অরবিন্দ ঘোষের অনুপ্রেরণায় ‘অরোভিল’ তৈরি হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। মিরা আলফাসা, ‘শ্রীমা’, নেতৃত্ব দেন। ধর্মীয় আবেগ ছাপিয়ে, অরোভিলের দর্শন ও কর্মপন্থা, জেন জি-কে নবভারত নির্মাণের রাস্তা দেখাতে পারে। লিখছেন গৌতম সাহা ও রাজকুমার পারিডা।
সম্প্রতি, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে করা একটি সমীক্ষায় জানা গেল, অধিকাংশ মার্কিন ‘জেন জি’ জানেই না তাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য! সেই তুলনায় আমাদের দেশের জেন জি অনেক সচেতন, তারা ক্ষমতাকে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক দায়িত্ব নির্বাহের দৃষ্টিকোণ থেকে। বিরোধীরা সেসব প্রশ্ন অনুসরণ করছে। এমনকী, সরকার বাহাদুরও পালটানোর চেষ্টা করছে নিজ-দৃষ্টিকোণ, ধীরে ধীরে।
ভারতের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যের জন্য এটি সুখবর। দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রেক্ষিতে এটি খুব বড় আশার কথাও বটে। তবে শুধু বিরোধিতা নয়, যে নতুন দেশ জেন জি নির্মাণের স্বপ্ন দেখে, তার অনুপ্রেরণাও তাদের খুঁজে নিতে হবে। এ দেশের বহু চিন্তানায়ক ও তাঁদের আদর্শে গঠিত সংস্থা সেই অনুপ্রেরণা হতে পারে। মহাজন প্রদর্শিত পথ থেকে জেন জি যেন পাথেয় খুঁজে নিতে পারে। এরকম একটি সংস্থা, বলা ভালো, ভবিষ্যতের শহর– ‘অরোভিল’। স্বাধীনতা সংগ্রামী ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব অরবিন্দ ঘোষের অনুপ্রেরণায় অরোভিল তৈরি হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। তাঁর আধ্যাত্মিক সহযোগী মিরা আলফাসা (‘শ্রীমা’ বলে সমধিক পরিচিত)-র নেতৃত্বে নির্মিত অরোভিলের দর্শন ও কর্মপন্থা মনে রাখার মতো। ধর্মীয় আবেগ ছাপিয়ে তা জেন জি-কে নবভারত নির্মাণের রাস্তা দেখাতে পারে।
মানবতাই ধর্ম
অরোভিল নির্মাণের সময় অরোভিল চার্টারে মিরা আলফাসা ঘোষণা করেন, অরোভিল কোনও নির্দিষ্ট দেশ, জাতি, ধর্ম, শ্রেণির জন্য নয়; এ শহর সমস্ত মানুষের জন্য। এখন বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের ৩,৫২৭ প্রতিনিধি বসবাস করে সেখানে, যা মানব ঐক্য তথা মানব উন্নয়নের প্রতীক। অরোভিলের মানুষ তথাকথিত ধর্ম আচরণ করে না, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতি ও অরোভিল কমিউনিটির সার্বিক উন্নতির চেষ্টা করে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের লক্ষ্য
অরোভিল চিরকালীন শিক্ষা, মানবপ্রগতি, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক গবেষণাগার। এই গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি প্রতিফলিত হয়েছে অরোভিলের অধীনে থাকা সংস্থার মধ্যে– যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জৈব কৃষি, জল সংরক্ষণ, বন সংরক্ষণ, হস্তশিল্প, পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নির্মাণ, ইলেকট্রনিক্স ও কম্পিউটার শিল্পে বিগত কয়েক দশক ধরে কাজ করে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৮৯ সালে স্থাপিত ‘অরোভিল আর্থ ইনস্টিটিউট’, একটি শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক সংস্থা, যারা নানারকম নির্মাণকৌশল নিয়ে কাজ করে মৃত্তিকাভিত্তিক স্থাপত্যের উপর। এই সংস্থা প্রায় ১০ হাজার বছরের পারম্পরিক স্থাপত্যশৈলীর জ্ঞান নিয়ে ভূমিকম্প-সহনশীল বাড়ি তৈরি করেছে দিল্লি, ওড়িশা, গুজরাটে।
ভবিষ্যতের শহর– ‘অরোভিল’। স্বাধীনতা সংগ্রামী ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব অরবিন্দ ঘোষের অনুপ্রেরণায় অরোভিল তৈরি হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। তাঁর আধ্যাত্মিক সহযোগী মিরা আলফাসা (‘শ্রীমা’ বলে সমধিক পরিচিত)-র নেতৃত্বে নির্মিত অরোভিলের দর্শন ও কর্মপন্থা মনে রাখার মতো।
