Medical College Kolkata

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ৫০০০ রোগী, বেড ১৯০০!

সরকারি হাসপাতাল লক্ষ লক্ষ মানুষের শেষ ভরসা। কিন্তু সেই ভরসার ভিত কতটা মজবুত? কোথায় দুর্বল স্বাস্থ্য পরিষেবা? পরিকাঠামোর অভাবই কি বাড়াচ্ছে রোগীদের দুর্ভোগ? চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরা সচেষ্ট, তবু গাফিলতি কোথায়? ‘সংবাদ প্রতিদিন’ অন্তর্তদন্ত। আজ প্রথম পর্ব।

অভিরূপ দাস
অভিরূপ দাস

শেষ আপডেট: জুলাই ১৮, ২০২৬, ২০:৫৭

options
link
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ৫০০০ রোগী, বেড ১৯০০!
পরিকাঠামোর অভাবই কি বাড়াচ্ছে রোগীদের দুর্ভোগ?

ফি দিন চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী আসেন কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজের ওপিডিতে। অথচ প্রাপ্ত বেডসংখ‌্যা সর্বোচ্চ ১৯০০। রোজ আগত রোগীদের মধ্যে তিনভাগের এক ভাগকে ভর্তি করতে হলেই সিংহভাগ বেড ভরপুর। সূত্রের খবর, কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালের মোট বেড ২১০০। কিন্তু সংস্কার-সহ নানাবিধ কারণে দুশো বেড সবসময়ই রক্ষণাবেক্ষণের অধীনে থাকছে। যার জেরে গুরুতর অসুস্থ রোগীরা বেড পাচ্ছেন না নিয়মিত।

Advertisement

শতাব্দী প্রাচীন কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজের একাধিক বিভাগে মেলে উচ্চমানের চিকিৎসা। শিশুরোগ বিভাগ, সার্জারি, প্রসূতি, ইএনটি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন অগুনতি। ওপিডি টিকিট কাউন্টারের হিসাব বলছে, ফি দিন গড়ে সাড়ে চারহাজার রোগী আসেন বহির্বিভাগে। গোটা পূর্ব ভারতের একমাত্র জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগ রয়েছে কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজে। ফলে হাওড়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, দুই চব্বিশ পরগনা তো বটেই, ভিনরাজ‌্য থেকেও প্রবীণরা চিকিৎসার জন‌্য আসেন কলকাতা মেডিক‌্যালে। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, যত রোগীর ভিড় তত কর্মী নেই হাসপাতাল চত্বরে। অভাব রয়েছে ট্রলিরও। অনেক সময় হাসপাতাল পরিসরে ট্রলি থাকলেও তা মিলছে না কাজের জায়গায়। ফলে ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্তকেও হেঁটে যেতে হচ্ছে। সোমবার, তেমনই ছবি দেখা গেল কলকাতা মেডিক‌্যালে। সাঁতরাগাছি থেকে কলকাতা মেডিক‌্যালে শেখ হায়দার আলি এসেছিলেন মাকে নিয়ে। হায়দার আলির মায়ের ব্রেন স্ট্রোক। তাঁর কথায়, “মায়ের ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছি। ট্রলি পেলে সুবিধা হত। কিন্তু যেতে হচ্ছে হেঁটেই।” ‘ঢিমেতালে’ নয়। রাজ্যে পালাবদলের পর স্বাস্থ‌্যক্ষেত্রে জোরকদমে কাজ চান মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেইমতো মুখ‌্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই স্বাস্থ‌্য পরিষেবা শ্রীবৃদ্ধির জন‌্য বৈঠক করেছিলেন এসএসকেএমে। রোগীর পরিবারের দাবি, এই সমস্ত বিষয়গুলোয় নজর দেওয়া হোক।

Advertisement

কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, দাবি হাসপাতালে আসা রোগী ও রোগী পরিবারগুলির। দালাল চক্র ঠেকাতে ইতিমধ্যেই জরুরি বিভাগের বাইরে বসেছে স্ক্রিন। যদিও সেই স্ক্রিনের সংখ‌্যা আরও বাড়ানোর দাবি তুলেছেন রোগীর পরিবার। হাসপাতালের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি বিভাগে কটা বেডে রোগী ভর্তি, কতগুলি খালি দেখা যাচ্ছে লাইভ স্ক্রিনে। তার তালিকা চলে আসছে অন ডিউটি সিনিয়র রেসিডেন্ট বা এসআরওডি-র হাতে। সিনিয়র রেসিডেন্ট ওপিডিতে রোগীকে পরীক্ষা করার পর ভর্তির প্রয়োজন মনে করলে সেখান থেকেই শুরু অ‌্যাডমিশন প্রসেস।

