ইরান বনাম আমেরিকা। গোটা বিশ্বের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এই দুই দেশের যুদ্ধ। হাজারো চেষ্টা, বৈঠক, আলোচনার পরেও শান্তি ফেরাতে সহমত হতে পারছে না দুই দেশ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুনের আঁচ পড়েছে ফুটবলেও। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর অবশেষে ইরান চলতি বিশ্বকাপে নামতে পেরেছিল। কিন্তু ফুটবলাররা রীতিমতো অমানুষিক অত্যাচারের মধ্যে খেলেছেন। গ্রুপ পর্বেই অবশ্য এবারের মতো শেষ ইরানের অভিযান। মেহদি তারেমিরা বিদায় নেওয়ার পর চর্চা চলছে তাঁদের দেশের শান্তিপ্রিয় আচরণ নিয়ে।
আরও পড়ুন:
চলতি বিশ্বকাপে তিনটে ম্যাচই ড্র করেছে ইরান। তারপর ফিফার উপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দলের অধিনায়ক তারেমি। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে তিনি বলেন, “খুবই হতাশাজনক বিশ্বকাপ। ফিফা সব সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু শুরু থেকেই আমাদের সমস্যার কোনও সমাধান করা হয়নি। গ্রুপ পর্বই শেষ হয়ে গেল, এখনও কিছুই বদলাল না।” ফুটবলমহলের সাফ কথা, আমেরিকার সঙ্গে শত্রুতার ফল ভুগতে হয়েছে গোটা ইরান স্কোয়াডকে। নীরব দর্শকের মতো মার্কিন অত্যাচার মেনে নিয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের যোগ্যতাবলে খেলতে এসেছিল ইরান। মার্কিন মুলুকের বিরূপ আচরণ কি আদৌ প্রাপ্য় ছিল তারেমিদের? এই প্রশ্ন তুলে ফুটবলপ্রেমীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup)।
আরও পড়ুন:
সেবছর ফ্রান্সে আয়োজিত বিশ্বকাপে একই গ্রুপে পড়েছিল যুযুধান দুই দেশ-ইরান এবং আমেরিকা। মেগা টুর্নামেন্টে নামার আগে ইরান ব্রিগেডকে একেবারে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন দেশের তৎকালীন সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। সাফ জানিয়েছিলেন, মাঠে নেমে মার্কিন ফুটবলারদের সঙ্গে হাত মেলানো চলবে না। ‘শত্রু’দের সঙ্গে করমর্দন না করার বিষয়টি বর্তমানে ভারতীয় ক্রিকেটে বেশ প্রচলিত। ১৯৯৮ সালে ইরানের ফুটবলাররা অবশ্য করমর্দন ইস্যুতে একেবারে অন্যরকমভাবে ভেবেছিলেন।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, দুই দল মাঠে নামবে। তারপর বি দলের সদস্যরা এগিয়ে যাবেন এ দলের দিকে। হাত মেলাবেন ফুটবলাররা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে বি টিম ছিল ইরান। অর্থাৎ ইরানি ফুটবলারদেরই এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করতে হবে। কিন্তু ইরানের মাথায় তখন ঝুলছে খামেনেইয়ের খাঁড়া। সুপ্রিম লিডারের নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তি অবধারিত। এই কঠিন সময়ে দেশ-ধর্ম-জাতির ভেদাভেদ ভুলে এগিয়ে গেলেন মার্কিন ফুটবলাররা। ফিফার নিয়ম খানিকটা বদলে নিয়ে এ টিম (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এগিয়ে গেল বি’টিমের দিকে। ইরানও সেই করমর্দন প্রত্যাখ্যান করল না। খামেনেইয়ের হুঁশিয়ারি ভুলে হাতে হাত মেলালেন ইরানের ১১ প্রতিনিধি। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে থাক দুই দেশের প্রতিনিধিদের করমর্দন জায়গা করে নিল বিশ্বকাপের সৌহার্দ্যের ইতিহাসে। বলা যেতে পারে, ফিফার নিয়ম ভাঙার ‘অপরাধ’ থেকে সেদিন ইরানকে রক্ষা করেছিল আমেরিকা।
