Cabo Verde

কেপ ভার্দে, তুমি ধুঁকতে থাকা মধ্যবিত্তদের ‘বাজিগর’

কেপ ভার্দের ফুটবলরা তাঁদের অনুপ্রেরণা, হেরে যাওয়াটা যাঁদের প্রতিদিনের জীবনের অঙ্গ, তবু যাঁরা মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন প্রতিদিন।

Advertisement
শুভজিৎ মণ্ডল
শুভজিৎ মণ্ডল

শেষ আপডেট: জুলাই ৪, ২০২৬, ১৭:০৮

options
link
কেপ ভার্দে, তুমি ধুঁকতে থাকা মধ্যবিত্তদের ‘বাজিগর’
ফাইল ছবি।

কেপ ভার্দে। লাখ পাঁচেক মানুষের দেশ। মাস কয়েক আগে পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সিংহভাগ মানুষ হয়তো দেশটার নামও শোনেনি। না শোনাটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের তুলে ধরার মতো অমূল্যরতন কিছুই নেই কেপ ভার্দের হাতে। অর্থনৈতিকভাবে এখনও পুরোপুরি স্বাবলম্বী নয়, জিডিপি পার ক্যাপিটার নিরিখে গোটা বিশ্বে ১১৪ নম্বরে, হ্যাপিনেস ইনডেক্সে ১৩৫ নম্বরে, ক্ষুধার সূচকে ৪৮ নম্বরে। সবই ‘মধ্যবিত্ত’। না খুব ভালো-না খুব খারাপ। আসলে কেপ ভার্দের আস্ত দেশটাই যেন আমার-আপনার পরিবারের মতো মধ্যবিত্ত। ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত পুঁচকে দেশে এমন কিছু পাওয়া যায় না, যা বিশ্ববাসীকে অবাক করবে। দাঁড়ান, দাঁড়ান একটু ভুল বলা হল, কেপ ভার্দে দেশটায় মাস কয়েক আগে পর্যন্ত এমন কিছু ছিল না যা বিশ্ববাসীকে অবাক করতে পারে। কিন্তু এখন রয়েছে। কেপ ভার্দের কাছে আস্তে একটা জোসিমার জসে এভোরা দিয়াজ রয়েছেন যাঁকে গোটা বিশ্ব আজ ভোজিনহা নামে চিনে গিয়েছে, আছেন সিডনি লোপেজ কাবরাল, ডেরয় ডুয়ার্টেরা। যাঁদের হার না মানা মানসিকতাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে ফুটবলবিশ্ব। অখ্যাত, মধ্যবিত্ত দেশ কেপ ভার্দে আজ গুগল সার্চে একেবারে প্রথম সারিতে। গোটা বিশ্ব জানতে চাইছে, বিশ্বকাপে যারা আলোড়ন ফেলে দিলেন, যারা ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে স্পেন, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনার মতো জায়ান্টদের বিরুদ্ধে হার মানল না, তারা আসলে কারা?

Advertisement

ভোজিনহাদের দেশে সমস্যা অনেক। জনসংখ্যা কম। ট্যালেন্ট পুল-বড্ড ছোট। দেশের অন্দরে ফুটবলের কাঠামো মোটেই শক্তিশালী নয়। দেশের সেরা লিগ কিছুদিন আগে পর্যন্ত পুরোপুরি পেশাদার ছিল না। এখন মূল লিগ পেশাদার হলেও দেশে পেশাদার ফুটবলের সংখ্যাটা নগণ্য। বড় স্টেডিয়াম নেই। দেশে রোজগারের অভাব, যে কারণে বাসিন্দার সমপরিমাণ মানুষ থাকেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে। অধিকাংশ ফুটবলারও প্রবাসী। দেশের ফুটবলের এমনই করুণ দশা, যে ভোজিনহার নাম ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে- এই মুহূর্তে তাঁর হাতে কোনও ক্লাব নেই। তিনি জানেন না বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফিরে তাঁর পেশাদার জীবনে কী হবে! আসলে সার্বিকভাবে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে কেপ ভার্দে সত্যিই ছিল অতি ক্ষুদ্র, অজ্ঞাতকুলশীল, যাদের কেউ ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনি কোনওকালে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
FIFA World Cup 2026: Lionel Messi’s Argentina and Cape Verde match result
গোলের পর কেপ ভার্দের কাব্রাল

