FIFA World Cup

তাঁর জন্য যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত হয়েছিল! কীভাবে আফ্রিকার ‘আপনজন’ হয়ে ওঠেন পেলে

তাঁর নামের পাশে তিন-তিনটে বিশ্বকাপ। অজস্র ট্রফি। অসংখ্য স্মৃতি। তিনি আফ্রিকার মাটিতে পা রাখলেই শুরু হত উৎসব।

প্রসেনজিৎ দত্ত
প্রসেনজিৎ দত্ত

শেষ আপডেট: জুলাই ১০, ২০২৬, ১৫:০৪

options
link
তাঁর জন্য যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত হয়েছিল! কীভাবে আফ্রিকার ‘আপনজন’ হয়ে ওঠেন পেলে
আফ্রিকার 'আপনজন' পেলে।

ইলেকট্রিক বাল্বের আবিষ্কর্তা টমাস এডিসন। তাঁর নামানুসারেই ডোনডিনহো ছেলের নাম রাখলেন। তবে সূক্ষ্ম অদলবদল করে ‘এডিসন’ বদলে করে দিলেন ‘এডসন’। এডসন আরান্তেস দি নাসিমেন্তো। ডাকনাম দেওয়া হয় ‘ডিকো’। বলা হচ্ছে ‘ক্ষণজন্মা’ পেলের (Pele) কথা। যাঁর নামের পাশে তিন-তিনটে বিশ্বকাপ (FIFA World Cup)। অজস্র ট্রফি। অসংখ্য স্মৃতি। তিনি আফ্রিকার মাটিতে পা রাখলেই শুরু হত উৎসব। বিমানবন্দরে মানুষের ঢল। রাজপথজুড়ে অপেক্ষা। হাতে পতাকা… এসেছেন পেলে, ফুটবলের সম্রাট।

Advertisement

পঞ্চশের দশকের শেষভাগ, ষাটের দশকের শুরু। তখন আফ্রিকার নতুন করে জেগে ওঠার সময়। একের পর এক দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন হচ্ছে। নতুন পতাকা। নতুন জাতীয় সঙ্গীত। নতুন স্বপ্ন। স্বপ্নের সঙ্গী হয়েই বারবার আফ্রিকার মাটিতে পা রাখতেন ‘কালো হিরে’। সদ্য স্বাধীন দেশগুলো পেলে ও তাঁর ক্লাব সান্তোসকে আমন্ত্রণ জানাত প্রীতি ম্যাচ খেলতে। এমনকী ব্রাজিল দলের সঙ্গেও তিনি বহুবার আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সফর করতেন।

Advertisement
Pele won three FIFA World Cups with Brazil
পেলে। ছবি সংগৃহীত।

আত্মজীবনীতে পেলে লিখেছিলেন, আফ্রিকায় বারবার যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। একই সঙ্গে মানুষও তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করে। পেলের আফ্রিকা সফর নিয়ে এত গল্প প্রচলিত আছে, তার কোনটা সত্য আর কোনটা কিংবদন্তি, তা আলাদা করা অনেক সময় কঠিন। ১৯৬৫ সালে তাঁর আলজেরিয়া সফর যেন সিনেমার গল্প। রাজধানীর রাস্তায় তখন যুদ্ধের ট্যাঙ্ক টহল দিচ্ছে। প্রখ্যাত পরিচালক জিলো পন্তেকোরভো তৈরি করছেন ‘দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স’। সেই সময়ই পেলের জন্য দু’টি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ বেন বেলা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচ আর হল না। দু’দিন আগেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুয়ারি বুমেদিয়েন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন। ক্ষমতা হারালেন প্রেসিডেন্ট। কথিত আছে, পেলের আগমন নিয়ে সবাই এত ব্যস্ত ছিল, তা কাজে লাগিয়ে এই অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল। যদিও এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

