তরুণকান্তি দাস, গোয়ালিয়র: মলখান হাজির হো…। হো-হো করে হাসিতে ফেটে পড়া শব্দ কানে আসে। লৌহ ফটক সামান্য ফাঁক করে গোঁফ ও জুলফির ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দেওয়া মুখ উঁকি মারে। সেই ফটকের গা ঘেঁষে দেওয়ালে সাঁটা নেমপ্লেটে তাঁর চমকপ্রদ পরিচয় পর্ব আগন্তুকের জন্য- “ডাকু মলখান সিং। আত্মসমর্পণকারী।” ঠিক যেমন কোনও পেশায় প্রতিষ্ঠিতজন তাঁর সগর্ব উপস্থিতি জানান দেন নেমপ্লেটে, এও তেমন। তিনি মলখান সিং, ‘কিসিসে কম নেহি’ বলেই তো এক হেঁচকা টানে হাত ধরে ঘরে ঢুকিয়ে নেন সেই নাম-পর্বের প্রস্তরফলকে চোখ আটকে যাওয়া সম্মোহিত বাংলার সাংবাদিককে। যাঁর পাক্কা তিনদিনের মলখান-অভিযান সাফল্য পেল সাতসকালে।
[খারিজ নীরব মোদির জামিনের আবেদন, জেলেই থাকছেন ‘হীরক রাজা’]
তা-ও কোথায়? চম্বলে নয়, কোনও গাঁয়ে বা মফস্সলে নয় একেবারে রাজার শহর গোয়ালিয়রে। সত্যিই মলখানকে যে কেন ‘ডাকু সর্দার’ বলে চম্বল– তা বুঝে উঠতে এই বাড়িটাই যথেষ্ট! এখানেই হাজির তিনি। মলখানের মালখানায় তিনটে বন্দুক, দুটো চারচাকা, মোটরবাইক এবং আরও কত কী! তবে ঘোড়া নেই? ফের হো-হো হাসি। চম্বলের পাহাড়ের ঢালে ঘোড়া ছোটানো রাস্তায় হাসলে নির্ঘাৎ এর প্রতিধ্বনিতে হো-হো রব উঠত।
মাথা দোলান কলপ করা ঝাঁকড়া চুলের ৭২ বছর বয়সি ‘যুবক’। স্ত্রী ললিতা এখন ৪৫। রাজ-ঘরানার নকশাকাটা কাপে চায়ের সঙ্গে সাজিয়ে দেন নমকিন। সামনে বসে মশলার পাহাড়, চম্বলঘাঁটির অবিসংবাদী শাসক মালখান। যিনি ফুলনদেবীর সঙ্গেই দল সামলেছেন। ভিন্ন জেলায় হাজার তিরেশেক মানুষের সামনে আত্মসমর্পণের পর্বে খানআটেক পুলিশ জিপের কনভয়, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের জড়িয়ে ধরে বীরের মর্যাদা দেওয়ার স্মৃতি-কাতরতা চেপে ধরে তাঁকে। এবং বলেন, “আমি ফুলনকে সমর্থন করতাম কারণ ও ডাকাত ছিল না। ফুলন ছিল একটা প্রতিবাদের নাম। আমিও তাই। কখনও কোনও মহিলার ইজ্জত লুঠিনি। বরং বেহড়ের মা-বোনের দিকে কোনও নোংরা চোখ দেখলেই গুলি করেছি। বেশ করেছি।”
আত্মসমর্পণের পর চম্বলের ডাকাতরা কেউ বাড়ি ফেরেনি। সরকারের সাহায্যে নয়া আস্তানা প্রাপ্তি যদি তার দ্বিতীয় কারণ হয়, তবে প্রথম কারণ হল বেহড়ে থাকলে খুন হয়ে যাওয়ার ভয়। ভিন্দের বিলাও গাঁয়ে তাই যখন মলখানের খোঁজে দোরে দোরে ঢুঁ মারছি, তখন তাঁর পড়শিরা যে ঝটকা দিলেন তা মোটেও ধীরে লাগার মতো নয়। খঙ্গার রাজপুত গোষ্ঠীর লোকটি