FIFA World Cup 2026

দ্য ব্রাজিলিয়ান জব… জিতেও নিস্পৃহ আন্সেলোত্তি, যোগা বোনিতোয় রিয়াল ‘ডিএনএ’ মেশাচ্ছেন কার্লো

যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে দলের সেনাপতির এর থেকে বড় দার্শনিক কথা আর কী হতে পারে? ‘‘তোমরা লড়াই করো, পদ্ধতি আমি ঠিক করে দেব। কারণ, যা হচ্ছে, আমাদের নিয়ন্ত্রণে থেকেই হচ্ছে।’’ এই না হলে ডন কার্লো!

দুলাল দে
দুলাল দে

শেষ আপডেট: জুলাই ১, ২০২৬, ২১:১১

options
link
দ্য ব্রাজিলিয়ান জব… জিতেও নিস্পৃহ আন্সেলোত্তি, যোগা বোনিতোয় রিয়াল ‘ডিএনএ’ মেশাচ্ছেন কার্লো
ম্যাচের পর জাপান ফুটবলারকে সমবেদনা আন্সেলোত্তির। ছবি সংগৃহীত।

ডন কার্লো। বিশ্বের সংবাদমাধ্যম এই নামেই অভিহিত করেন পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই কোচকে। ফুটবলার হিসেবে এসি মিলানের হয়েও দু’বার জিতেছিলেন। তখন অবশ্য নাম ছিল, ইউরোপিয়ান কাপ। ইতিহাসের পাতায় তিনিই একমাত্র ব্যক্তি– যাঁর আগে পরে এমন কেউ নেই যিনি, ফুটবলার এবং কোচ হিসেবে সাতবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। এহেন ব্যক্তি যখন জাপানের বিরুদ্ধে হৃদস্পন্দন থমকে যাওযা উত্তেজক মুহূর্তে ম্যাচটা বার করে ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রভ ভাবে চুইংগাম চিবোতে পারেন, তখন তিনিই তো হয়ে যান, প্রশান্তির এক বড় আইকন।

Advertisement

এহেন ব্যক্তি যখন জাপানের বিরুদ্ধে হৃদস্পন্দন থমকে যাওযা উত্তেজক মুহূর্তে ম্যাচটা বার করে ডাগ আউটে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রভ ভাবে চুইংগাম চিবোতে পারেন, তখন তিনিই তো হয়ে যান, প্রশান্তির এক বড় আইকন। বিশ্বজুড়ে ব্রাজিল ফ্যানরা যখন পাগলপারা, আন্সেলোভি তখন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তীব্র চাপেও স্থির। পরিস্থিতি করায়ত্ত। নিজেদের ডাগ আউটে ব্রাজিল আর কবে দেখেছে এহেন আবেগহীন, খুনে, রক্তশীতল মানসিকতার ট্যাকটিক্স সমৃদ্ধ কোচকে? ফলে জাপান ম্যাচের পর ব্রাজিল শিবিরে এখন তিনিই ডন। সোজা কথায় বললে রিয়াল মাদ্রিদের ‘ডিএনএ’ এখন তিনি ব্রাজিল টিমটার মধ্যে আমদানি করেছেন। রিয়ালে কোচ থাকার সময় এমন বহু ম‌্যাচ কার্লো একেবারে শেষ মুহূর্তে বের করেছেন। যার মধ্যে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির বিরুদ্ধে জেতা ম্যাচটিও আছে। চাপের পরিস্থিতিতে কখনও তাঁকে প‌্যানিক করতে দেখা যায়নি। জাপানের বিরুদ্ধেও ব্রাজিল ঠিক সেভাবেই জিতল।

Advertisement
FIFA World Cup 2026: Teammates surround Gabriel Martinelli after his last-minute goal against Japan
জাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোলের পর গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলিকে ঘিরে ধরেন তাঁর সতীর্থরা। ছবি সংগৃহীত।

চোট সারিয়ে নেইমারকে দলে ফেরানো। বয়স্ক দানিলো, কাসেমিরোদের দলে রাখা। তাঁর দিকে ধেয়ে আসতে পারে এ রকম এক-একটা তির ব্রাজিলিয়ানদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) শুরুর আগেই। তারপর মরক্কোর বিরুদ্ধে সেই জঘন্য পারফরম্যান্স। ইটালিয়ান ফুটবল মস্তিষ্ককে সমালোচনায় ফালা-ফালা করে ফেলার জন্য যথেষ্ট উপাদান ছিল। আর তা শুরু হয়েও গিয়েছিল। আসলে মননে, সংস্কৃতিতে, খেলার স্টাইলে আবহমান কাল ধরে বয়ে চলা ব্রাজিলের কোনও কিছুর সঙ্গে যে মেলে না ডন কার্লোর খুনে মানসিকতার। যেখানে আবেগ কম। বাস্তবের রুক্ষতা বেশি।