Advertisement

পরিষেবার পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি তুলেছে রোগীর পরিবার। রক্ষণাবেক্ষণে আরও জোর দিতে বলেছেন ডাক্তারি পড়ুয়ারা। সম্প্রতি কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজে রিডিং রুমের ফলস সিলিংয়ের একাংশ ভেঙে পড়ে। ডাক্তারি পড়ুয়াদের ক্ষোভ, মাঝে মধে‌্যই ভেঙে পড়ে হাসপাতালের ফলস সিলিং-সহ অন‌্যান‌্য অংশ। হস্টেলের শৌচালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও অভিযোগ জানিয়েছেন কেউ কেউ। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ১৯১ বছরের পুরনো মেডিক‌্যাল কলেজে একাধিক ভবনে মেরামতির অভাব রয়েছে। সম্প্রতি প্রশাসনিক ভবনেও ফাটল দেখা গিয়েছে। পূর্ত দফতরের আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের পূর্ত দফতরের কর্মীরাও জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে অল্প অল্প করে টাকা বরাদ্দ হতো। ফলে কাজ চলত জোড়াতালি দিয়ে।

একাধিক জেলার বাসিন্দাদের তুমুল ভিড়। অথচ সেই তুলনায় প্রতীক্ষালয় নেই কলকাতা মেডিক‌্যালে। বর্ষায় মাথা গুঁজে গুরুতর অসুস্থ রোগীর পরিবারের সদস‌্যরা বসে থাকেন জরুরি বিভাগের গেটের মুখে। ত্বকের সমস‌্যার জন‌্য স্ত্রীকে নিয়ে বীরভূমের নলহাটি থেকে এসেছেন জামিরুল ইসলাম। তাঁর কথায়, ‘‘ত্বকরোগ বিভাগে ডাক্তার দেখানোর লম্বা লাইন। অপেক্ষা করতে হবে। অথচ বৃষ্টিতে অপেক্ষা করার জায়গা নেই।’’ বাধ‌্য হয়ে জরুরি বিভাগের বাইরে যাতায়াতের মুখে জটলা। মাঝেমধ্যে তা সরিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। আবার ভিড় জমে। সম্প্রতি মুখ‌্যমন্ত্রী এঁদের কথা ভেবেই হাসপাতাল চত্বরে অপেক্ষারত রোগীর পরিবারের জন‌্য মাথার শেড তৈরি করে দেওয়ার কথা বলেছেন।

বেশ কিছু বিভাগে চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। মেডিক‌্যাল কলেজের অনেক চিকিৎসক অবসরের দোরগোড়ায়। তবে বাড়ানো হয়েছে হাসপাতালের লিফটম‌্যানের সংখ‌্যা। পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকরা যাতে নিয়মিত লিফট পরীক্ষা করেন সে বিষয়ে কড়া হতে বলেছেন আধিকারিকরা। কলকাতা মেডিক‌্যাল কলেজে ক্রিটিক‌্যাল কেয়ার ইউনিটের সংখ‌্যা ছুঁয়েছে হাফ সেঞ্চুরির লক্ষ‌্যমাত্রা। হাসপাতালের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, পঞ্চাশটি ক্রিটিক‌্যাল কেয়ার ইউনিট তৈরি থাকবে সর্বক্ষণ। যদিও গুরুতর অসুস্থ রোগীর ভিড় যেভাবে বাড়ছে তাতে এই সংখ‌্যাকেও অপ্রতুল মনে করছেন চিকিৎসকরা। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, অযথা ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে ভর্তি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবস্থা গুরুতর, কিন্তু ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের প্রয়োজন নেই। এমন রোগীদের সিসিইউতে নিয়ে ভর্তি রাখার দিন শেষ। সিসিইউ শুধুমাত্র অতি সংকটজনকদের জন‌্য। মেডিসিন, সার্জারি, প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ বিভাগ, নবজাতক বিভাগের রোগীদের জন‌্য হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট তৈরি রেখেছে কলকাতা মেডিক‌্যাল। ক্রিটিক‌্যাল কেয়ার ইউনিট বাদ দিয়ে অতিরিক্ত আরও কুড়িটি হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট প্রস্তুত কলকাতা মেডিক‌্যালে। তবে প্রশ্ন একটাই, মানুষ তার সুফল পেতে শুরু করবে কবে?

(চলবে)

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.