Bengali

যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলায় বসবাস করছে তারা সবাই ‘বাঙালি’

‘বাঙালি’ শব্দটিকে মাতৃভাষার সঙ্গে ‘এক’ করে দেখলে বাংলার বাস্তবতাকে সংকুচিত করা হয় না কি?

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১৪:৪২

options
link
যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলায় বসবাস করছে তারা সবাই ‘বাঙালি’
প্রতীকী ছবি।

‘বাঙালি’ কে? কলকাতা-সহ এ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজস্থানি, ভোজপুরি, মৈথিলি, হিন্দি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, ওড়িয়া আরও কত না সম্প্রদায় বহু প্রজন্ম ধরে বেড়ে উঠেছে। তারা বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আত্মীকৃত করেছে। তারা কি ‘বাঙালি’ নয়? লিখছেন কৃপাশংকর চৌবে।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য যখন বলেন যে রাজস্থানি, ভোজপুরি এবং হিন্দিভাষী পরিবারগুলি, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলায় বসবাস করছে– তারাও ‘বাঙালি’– তখন সেটিকে শুধু একটি ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসাবে দেখলে চলবে না; এটি বাংলার সামাজিক কাঠামো এবং ভারতের বহুত্ববাদ নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা একটি সুযোগও তৈরি করে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এই মতকে সমর্থন করেছেন।

Advertisement

একটি রাজ্যের ‘পরিচয়’-কে শুধু ভাষার ভিত্তিতে নয়, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে মানুষের অংশগ্রহণের নিরিখেও বোঝা জরুরি। বাংলার পরিচয়লিপি বহু শতাব্দী ধরেই বহুত্ববাদী। বিভিন্ন ভাষা, সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মানুষকে বাংলা তার সামাজিক জীবনে স্থান দিয়েছে। কলকাতা এবং বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে রাজস্থানি, ভোজপুরি, মৈথিলি, হিন্দি, পাঞ্জাবি, গুজরাতি, ওড়িয়া এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের বহু প্রজন্মের মানুষ বেড়ে উঠেছে। বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিল্পকলা, নাটক, সিনেমা এবং জনজীবনে তাদের অবদান প্রশ্নাতীত। বাংলার ইতিহাসে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপস্থিতি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতএব, ‘বাঙালি’ শব্দটিকে মাতৃভাষার সঙ্গে ‘এক’ করে দেখলে বাংলার বাস্তবতাকে সংকুচিত করা হয় না কি?

Advertisement

‘বাঙালি’ হওয়া একটি ভাষাগত পরিচয়। বাংলার সঙ্গে যুক্ত থাকা তার চেয়ে কম বিস্তৃত সামাজিক ও নাগরিক পরিচয় নয়। কোনও ব্যক্তি বাড়িতে ভোজপুরি, মৈথিলি, অওয়াধি, মারওয়ারি, রাজস্থানি বা হিন্দিতে কথা বলেও বাংলার মাটি, সংস্কৃতি এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে। ভাষা– ব্যক্তির পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ– কিন্তু নাগরিকত্ব, সামাজিক অঙ্গীকার, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকে একটিমাত্র ভাষাগত মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা যায় না।

‘বাঙালি’ হওয়া একটি ভাষাগত পরিচয়। বাংলার সঙ্গে যুক্ত থাকা তার চেয়ে কম বিস্তৃত সামাজিক ও নাগরিক পরিচয় নয়। কোনও ব্যক্তি বাড়িতে ভোজপুরি, মৈথিলি, অওয়াধি, মারওয়ারি, রাজস্থানি বা হিন্দিতে কথা বলেও বাংলার মাটি, সংস্কৃতি এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে।

