আজকের দিনে বাড়ির খুদেদের হাতে সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্টফোন। খাওয়ানো হোক বা কান্না থামানো- মোবাইলের স্ক্রিন যেন অনেক পরিবারের ‘সহজ সমাধান’। কিন্তু এই অভ্যেসই ধীরে ধীরে তৈরি করছে এক অদৃশ্য বিপদ।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের কথা বলতে দেরি হওয়ার পেছনে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম এখন বড় একটি কারণ হয়ে উঠছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করছেন, আগের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক শিশু দেরিতে শিখছে কথা বলা। সব শিশুর বিকাশ একরকম হয় না, এটা ঠিক। কিন্তু এখন একটি সাধারণ যোগসূত্র বারবার সামনে আসছে, যেখানে স্ক্রিনের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটানো।

ভাষা শেখার শুরু হয় জন্মের পর থেকেই
একটি শিশু প্রথম শব্দ উচ্চারণ করার আগেই তার মস্তিষ্ক ভাষা শেখার প্রস্তুতি নিতে থাকে। জীবনের প্রথম তিন বছর এই শেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় মা-বাবার সঙ্গে ছোট ছোট কথোপকথন, চোখে চোখ রাখা, হাসি, শব্দ অনুকরণ- এসবই শিশুর ভাষা শেখা বা কথা বলার ভিত গড়ে দেয়।
শিশুরা কখনও একা বসে কথা বলা শেখে না। তারা শেখে বড়দের প্রতিক্রিয়া থেকে। যখন মা কোনও শব্দ করে আর শিশু তা নকল করার চেষ্টা করে, তখনই তৈরি হয় ভাষার প্রথম সেতু। কিন্তু এই স্বাভাবিক যোগাযোগ যদি কমে যায় এবং তার জায়গা নেয় স্ক্রিন, তাহলে শেখার এই প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে।
স্ক্রিনটাইম কীভাবে ক্ষতি করছে?
মোবাইল, টিভি বা ট্যাব এখন ঘরের নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় সন্তানকে শান্ত রাখতে বা ব্যস্ত রাখতে স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়। এতে মুহূর্তের সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়ে শিশুর বিকাশে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল- স্ক্রিন শিশুকে ‘শোনায়’, কিন্তু ‘কথা বলতে শেখায় না’। বাস্তব কথোপকথনে যেমন প্রতিক্রিয়া থাকে, আবেগ থাকে, প্রশ্ন-উত্তর থাকে, স্ক্রিনে তা অনুপস্থিত। ফলে শিশুর মস্তিষ্ক সেইভাবে ভাষা প্রক্রিয়া করতে শেখে না।
তার ওপর দ্রুত বদলে যাওয়া ছবি, জোরে শব্দ- এসব ছোটদের মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে। যা শিশুর মনোযোগ ও ভাষা শেখার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

কোন লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
শিশুর কথা বলায় দেরি হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য কিছু লক্ষণ খেয়াল রাখা জরুরি-
- এক বছর বয়সেও মুখে শব্দ উচ্চারণের মতো কোনও আওয়াজ না করা
- নিজের নাম শুনে সাড়া না দেওয়া
- ১৮ মাসেও কয়েকটি শব্দ না বলা
- দু-বছরেও ছোট বাক্য গঠন করতে না পারা
- চোখে চোখ রেখে কথা না বলা
- কথা বলার বদলে শুধু ইশারায় বোঝানো
এই লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শহুরে জীবনে বাড়ছে ঝুঁকি
বর্তমান শহুরে জীবনে ছোট পরিবার, ব্যস্ত রুটিন আর সহজে পাওয়া ডিজিটাল ডিভাইস- সব মিলিয়ে শিশুদের জীবনে স্ক্রিনের উপস্থিতি অনেকটাই বেড়েছে। অনেকেই মনে করেন, ‘এডুকেশনাল ভিডিও’ দেখলে শিশুর শেখা হবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, ভিডিও কখনও মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের বিকল্প হতে পারে না।
ভাষা শুধু শব্দ শেখা নয়- এতে অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া, সামাজিক যোগাযোগ, সবকিছু জড়িয়ে থাকে। আর এই জিনিসগুলো স্ক্রিন শেখাতে পারে না।

কীভাবে বদল আনবেন?
শিশুর ভাষার বিকাশ বা শব্দ উচ্চারণ ঠিক রাখতে কিছু সহজ অভ্যেস-
- দু-বছরের নিচে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা
- দু-বছরের পর দিনে ১ ঘণ্টার বেশি নয়, তাও খাওয়ার সময়, খেলাধুলার সময় ও ঘুমের আগে মোবাইল বা ডিজিটাল ডিভাইস একদমই নয়
- নিয়মিত গল্প বলা, গান শোনানো, কথা বলা
- শিশুকে প্রশ্ন করা ও তার উত্তর শোনার অভ্যেস তৈরি করা
- মা-বাবারও স্ক্রিনটাইম কমানো
কখন দেরি না করে ব্যবস্থা নেবেন?
যদি মনে হয় সন্তানের কথা বলায় সমস্যা হচ্ছে, তাহলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে স্পিচ থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া উচিত। যত তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, ততই ভালো ফল পাওয়া যায়।
অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম এখন আর শুধু অভ্যেস নয়, এটি আপনার সন্তানের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সচেতনতা, ওদেরকে সময় দেওয়া আর সঠিক অভ্যেস গড়ে তুললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটি শিশুর সবচেয়ে বড় শেখার মাধ্যম কোনও স্ক্রিন নয়, তার নিজের পরিবার, তার চারপাশের মানুষজন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
মিরিকে ধস, জলমগ্ন আলিপুরদুয়ার, তোর্সায় বেড়েছে জল, বিপর্যস্ত উত্তরবঙ্গে দুর্ভোগে পর্যটকরা!
-
শিল্পের খরা কাটছে জঙ্গলমহলে! ইকো টুরিজমে ভরসা করে কর্মসংস্থানের ডাক ঝাড়গ্রামে
-
বাংলায় লিচু-বিপ্লব! অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে আকাশপথে ভিনরাজ্যে মরশুমি ফল
-
বয়সকে তুড়িতে উড়িয়ে দুর্গম ‘মুকার বে’ শৃঙ্গ জয় ষাটোর্ধ্ব বসন্তর
-
গাড়িতে বোমা, প্রাক্তন প্রেমিকাকে অপহরণ করে ‘সহমরণে’র ফাঁদ, তারপর…