থাকেন গোয়ালিয়রে। ছয় কম একশো মামলা তাঁর নামে। ১৭টা খুন, ২৮টা অপহরণ, খান বিশেক খুনের চেষ্টা, এবং গুচ্ছ ডাকাতিতে অভিযুক্ত লোকটা রাজার শহরে রাজার হালে বসে পা দোলাচ্ছেন! বাপ রে! এবং দশচক্রে খুঁজে পেতে বি-১৫, সদাশিবনগরে পা রেখে আক্কেল গুড়ুম। নেমপ্লেটের কী ছিরি! ডাকু। সমর্পিত। ঢুকেই প্রশ্ন, “আপনি তাহলে ডাকু?” গোল্লা চোখখানি এমনভাবে আমাকে মাপল, যেন গুলি চালিয়ে দেবে। নেহাত ভোটের বিধিতে বন্দুক জমা পড়েছে জেলাপ্রশাসনের কাছে। তাই রক্ষে! চেহারা যেমন, মনটা তেমন নয়। একসঙ্গে তিনটে লাড্ডু মুখে পুরে দার্শনিক হলেন, “আমরা বাগী। প্রতিবাদী। তার জন্য পরিবার পরিজনকে কত পুলিশি হেনস্তা সইতে হয়েছে জানেন? ঘর ছেড়ে, স্ত্রী ছেড়ে জঙ্গলে-পাহাড়ে রাতদিন এক করে থাকার জীবন কেউ বুঝবে না।”
এই বাড়িটা বিশাল। দুই পুত্র স্কুল ও কলেজে। মেয়েও পড়ুয়া। তাদের হাতে বন্দুক নয়, কলম তুলে দিয়ে শান্তি পেয়েছেন মলখান। যিনি বিধানসভায় লড়েছেন। এবার তাঁর খঙ্গার গোষ্ঠীর স্বার্থে ভোটে লড়তে নেমেছেন। সময় কম। যাবেন উত্তরপ্রদেশে। রোজ সকালে একঘণ্টা পুজোপাঠ সেরে মাথায় তিলক কেটে দিনের শুরু। “দেখতে চাই ডাকাতি করে মলখান লিংয়ের মালখানায় কত সম্পত্তি আছে।” রসিক ডাকু জবাব দেন, “অধর্মের কামাই জমানো যায় না। সব বয়ে যায়। আত্মসমপর্ণের সময় সব বিলিয়ে দিয়েছি। শুধু বন্দুক ছাড়া। লাইসেন্স আছে আমার।” “বন্দুক কেন?” বিড়বিড় করেন এই বয়সেও শক্তসমর্থ প্রায় ৬ ফুটের মানুষটি– ‘ভয় হয়’।
ডাকু মলখানেরও ভয়? চম্বল নদীর মতোই রহস্য জিইয়ে রেখে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ডাকু মলখান সিং। আত্মসমর্পিত। যিনি একটু আগেই সগর্বে বলছিলেন “পুলিশ আমাকে ধরতে পারেনি, পারত না নিজে ধরা না দিলে!”
[বদলাচ্ছে বিহার! বন্দুক শিল্প থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে মুঙ্গের]
সর্বশেষ খবর
-
বিশ্বকাপে লজ্জার হারের পর জার্মানির কোচ হচ্ছেন ক্লপ? মুখ খুললেন লিভারপুলের প্রাক্তন ‘বস’
-
প্রতারণার পর্দাফাঁস করতে এবার প্রতি থানায় সাইবার ডেস্ক, নির্দেশ লালবাজারের
-
জানালা দিয়ে উড়ে আসা ডিমে ভিজল শাড়ি, কালীগঞ্জে এবার হামলার শিকার মহুয়া!
-
বারবার পশ্চাৎদেশে ক্যামেরা তাক! পাপারাজ্জিদের ‘কান মুলে’ সভ্যতার পাঠ নেহা ধুপিয়ার
-
‘চোরে চোরে ভায়রাভাই’, কুম্ভমেলার সময় সর্বাধিক চুরি রাম মন্দিরে! প্রকাশ্যে বিস্ফোরক তথ্য