Advertisement

জানেন কি, গতকাল জাপান ম্যাচের পর বিরতির সময় কাসেমিরোর সঙ্গে একটা কথা পর্যন্ত বলেননি দলের মাস্টারমাইন্ড। জাপানি সানো বল নিয়ে যখন ব্রাজিল গোলের দিকে ছুটছিলেন, তখন সেটা তো কাসেমিরোর অঞ্চল। কোথায় তিনি? ট্যাকল ফ্রম বিহাইন্ড হলে কার্ড দেখতে পারতেন। এই ভাবনা থেকে সানোকে আটকানোর জন্য শরীরটাকে পিছন থেকে ছুড়ে দেননি। এই মানসিকতা একদমই পছন্দ হয়নি ডন কার্লোর। হাফটাইমে লকার রুমে খুনে, হিমশীতল দৃষ্টি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ব্যাপারটা তিনি ভালোভাবে নেননি। ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ধরেই নিয়েছিলেন, তাঁকে পরিবর্তন করে দেবেন। কিন্তু কোথায়? সেই কাসেমিরোকে রাখলেন, যতক্ষণ না শেষের দিকে চোট পেলেন তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে এসে এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন আন্সেলোত্তি। ‘‘যে পজিশনে কাসেমিরো খেলছে, সেই পজিশনে খেলার মতো এই মুহূর্তে ব্রাজিলে আর কেউ নেই। তার থেকেও বড় কথা, ক্লাব ফুটবলেও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি, কাসেমিরো নিজের পজিশন থেকে ওভারল্যাপে গিয়ে এই ধরনের গোল করে। ফলে জাপান ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধেও কাসেমিরোর উপর ভরসা করা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না। আর গোলটা করে সেটা ও প্রমাণও করে দিয়েছে।’’

FIFA World Cup 2026: Neymar celebrates with Casemiro after the equaliser
গোলশোধের পর কাসেমিরোকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত নেইমার। ছবি সংগৃহীত।

কিন্তু এভাবেও ফিরে আসা যায়? বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিলের তেরসোপলিসে জাতীয় শিবির চলাকালীন ক্লাসে একদিন এই প্রসঙ্গটাই তুলেছিলেন আন্সেলোত্তি। ম্যাচে ভুল হতে পারে। আর সেটা হবেই। তখন কী করা ভেবে? তাহলে কি ম্যাচটা সেখানেই ছেড়ে দিতে হবে? যেরকমটা আমেরিকা বিশ্বকাপে মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে হয়েছে। যেরকমটা জাপানের বিরুদ্ধে সানোর গোলের সময় ডিফেন্সিভ ব্লকারের জায়গায় অনেকটা স্পেস দেওয়ার জন্য হয়েছে। তাহলে তো হতোদ্যম হয়ে জাপান ম্যাচটাও সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল ভিনিসিয়াসদের। তারপরেও এত উদ্যম এল কোথার থেকে? এত ঘন ঘন আক্রমণ?

বিশ্বকাপ শুরুর আগে জাতীয় শিবিরের সেই ক্লাসের কথা শোনাচ্ছিলেন ডন কার্লো। ‘‘সেদিন আলোচনায় ফুটবলারদের বলেছিলাম, ভুল করাটা সব সময় আমাদের হাতে থাকে না। খেলার মধ্যে হয়ে যায়। কিন্তু ভুল করার পর কী ভাবে নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য লড়াই করব, সেই পরিস্থিতিটা পুরোটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আর পিছনের ভুলের দিকে তাকানো যাবে না। জাপানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধে আমার ছেলেরা ঠিক সেটাই করেছে। আমি জানি, প্রথমার্ধে আমরা যখন গোল খেয়ে গিয়েছিলাম, অনেকেই আমাদের ফিরে আসার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভাবতেই পারেননি, আমরা এখান থেকে গোল করে ম্যাচে ফিরতে পারি।’’ যা তিনি করেছেন অসংখ‌্য বার। রিয়াল মাদ্রিদ কোচ থাকাকালীন।

কিন্তু তা বলে পিছিয়ে থাকার সময়েও এতটা নিষ্প্রভ, আবেগহীন থাকা সম্ভব? এবার আন্সেলোত্তি তাঁর ট্রেডমার্ক ভ্রু নাচিয়ে যা বললেন, এরপর তো আর কোনও প্রশ্নই থাকে না। ‘‘পিছিয়ে থাকলেও খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। কারণ, আমরা ততক্ষণে নিজেদের পরিকল্পনামতো খেলতে শুরু করে দিয়েছি। বুঝেছিলাম, ডাউন দ্য মিডল আক্রমণ করলে আর হবে না। পরিকল্পনা করে নিই, এবার মাঝখান ছেড়ে উইং থেকে আক্রমণ শানাতে হবে। তাতে গোলের মুখ খুলবেই আর সেটাই হয়েছে।’’

যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে দলের সেনাপতির এর থেকে বড় দার্শনিক কথা আর কী হতে পারে? ‘‘তোমরা লড়াই করো, পদ্ধতি আমি ঠিক করে দেব। কারণ, যা হচ্ছে, আমাদের নিয়ন্ত্রণে থেকেই হচ্ছে।’’ এই না হলে ডন কার্লো!

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.