ভারতের সংবিধানও বৈচিত্রের মধ্যে সমান নাগরিকত্বের ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়। ভারতের শক্তি এখানেই যে, একজন মানুষের একই সঙ্গে একাধিক পরিচয় থাকতে পারে– বাংলার বাসিন্দা হতে পারে, হিন্দিভাষী হতে পারে, কোনও নির্দিষ্ট পারিবারিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, এবং একই সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকও হতে পারে। এসব পরিচয় পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করে না; একে-অপরকে সমৃদ্ধ করে।

বাংলার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা ও সংস্কৃতি– রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। বাংলা ভাষার নিজস্ব পরিচয় ও অধিকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক সংগ্রাম রয়েছে। তাই বাংলা ভাষাকে সম্মান ও সংরক্ষণ করার প্রয়োজন ন্যায়সংগত। তবে একটি ভাষাকে রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, অন্য ভাষায় জীবনযাপনকারী মানুষের বাংলার সামষ্টিক পরিচয় থেকে বাদ দিতে হবে। বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও হিন্দি, উর্দু, রাজস্থানি, সঁাওতালি-সহ অন্যান্য ভাষার সহাবস্থান ঘটতে পারে।

বাংলার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা ও সংস্কৃতি– রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। বাংলা ভাষার নিজস্ব পরিচয় ও অধিকারের জন্য একটি ঐতিহাসিক সংগ্রাম রয়েছে।

বাংলার সাংস্কৃতিক শক্তি এই সহাবস্থানের মধ্যেই নিহিত। একটি শহরের সংস্কৃতি শুধু তার প্রধান ভাষা দিয়ে তৈরি হয় না; তার বাজার, পাড়া, খাদ্যাভ্যাস, সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা, শ্রম এবং প্রতিদিনের সামাজিক সম্পর্ক মিলেই তা গড়ে ওঠে। কলকাতার রাস্তা ও বাজারের বৈচিত্রই এর উজ্জ্বল প্রমাণ। যেসব পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলায় বসবাস করছে, তাদের অভিজ্ঞতাও বাংলার সামাজিক ইতিহাসের অংশ।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের ইতিবাচক দিকটি হল– বাংলায় বসবাসকারী হিন্দিভাষীদের ‘বাঙালি’ বলার অর্থ যদি হয় তাদের সমান নাগরিক এবং বাংলার সমান অংশীদার হিসাবে গ্রহণ করা– তাদের মাতৃভাষা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিত্যাগ করার দাবি না জানিয়ে– গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে এটি নিঃসন্দেহে স্বাগত দৃষ্টিভঙ্গি।

একই সঙ্গে হিন্দিভাষী সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব রয়েছে বর্তায় তারা যে-রাজ্যকে আপন ‘ঘর’ বলে মনে করে– সেই রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। কোনও রাজ্যে বসবাস করা শুধু অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে নয়; এর নিহিত অর্থ: সেই সমাজের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠা।

স্থানীয় ভাষা শেখা, স্থানীয় সংস্কৃতিকে বোঝা, সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ করা কোনও সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয়কে মুছে দেয় না; বরং নতুন আবাসভূমির সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের ইতিবাচক দিকটি হল– বাংলায় বসবাসকারী হিন্দিভাষীদের ‘বাঙালি’ বলার অর্থ যদি হয় তাদের সমান নাগরিক এবং বাংলার সমান অংশীদার হিসাবে গ্রহণ করা– তাদের মাতৃভাষা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরিত্যাগ করার দাবি না জানিয়ে– গণতান্ত্রিক সমাজের পক্ষে এটি নিঃসন্দেহে স্বাগত দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলাকে ‘বাঙালি বনাম অবাঙালি’-র সংকীর্ণ বিতর্কের বাইরে এগিয়ে যেতে হবে। প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়– ‘কে বাঙালি’ এবং ‘কে বাঙালি নয়’। এবং বৃহত্তর প্রশ্ন হল: কে বাংলাকে ‘নিজের ঘর’ বলে মনে করে, এবং বাংলার ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করে? যে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রকৃত পরিচয় এখানেই যে, ভিন্ন-ভিন্ন শিকড় থাকা সত্ত্বেও তার মানুষদের মধ্যে নাগরিকত্বের একটি অভিন্ন অনুভূতি থাকে।

