Birbhum

ঢাকের বোলে আত্মপরিচয়! মহিলা ঢাকিদের বাদ্যিতেই নতুন পরিচিতি পেল বীরভূমের এই গ্রাম

চাঙ্গুরিয়ার দাসপাড়া গ্রাম এখন 'মহিলা ঢাকিদের গ্রাম' বলে পরিচিত।

সৌরভ চক্রবর্তী
সৌরভ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ২১:০৪

options
link
ঢাকের বোলে আত্মপরিচয়! মহিলা ঢাকিদের বাদ্যিতেই নতুন পরিচিতি পেল বীরভূমের এই গ্রাম
মহিলাদের ঢাকের বোলেই নতুন পরিচয় বীরভূমের চাঙ্গুরিয়া দাসপাড়া গ্রামের, নিজস্ব ছবি

চাঙ্গুরিয়া গ্রামের দাসপাড়ার নাম বললে হয়তো অনেকেই একবার থমকে যাবেন। কিন্তু ‘মহিলা ঢাকিদের গ্রাম’ বললে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন আশপাশের মানুষই। কারণ, বীরভূমের (Birbhum) এ গ্রামের পরিচয় এখন আর শুধু মাটির রাস্তা, খেতখামার কিংবা পাড়ার নামের মধ্যে আটকে নেই। কয়েকজন মহিলার কাঁধে ঝোলানো ঢাক আর তার তালে এগিয়ে চলা তাঁদের জীবনই বদলে দিয়েছে গ্রামের পরিচয়। তাঁদের বাজানো ঢাকের শব্দ এখন পৌঁছে যায় বীরভূমের গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে। আর সেই সঙ্গে চাঙ্গুরিয়ার দাসপাড়ার নামও ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। ঢাক হাতে মহিলারা এখন দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন!

Advertisement

অথচ বছর দশেক আগেও এমনটা কল্পনাই করা যেত না। সংসারের অভাব মেটাতে দাসপাড়ার মেয়ের কেউ নির্মাণকাজে জোগাড়ের কাজ করতেন, কেউ মাঠে দিনমজুরি করতেন, আবার কেউ বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতেন। কাজ ছিল, পরিশ্রমও ছিল, কিন্তু পরিচয় বা সম্মানের জায়গাটা ছিল না বললেই চলে। বদলের আওয়াজ প্রথম তুলেছিলেন পাশের গাংটে গ্রামের ঢাকি ভবেশ দাস। তাঁর ভাবনাটা ছিল সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। মেয়েরা যদি পৌরহিত্য করতে পারেন, জীবনের নানা ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারেন, তা হলে ঢাক বাজানোর ক্ষেত্রেই বা ‘অযোগ্য’ হয়ে থাকবেন কেন? সত্যি বলতে কী, এই প্রশ্ন থেকেই সলতে পাকানোর শুরু। ভবেশবাবু শুধু পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকেননি। নিজের অভিজ্ঞতা উজাড় করে দিয়ে বিনামূল্যে গাঁয়ের মহিলাদের ঢাক বাজানো শেখাতে শুরু করেন।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
Birbhum: Women of Daspara rehearse the dhak from neighbourhood to neighbourhood
পাড়ায় পাড়ায় ঢাকের মহড়া দাসপাড়ার মহিলাদের, নিজস্ব ছবি

কয়েক বছর অনুশীলনের পর স্থানীয় অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁদের পথচলা। ধীরে ধীরে ডাক আসতে থাকে জেলার বাইরে থেকেও। এখন বহরমপুর, বর্ধমান-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পুজো, অনুষ্ঠান কিংবা উৎসবের আসরে ঢাক বাজাতে যান ভাগ্য দাস, বসুমতী দাস, মনখুশি দাসদের দল। একসময় যে হাতে সংসারের খরচ জোগাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হত, সেই হতেই এখন ঢাকের কাঠি।

এক-দু’জন করে কয়েকজন মহিলা এগিয়ে এলেন। হাতে উঠল ঢাকের কাঠি। শুরু হল তাল, লয় আর ছন্দের কঠিন অনুশীলন। ভুল হয়েছে, হাতে ব্যথা হয়েছে, তাল কেটেছে – তবু ঢাকের তালে বোল তোলা থামেনি। দিনের কাজ সেরে, সংসারের দায়িত্ব সামলে চলেছে প্রশিক্ষণ। ভবেশ দাসের কথায়, ‘‘এখন সারা বছর বিভিন্ন জায়গা থেকে গুদের জন্য বুকিং আসে। এটা আমার কাছেও গর্বের।” কয়েক বছর অনুশীলনের পর স্থানীয় অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁদের পথচলা। ধীরে ধীরে ডাক আসতে থাকে জেলার বাইরে থেকেও। এখন বহরমপুর, বর্ধমান-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পুজো, অনুষ্ঠান কিংবা উৎসবের আসরে ঢাক বাজাতে যান ভাগ্য দাস, বসুমতী দাস, মনখুশি দাসদের দল। একসময় যে হাতে সংসারের খরচ জোগাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হত, সেই হতেই এখন ঢাকের কাঠি।

Advertisement
Birbhum: Women artists rehearse the dhak at the blooming kash fields
কাশবনে জমিয়ে ঢাকের মহড়ায় মহিলা শিল্পীরা, নিজস্ব ছবি

বসুমতী বা মনখুশিদের কাছেও ঢাক এখন নিছক বাদ্যযন্ত্র নয়। সেটাই তাঁদের আত্মপরিচয়ের অংশও বটে। তাঁদের সাফল্য দেখে এলাকার অন্য মেয়েদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। তাই চাঙ্গুরিয়ার দাসপাড়া এখন আর একটি পাড়া নয়। ‘মহিলা ঢাকিদের গ্রাম’ বললেই যে দরজা খুলে যায়, সেই পরিচয়ের পিছনে রয়েছে একদল মহিলার ঘাম, সাহস আর নিরন্তর লড়াই।

ভাগ্য দাসের জীবনে এই পরিবর্তনের মূল্য আরও গভীর। দুই সন্তান ছোট থাকতেই স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। সংসারের হাল ধরতে তখন যে কাজ সামনে এসেছে, সেটাই করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘ঢাক বাজানো শিখতে না পারলে হয়তো এখনও মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেই সংসার চালাতে হত। এখন শিখতে পেরেছি। দূরের জায়গা থেকে ডাক আসে। সব চেয়ে ভালো লাগে, আমাদের নামেই মানুষ গ্রামের পরিচয় দেয়।”

বসুমতী বা মনখুশিদের কাছেও ঢাক এখন নিছক বাদ্যযন্ত্র নয়। সেটাই তাঁদের আত্মপরিচয়ের অংশও বটে। তাঁদের সাফল্য দেখে এলাকার অন্য মেয়েদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। তাই চাঙ্গুরিয়ার দাসপাড়া এখন আর একটি পাড়া নয়। ‘মহিলা ঢাকিদের গ্রাম’ বললেই যে দরজা খুলে যায়, সেই পরিচয়ের পিছনে রয়েছে একদল মহিলার ঘাম, সাহস আর নিরন্তর লড়াই। আর রয়েছে ভবেশ দাসের সেই দূরদর্শী ভাবনা, যা একদিন কয়েকজন মহিলার হাতে তুলে দিয়েছিল ঢাক, আর আজ সেই ঢাকের তালেই বদলে দিয়েছে গোটা গ্রামের পরিচয়।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.