Rath Yatra 2026

৩৬১ বছরের ঐতিহ্য! জগন্নাথ নন, মাধবগঞ্জে পিতলের রথে আসীন রাধামদন গোপাল

স্থানীয় ভক্তদের দাবি, দুর্গাপুজোর ৪ দিনের থেকেও এই ৯ দিনের আনন্দ তাঁদের কাছে বেশি। প্রতিদিন মহাপ্রসাদ বিতরণ হয়, চারদিকে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

Advertisement
অসিত রজক
অসিত রজক

শেষ আপডেট: জুলাই ১৬, ২০২৬, ১৩:৩৮

options
link
৩৬১ বছরের ঐতিহ্য! জগন্নাথ নন, মাধবগঞ্জে পিতলের রথে আসীন রাধামদন গোপাল
১৬ জুলাই, বৃহস্পতিবার। মাধবগঞ্জে রথের রশিতে টান দিতে ভিড় জমান হাজার হাজার ভক্ত ও পুণ্যার্থী। নিজস্ব ছবি।

পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার (Rath Yatra 2026) সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও বিষ্ণুপুরের মাধবগঞ্জের রথযাত্রার পরিচয় একেবারেই স্বতন্ত্র। এখানে রথে আরোহন করেন না জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। মল্লরাজাদের আমল থেকে ৩৬১ বছর ধরে একই নিয়মে পিতলের ঐতিহ্যবাহী রথে বিরাজ করেন শ্রীশ্রী রাধামদন গোপাল ঠাকুর জিউ। এখানে জগন্নাথ কৃষ্ণ রূপে পূজিত হন। শতাব্দীপ্রাচীন সেই পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রেখেই বৃহস্পতিবার ভোরে শুরু হল মাধবগঞ্জ ১১ পাড়া রথযাত্রা উৎসব। ভোর থেকেই হরিনাম সংকীর্তন, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ‘জয় গোপাল’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। রথের রশিতে টান দিতে ভিড় জমান হাজার হাজার ভক্ত ও পুণ্যার্থী।

Advertisement

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজাদের সময় রানি শিরোমণি দেবীর ইচ্ছায় মাধবগঞ্জে নির্মিত হয় পাথরের পাঁচচূড়া মন্দির। সেই মন্দিরেই প্রতিষ্ঠিত হন শ্রীশ্রী রাধামদন গোপাল ঠাকুর জিউ। একই সময়ে তৈরি হয় পিতলের সুদৃশ্য রথ। তারপর থেকে একদিনের জন্যও রীতির পরিবর্তন হয়নি। প্রতি বছর রথযাত্রার দিন সকালে নির্দিষ্ট শুভক্ষণে মন্দির থেকে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে বিগ্রহকে রথে আনা হয়। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে পূজা, আরতি ও মাঙ্গলিক আচার সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণ মানুষরাও রথের রশিতে টান দেন।

Advertisement

বৃহস্পতিবার সকাল ৫টা ২০ মিনিটে মন্দির থেকে শুরু হয় শোভাযাত্রা। খোল, করতাল, মৃদঙ্গ ও কীর্তনের সুরে রাধামদন গোপাল ঠাকুরকে পিতলের রথে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর শুরু হয় রথ টানা। বিষ্ণুপুর শহরের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায় যোগ দেন।

Advertisement

মাধবগঞ্জ ১১ পাড়া রথযাত্রা ষোলআনা কমিটির সম্পাদক দীপক দে বলেন, “৩৬১ বছরের এই রথ উৎসব বিষ্ণুপুরবাসীর আবেগ ও গর্ব। সারা বছর মানুষ এই দিনের অপেক্ষায় থাকেন। সোজা রথ থেকে উলটো রথ পর্যন্ত ৯ দিন ধরে পূজা, ভোগ, মহাপ্রসাদ ও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে। প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজারেরও বেশি মানুষ রাজভোগ গ্রহণ করেন। এই কয়েকদিনে গোটা মাধবগঞ্জ উৎসবের আবহে মেতে ওঠে।”

স্থানীয় ভক্ত মধুমিতা রক্ষিত, কৃষ্ণা দে ও মধুমতি পালদের কথায়, “আমাদের কাছে এই রথ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, পারিবারিক মিলনমেলা। সারা বছর এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। দুর্গাপুজোর ৪ দিনের থেকেও এই ৯ দিনের আনন্দ আমাদের কাছে বেশি। বহু দূর থেকে আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে চলে আসেন। প্রতিদিন মহাপ্রসাদ বিতরণ হয়, চারদিকে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।”

মদনগোপাল মন্দিরের পুরোহিত বলরাম চট্টোপাধ্যায় জানান, “দ্বিতীয়া তিথি, অমৃতযোগ ও মহেন্দ্রযোগ মেনে শতাব্দীপ্রাচীন বিধি অনুসারেই রথযাত্রা শুরু হয়। এখানে জগন্নাথ কৃষ্ণ রূপে পূজিত হন। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে নিয়মে পূজা করে গিয়েছেন, আজও সেই নিয়মের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। সোজা রথ থেকে উলটো রথ পর্যন্ত প্রতিদিন বিশেষ রাজভোগ, মহাপ্রসাদ ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়।”

মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয় এই রথযাত্রা। পিতলের শতাব্দীপ্রাচীন রথ, রাধামদন গোপাল ঠাকুরের আরাধনা, হাজারো ভক্তের সমাগম এবং ৯ দিনব্যাপী ধর্মীয় উৎসব আজও মল্লভূমের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.