এসব সত্ত্বেও কেপ ভার্দে হার মানেনি। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গিয়েছে। আসলে জীবনে সবসময় জয়টাই শেষ কথা নয়। হয়তো অনেক সময় বুঝিয়ে দিতে হয় আমরা আছি, লড়াইয়ের ময়দান ছাড়িনি। ছাড়ব না। আসলে কেপ ভার্দের প্রতিটি ফুটবলার, ভোজিনহা, কাব্রালরা সেই মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি, যাঁরা প্রতিদিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেও হার মানতে জানেন না। ভোজিনহা সেই মধ্যবয়সি ভদ্রলোকের মতো, যিনি সংসারের সব অভাব-অভিযোগ পূরণ করতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন। রোজ অফিসে বসের গঞ্জনা, ইএমআইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়েও ছুটে চলেছেন… কিন্তু হার মানতে শেখেননি। কেপ ভার্দের প্রতিটি ফুটবলার সেই তরুণীর অনুপ্রেরণা হতে পারেন, যিনি রোজ ভিড় ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে অফিস যান, যারা তিন বেলা অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিনের শেষ পরিতৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কেপ ভার্দের ফুটবলররা সেই বেকার যুবকের অনুপ্রেরণা, যিনি বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরির চেষ্টা করে চলেছেন, কিন্তু একটুর জন্য হচ্ছে না। হেরে যাওয়াটা যাঁদের প্রতিদিনের জীবনের অঙ্গ, তবু যাঁরা মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন।

Advertisement

আজ হয়তো দিনের শেষে আর্জেন্টিনা জয়ী হিসাবে মাঠ ছেড়েছে-কিন্তু মাঠ ছাড়ার সময় লিওনেল মেসির চোখেমুখে চেনা উচ্ছ্বাস চোখে পড়েনি। দিনের শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একপ্রকার নীরবে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। আসলে ঈশ্বরের বরপুত্রও জানেন, আজ ভাগ্য বড় সহায় ছিল তাঁদের। হয়তো স্বয়ং লিওনেল মেসিও কেপ ভার্দের আজকের হার মেনে নিতে পারেননি। হয়তো তাঁর নিজেরও মন খারাপ হয়েছে। যেমনটা হয়েছে গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের।

হ্যাঁ, বুধবার ম্যাচের শেষে স্কোরবোর্ড হয়তো বলছে আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। কিন্তু নেভিল কার্ডাস তো সেই কবেই বলে গিয়েছেন, ‘স্কোরবোর্ড একটা গাধা’। সেই প্রবাদ যদি ক্রিকেটের ক্ষেত্রে সত্যি হয়, তাহলে ফুটবলের ক্ষেত্রেই বা হবে না কেন? অন্তত বুধবারের ম্যাচের ক্ষেত্রে এই প্রবাদ সত্যি, আলবাত সত্যি। আজ হয়তো দিনের শেষে আর্জেন্টিনা জয়ী হিসাবে মাঠ ছেড়েছে, কিন্তু মাঠ ছাড়ার সময় লিওনেল মেসির চোখেমুখে চেনা উচ্ছ্বাস চোখে পড়েনি। দিনের শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একপ্রকার নীরবে মাঠ ছেড়েছেন তিনি। আসলে ঈশ্বরের বরপুত্রও জানেন, আজ ভাগ্য বড় সহায় ছিল তাঁদের। হয়তো স্বয়ং মেসিও কেপ ভার্দের আজকের হার মেনে নিতে পারেননি। হয়তো তাঁর নিজেরও মন খারাপ হয়েছে। যেমনটা হয়েছে গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের। অতি বড় আর্জেন্টিনাপ্রেমীরাও আজ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়েছেন, নিজের দলের জয় হয়তো আনন্দ দিয়েছে, সঙ্গে একরাশ খারাপ লাগা উপহার দিয়েছে ভোজিনহাদের বিদায়। আজ রোজারিওর অখ্যাত বসতির সেই শিশুটিও ভোজিনহাদের কুর্নিশ জানাচ্ছে যে হয়তো মেসিকে ঈশ্বররূপে পুজো করে, রিষড়া বা শ্যামনগরে বসে যে মেসিভক্তরা রোজ লিও-র জন্য গলা ফাটান, তাঁরাও হয়তো আজ ভোজিনহার প্রতিটি সেভে স্বস্তি পেয়েছেন।

FIFA World Cup 2026: Cape Verde's Vozinha said they should win and Lionel Messi also opens up
মেসি ও ভোজিনহা

আসলে হেরে গিয়েও ভোজিনহারা জিতে গিয়েছেন। আজ গোটা বিশ্ব তাদের কুর্নিশ জানাচ্ছে। আজ থেকে ২০, ৩০, ৫০ বছর বাদে যখন কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক ‘বিশ্বকাপের গপ্প’ লিখতে বসবেন, নিজের স্মৃতিকথা লিখতে বসবেন, তখন তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠবে মায়ামির এই মায়াবী রাত। স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে কেপ ভার্দের যে শিশুটি আজ দলের হারে চোখের জল ধরে রাখত পারল না, আজকের রাতের গল্প তাঁর মুখ দিয়ে আগামী তিন প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে। কেপ ভার্দের ক্রীড়া ইতিহাসে ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্প স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছে। বছরের পর বছর ভোজিনহাদের গল্প শুনিয়ে আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবেন অভিভাবকরা। এগুলোও কী কম প্রাপ্তি! যদি সত্যিই হারকর জিতনেওয়ালাদের বাজিগর বলা হয়, তাহলে কেপ ভার্দে প্রতিভাহীন মধ্যবিত্তদের বাজিগর।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.