Advertisement

মরক্কো সফর তুলনামূলক শান্ত হলেও কম স্মরণীয় নয়। ১৯৭০ বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম দেশ হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিল মরক্কো। এই ঘটনা আনন্দ দিয়েছিল পেলেকে। শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন। মরক্কোর কিংবদন্তি ফুটবলার লারবি বেন বারেক ছিলেন পেলের আগের প্রজন্মের তারকা। তাঁকে নিয়ে পেলে বলেছিলেন, “আমি যদি ফুটবলের রাজা হই, তবে বেন বারেক ফুটবলের ঈশ্বর।” এ কথা তিনি সত্যিই বলেছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু গল্পটি বেঁচে আছে। 

FIFA World Cup: Opposing defenders knew that stopping Pele was extremely difficult
তাঁকে আটকানো যে দুঃসাধ্য, বুঝতেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা। ছবি সংগৃহীত।

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্প শোনা যায় নাইজেরিয়াকে নিয়ে। ১৯৬৯ সাল। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। সেই সময় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে গেলেন পেলে। কথিত আছে, পেলের উপস্থিতির কারণে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে তিনি নিজেই হেসে বলেছিলেন, পুরো গল্পটা সত্য কি না তিনি জানেন না। তবে এটুকু স্বীকার করেছিলেন, তাঁর সফর ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ছিল।

১৯৭৬ সালে অবসরের পরও আফ্রিকা তাঁকে ছাড়েনি। তিনিও আফ্রিকাকে ভোলেননি। কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, সেনেগাল, মিশর, মোজাম্বিক– এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরেছেন। তরুণদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন। প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। একটি সফট ড্রিংকস কোম্পানির আমন্ত্রণে কেনিয়া ও উগান্ডা সফর করেন পেলে। সেখানে তরুণ ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দেন, উৎসাহিত করেন। কেনিয়ায় তাঁর ম্যাচ দেখতে টিকিট লাগত না। প্রাপ্তবয়স্কদের ছ’টি আর শিশুদের তিনটি কোমল পানীয়ের বোতলের ঢাকনা জমা দিলেই মাঠে প্রবেশের সুযোগ মিলত। রাজাকে এক ঝলক দেখার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট।

Pele was part of Brazil’s 1970 FIFA World Cup-winning team
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য পেলে। ছবি সংগৃহীত।

মালির কিংবদন্তি ফুটবলার সালিফ কেইতা বলেছিলেন, “আমরা আফ্রিকানরা তখন বিশ্বমঞ্চে পেলে, মহম্মদ আলি ও ইউসেবিওকেই আমাদের নায়ক হিসাবে দেখতাম।” ঘানার মিডফিল্ডার আবেদি আয়েউ নিজের নামের সঙ্গে গর্বে ‘পেলে’ জুড়ে দিয়েছেন। বিশ্ব তাঁকে চেনে আবেদি পেলে নামে। পেলের বিশ্বাস ছিল, একদিন আফ্রিকার কোনও দেশ বিশ্বকাপ জিতবেই। সেই স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। গত বিশ্বকাপে কাছাকাছি পৌঁছেছিল মরক্কো। সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সের কাছে হেরে যায়। মৃত্যুর ক’দিন আগেও মরক্কোর ঐতিহাসিক সাফল্যের পর তিনি লিখেছিলেন, “আফ্রিকাকে এভাবে আলো ছড়াতে দেখে দারুণ লাগছে।” এবারের বিশ্বকাপেও মরক্কো ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে। অনেকেই বলছেন, পেলে থাকলে খুশিই হতেন। হয়তো এ কারণেই পেলের গল্প যতটা ব্রাজিলের, ততটাই আফ্রিকারও। গোল করে যেমন মানুষের হৃদয় জিতেছিলেন, তেমনি সীমান্ত, ভাষা, ইতিহাসের দেওয়াল পেরিয়ে একটি মহাদেশের ‘আপনজন’ হয়ে উঠেছিলেন পেলে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.