুন ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া, গুরুত্বহীন ফোন কল, ই-মেল অথবা ফোনে আসা মেসেজ সম্পর্কে। এসব থেকে লেনদেনের তথ্য যাচাই করুন এবং সেই সংক্রান্ত কাগজপত্র ফেলে দেওয়ার আগে নষ্ট করে দিন৷
[ আলুতে দেদারে মিশছে বিষাক্ত রং, বুঝবেন কীভাবে? ]
ফোন কলে সাবধান
নিত্যনতুন মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসে৷ ব্যাঙ্ক থেকে বলছি বলে এটিএম-র তথ্য জানতে চায়৷ বলে আপনার এটিএম কার্ডের ভ্যালিডিটি শেষ৷ এই কৌশলে জেনে নেয় এটিএম কার্ডের নম্বর, পিন বা পাসওয়ার্ড৷ আবার কখনও বলে আপনার এটিএম এক্সপায়ার হয়ে যাবে৷ এক্সপায়ার ডেট-সহ এটিএম কার্ড ও পিন নম্বর বলুন৷ আমরা চালু করে দেব৷
[বাজারে গিয়ে রংচঙে মাছ পছন্দ? আপনিই কিন্তু জালে পড়ছেন!]
কী করবেন?
আপনার ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনও ফোন করে আপনার এটিএম-র তথ্য চায় না৷ প্রতারকরা এই সকল ফোন করে থাকে৷ কখনও আপনার এটিএম কার্ডের নম্বর বা পিন নম্বর দেবেন না৷ এরকম ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে এটিএম কার্ড ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা বন্ধ করে দেবেন৷
সর্বশেষ খবর
-
জিমন্যাস্টিক্সে ফাইনালে প্রণতি নায়েক, অব্যবস্থার শিকার, একার লড়াইয়েও চমক বঙ্গকন্যার
-
সাংসদ যেন কৃষক! নিজের বাড়িতে করম পুজোয় মাতলেন জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো
-
‘বন্ধুত্বে’র প্রতিদান! মুকুন্দপুরে মমতাপন্থীদের ‘আক্রান্ত’ হওয়ার প্রতিবাদ কংগ্রেসের, সুগম জোটের পথ?
-
চৈতন্য ও সুলক্ষণা, ২ হস্তিশাবকের নামকরণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী, কেন এই নাম? জানালেন নিজেই
-
এবিভিপি-টিএমসিপি সংঘর্ষের জের! ১ মাস বন্ধ বারাসত বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল! বেরিয়ে গেলেন ছাত্ররা