বাংলার মাটি ঐতিহাসিকভাবেই বহু ভিন্ন ধারাকে গ্রহণ ও লালন করেছে। উনিশ শতকে বাংলা ছিল ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র। আধুনিক শিক্ষা, মুদ্রণ, সাংবাদিকতা এবং সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে যে নতুন চেতনার বিকাশ সেখানে ঘটেছিল, তা হিন্দিভাষী অঞ্চলগুলিকেও প্রভাবিত করেছিল। হিন্দির বিকাশে বাঙালি পণ্ডিত ও প্রতিষ্ঠানগুলির অবদান ভারতীয় ভাষাগুলির অভিন্ন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হিন্দি ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং হিন্দির অধ্যয়ন ও শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করেছিলেন। বাংলায় হিন্দি শিক্ষার প্রসারের জন্য যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা পরে বহু পণ্ডিত ও প্রতিষ্ঠানকে এই ভাষার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
হিন্দির জন্য রাজা রামমোহন রায়, শ্যামসুন্দর সেন, অমৃতলাল চক্রবর্তী, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, চিন্তামণি ঘোষ, ক্ষিতীন্দ্রমোহন মিত্র, সারদাচরণ মিত্র, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নলিনীমোহন সান্যাল, সুভাষচন্দ্র বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ, সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়, তনুজা মজুমদার, গৌতম সান্যাল প্রমুখের অবদান কি কেউ ভুলতে পারে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরের শান্তিনিকেতনে হিন্দি ভবন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং হাজারী প্রসাদ দ্বিবেদীকে হিন্দির শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। এখনও সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়, তনুজা মজুমদার, গৌতম সান্যালের মতো বহু বাঙালিভাষী পণ্ডিত হিন্দির প্রসারে অবদান রেখে চলেছেন।

প্রকৃতপ্রস্তাবে, ভারতীয় ভাষাগুলির ইতিহাস প্রতিযোগিতার ইতিহাস নয়; এটি আদানপ্রদান ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির ইতিহাস। একটি ভাষা– অন্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে, ভাবনা আত্মস্থ করে, সাহিত্যিক রীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়, এবং তার পাঠক সমাজকে প্রসারিত করে। হিন্দি ও বাংলার সম্পর্ক এর একটি সুন্দর উদাহরণ। আধুনিক ভারতীয় চেতনার নির্মাণে এই দুই ভাষাই পরস্পরকে প্রভাবিত করেছে।

ভাষাগত পরিচয় নিয়ে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হচ্ছে– তখন হিন্দির প্রসারে অবদান রাখা বাঙালিভাষী বুদ্ধিজীবীদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা জরুরি। তঁাদের উত্তরাধিকার আমাদের এই বার্তা দেয় যে, ভাষা কোনও সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। একাধিক ভাষার প্রতি ভালবাসা– নিজের পরিচয় থেকে সরে যাওয়া নয়; বরং নিজের পরিচয়কে আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ করা।

বাংলার আত্মপরিচয় কোনও বদ্ধ ঘরের মতো নয়; এক প্রবহমান নদীর মতো, যার মধ্যে অসংখ্য স্রোত এসে মিলিত হয়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রবাহ সৃষ্টি করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলায় বসবাসকারী হিন্দি ও রাজস্থানি ভাষাভাষী মানুষদের বাংলার সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া– এই ব্যাপকতাকে স্বীকার করে। তবে এ ধারণা যেন শুধু একটি ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হয়ে না থাকে, বরং তা সম-সম্মান, সম-অধিকার এবং অভিন্ন নাগরিকত্বের একটি বাস্তব অভিজ্ঞানে পরিণত হয়, এর শিকড় বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রোথিত হোক গভীরভাবে।

(মতামত নিজস্ব)

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.