এখানই শেষ নয়। মার্কিন ফুটবলারদের সঙ্গে হাত মেলানোর পর তাঁদের বিশেষ উপহার দেন ইরানের ফুটবলাররা। ইরানে সাদা গোলাপকে শান্তির প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। সেই সাদা গোলাপের তোড়া মার্কিন ফুটবলারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারপরেই ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে খেলোয়াড়ি মানসিকতার সম্ভবত সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দুই দলের আলাদা টিম ছবি নয়, একসঙ্গে মিলে ক্যামেরার লেন্সে ধরা দিলেন ইরান এবং আমেরিকার ফুটবলাররা। হাতে সাদা ফুল, মুখে চওড়া হাসি-ছবিতে ইরান-আমেরিকার পার্থক্য বোঝাই দায়। যেন একই টিমে খেলতে নেমেছে একদল বন্ধু।
মাঠে নেমে অবশ্য হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল দুই দলের মধ্যে। প্রথমার্ধে এক গোলে এগিয়ে যায় ইরান। ৮৪ মিনিটে ব্যবধান আরও বাড়ে। ম্যাচের শেষদিকে ৮৭ মিনিটে এক গোল শোধ দেয় আমেরিকা। ম্যাচের ফল ইরানের পক্ষে ২-১। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরেও ফের সৌহার্দ্য ফেরে দুই দলের মধ্যে। শেষ বাঁশি বাজার পর মার্কিন ডিফেন্ডার জেফ আগুসের অমর উক্তি, “রাজনীতিবিদরা ২০ বছরে যা করতে পারেননি আমরা সেটা মাত্র ৯০ মিনিটে করে ফেললাম।” ফুটবলারদের এই পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনকে স্বীকৃতি দিয়ে দুই দলের হাতে ফেয়ার প্লে পুরস্কার তুলে দেয় ফিফা।
তারপর কেটে গিয়েছে ২৮ বছর। খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছে মার্কিন হামলায়। ইরানের সর্বোচ্চ শাসক হয়েছেন তাঁর পুত্র মোজতবা। মার্কিন মুলুকে প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফুটবল বিশ্বকাপের সেই সৌহার্দ্যের ছবিও আজ অতীত। কেন? ইরানকে কি সসম্মানে খেলার অনুমতি দেওয়া যেত না? অন্য দলের মতোই একসরিতে বসানো যেত না তারেমিদের? একরাশ প্রশ্ন রেখেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ইরান।
“We did more in 90 minutes than the politicians did in 20 years.”
🇺🇸🇮🇷 The USA vs. Iran match at the 1998 World Cup carried one of the heaviest political weights in football history.
Before kickoff, a major protocol crisis emerged: FIFA rules required Iranian players to walk… pic.twitter.com/1eEMJReLz9
— MENA Visuals (@menavisualss) June 11, 2026
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
তিনের পাল্টা চার! বিধানসভায় বিল উত্তেজনার মাঝে ‘খেলা ভাঙার খেলা’য় মাতল ‘দুই’ তৃণমূল
-
দাদা সৌরভের টিপসই ব্রহ্মাস্ত্র! ‘দাদাগিরি’র সেটে পা রেখেই কী জানালেন দেব?
-
রাস্তা আটকে একুশের মঞ্চের মাপজোক, দোলা-কুণালদের বিরুদ্ধে হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর
-
জামিনে বাড়ি ফিরতেই বিবাদ! খাস কলকাতায় ‘খুনে’র অভিযোগে গ্রেপ্তার দম্পতি
-
বিশ্বকাপে হেরেও অলিম্পিকের টিকিট স্মৃতিদের, এখনও অনিশ্চিত শ্রেয়সরা, কী মাপকাঠি জানাল আইসিসি?