ভ্রমণ অনেকের কাছেই অবসর কাটানোর উপায়! কিন্তু কিছু মানুষের কাছে ভ্রমণ নেশা, আবার সেই নেশাই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। সাঁইথিয়া পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা গোপাল মাহারার গল্প ঠিক তেমনই। পেশায় তিনি একজন কাঠমিস্ত্রি। সারাদিন কাঠের গন্ধে, হাতুড়ি-বাটালির শব্দে কেটে যায় তাঁর কর্মজীবন। কিন্তু কাজের ফাঁকে, সুযোগ পেলেই তাঁর মন ছুটে যায় অচেনা পথের টানে। সেই টানেই তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী একটি সাধারণ সাইকেল। তবে গোপালের কাছে সেটি শুধুই বাহন নয়! নিজের সাইকেলের নাম রেখেছেন ‘পারো’। যেন পরিবারেরই একজন সদস্য। আর সেই ‘পারো’কে সঙ্গী করেই একের পর এক দীর্ঘ সফরে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
আরও পড়ুন:
গত বৃহস্পতিবার সাঁইথিয়া থেকে তিনি রওনা দিয়েছেন জগন্নাথধাম পুরীর উদ্দেশ্যে। সামনে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ। আগামী ১৬ জুলাই রথযাত্রা। তার আগেই পুরীতে পৌঁছে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সাক্ষী হওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
এর আগেও এই সাইকেলেই তিনি ঘুরে এসেছেন বেনারস, অযোধ্যা, হরিদ্বার, ঋষিকেশ থেকে কেদারনাথের মতো বহু তীর্থ ও দর্শনীয় স্থান। প্রতিটি সফরই ছিল নতুন অভিজ্ঞতার ঝুলি। কোথাও পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা, কোথাও গঙ্গার ঘাট, কোথাও আবার অচেনা মানুষের আন্তরিকতা— সব মিলিয়েই তাঁর ভ্রমণের গল্প সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে এত বড় বড় সফরের পিছনে আর একটি শক্তি রয়েছে, যার কথা গোপাল অকপটেই স্বীকার করেন। তাঁর স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের অভিভাবকেরা কখনও তাঁর এই ‘বেড়ানোর পাগলামো’কে বাধা দেননি। বরং প্রতিবারই তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন। সেই নিঃশর্ত সমর্থনই গোপালের কাছে সবচেয়ে বড় পাথেয়।
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তাই খুব বেশি প্রস্তুতিরও প্রয়োজন হয় না। সাইকেলের ক্যারিয়ারে একটি ছোট্ট তাঁবু বেঁধে নিলেই তৈরি তিনি। দিনের পর দিন পথ চলতে চলতে যখন সন্ধ্যা নামে, তখন কোনও নিরাপদ খোলা জায়গা খুঁজে তাঁবু খাটিয়ে সেখানেই রাত কাটিয়ে দেন। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই আবার গুছিয়ে নেন সবকিছু। তারপর নিজের প্রিয় ‘পারো’র সিটে উঠে প্যাডেলে চাপ দিয়ে আবার শুরু হয় নতুন দিনের পথচলা।
গত বৃহস্পতিবার সাঁইথিয়া থেকে তিনি রওনা দিয়েছেন জগন্নাথধাম পুরীর উদ্দেশ্যে। সামনে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ। আগামী ১৬ জুলাই রথযাত্রা। তার আগেই পুরীতে পৌঁছে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সাক্ষী হওয়াই তাঁর লক্ষ্য। গোপালের বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য থাকলে এই দীর্ঘ পথও অসম্ভব নয়। গোপালের কাছে এই সফর কোনও রেকর্ড গড়ার চেষ্টা নয়, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসারও নয়। তাঁর কাছে ভ্রমণ মানে পথের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। রাস্তার ধারের চায়ের দোকান, অচেনা গ্রামের মানুষ, সন্ধ্যার আকাশ, কিংবা ভোরের প্রথম রোদ— সবকিছুকেই তিনি নিজের যাত্রার অংশ করে নেন। গন্তব্যে পৌঁছনোর আনন্দ যেমন আছে, তেমনই আছে পথের প্রতিটি মুহূর্তকে বাঁচিয়ে রাখার সুখ।
আজকের ব্যস্ত জীবনে, যেখানে সময়ের অভাবে অনেকেই নিজের শখকে বিসর্জন দেন, সেখানে গোপাল মাহারা যেন অন্যরকম এক বার্তা দেন। তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন, স্বপ্ন পূরণ করতে সবসময় বড় অর্থ বা বিলাসবহুল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু সাহস, পরিবারের ভরসা আর নিজের বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলার ইচ্ছা। সাঁইথিয়া থেকে পুরীর পথে ছুটে চলা ‘পারো’ তাই শুধু একটি সাইকেল নয়, সেটি একজন স্বপ্নবাজ মানুষের সঙ্গী। আর সেই চাকার প্রতিটি ঘূর্ণন যেন নিঃশব্দে বলে যায়— পথ যত দীর্ঘই হোক, ভালোবাসা আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে গন্তব্য একদিন ঠিক ধরা দেয়।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
রতনে রতন চেনে! ৫০ লাখের তোলাবাজিতে সুমিতের ‘সঙ্গী’ আইপ্যাকের প্রতীক জৈনের আপ্তসহায়ক?
-
শিল্ডেও ভরসা জুনিয়ররা, কাস্টমসের বিরুদ্ধে জিতে অভিযান শুরু ইস্টবেঙ্গলের
-
সিন্ডিকেট অপরাধ, তোলাবাজি! দেবরাজ মামলায় বারাসত আদালতে চার্জগঠন
-
‘রাবণ জেন্টলম্যান’ বলে কটাক্ষের শিকার স্বঘোষিত বামপন্থী শোলাঙ্কি, ধেয়ে এল ‘দিমাগি নকশাল’ তোপ
-
মানত করেই পুজোর কাজে অংশ, ভোগের দায়িত্বে বিধবারা, উত্তরের এই পুজোয় দশমীর পর মৎস্যমুখ