নির্মাণ করেছে সুনামি-কবলিত স্থানে সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থল; পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে ভারত-সহ ইরান, নেপাল, সৌদি আরবে কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। ‘অরোভিল আর্থ রিসার্চ সেন্টার’ পৃথিবীর ৩৫টি দেশে তাদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করে। এর মাঝেই দু’টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও ১১টি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে এই সংস্থা। এছাড়াও সংস্থাটি ‘ইউনেস্কো চেয়ার ফর আর্থ আর্কিটেকচার’-এ এশিয়ার প্রতিনিধি।
সামাজিক উদ্যোগের সংস্কৃতি
অরোভিল ২৩০টি সামাজিক উদ্যোগের জন্ম দিয়েছে– যেখানে গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপণনকে সফলভাবে মেশানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরকমই সামাজিক উদ্যোগ ১৯৭৬ সালে তৈরি হওয়া ‘মারোমা’। এই সংস্থা উন্নত সুগন্ধি গবেষণার মাধ্যমে অরোভিলের স্থানীয় ফুলকে কঁাচামাল রূপে কাজে লাগিয়ে সুগন্ধী, ধূপকাঠি, মোমবাতি, মোমদান, সাবান, শ্যাম্পু, তেল-সহ নানা প্রসাধন পণ্য দেশ ও বিদেশের বাজারে বিক্রি করে। মারোমা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক স্থানীয় মানুষকে জীবিকা দেয়, আর সেখানকার কর্মীদের কাজের পরিবেশপ্রদান করে।
অরোভিল নির্মাণের সময় অরোভিল চার্টারে মিরা আলফাসা ঘোষণা করেন, অরোভিল কোনও নির্দিষ্ট দেশ, জাতি, ধর্ম, শ্রেণির জন্য নয়; এ শহর সমস্ত মানুষের জন্য। এখন বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের ৩,৫২৭ প্রতিনিধি বসবাস করে সেখানে, যা মানব ঐক্য তথা মানব উন্নয়নের প্রতীক।
পরিবেশ চেতনা
১৯৬৮ সালে শুরু অরোভিল প্রথম থেকেই পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের চেষ্টা করে গিয়েছে, যখন সাস্টেনেবিলিটি ও উষ্ণায়নের ধারণা নিয়ে পৃথিবীতে হইচই শুরু হয়নি। অরোভিলের ধ্যানঘর ‘মাতৃমন্দির’ নির্মাণের সময় এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বটগাছটি কাটার কথা হয়। সেই সময় পুদুচেরি আশ্রমের কর্ণধার মিরা আলফাসা স্পষ্ট নির্দেশ দেন– বটগাছকে কেটে নয়, বরং বটগাছকে মুখ্য আকর্ষণ কেন্দ্র করেই মাতৃমন্দির নির্মিত হবে। এখনও অরোভিলে মানুষ মাতৃমন্দির দেখতে এলে সবার আগে সেই আদি বটগাছটিই দর্শন করে।
শুরু থেকেই অরোভিল প্রাকৃতিক উপায়ে রাসায়নিক বিষহীন কৃষিকর্মের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ম্বর হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাঙ্কিং– এসব বিষয়ে স্বনির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি নির্মাণে অনেকখানি সফল এই প্রতিষ্ঠান। হালের ‘ভোকাল ফর লোকাল’ চর্চার যুগে অরোভিল এগিয়ে থাকা সংস্থার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অরোভিলের ছায়ায় গড়ে উঠেছে ২৩০টি সামাজিক উদ্যোগ। ভারতের পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের দূত উমা প্রজাপতি, প্রকৃতিবান্ধব কৃষির অন্যতম বিখ্যাত মুখ কৃষ্ণ ম্যাকেনজি– প্রত্যেকে অরোভিলের সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে আসা ব্যক্তিত্ব। দেশের জেন জি আশ্চর্য হয়, এই উষ্ণায়নের যুগে কীভাবে বন কেটে উন্নয়নের ডঙ্কা বাজছে, তা প্রত্যক্ষ করে! কীভাবে শান্তি ও সুস্থ জীবিকার পথ রুদ্ধ করে ধর্ম, জাতি, ভাষা ও শ্রেণি-রাজনীতির নামে হিংসা ও হত্যালীলা চলে, তাও তাদের অবাক করে! এর বিপরীতে অরোভিল কি হতে পারে না দীপবর্তিকা?
(মতামত নিজস্ব)
সর্বশেষ খবর
-
শচীনের থেকে কোথায় এগিয়ে কোহলি? এবি’র মন্তব্যের পর এবার তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা নাইট প্রাক্তনীর
-
নারী স্বনির্ভরতায় দিশা দেখাবে পাটজাত পণ্য, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ শুরু বালুরঘাটে
-
২ সপ্তাহ ধরে পেটে তীব্র যন্ত্রণা! মীরা ভট্টাচার্যের জন্য মেডিক্যাল বোর্ড, কেমন আছেন বুদ্ধজায়া?
-
মমতা আমলে তৈরি হওয়া কর্মতীর্থেও দুর্নীতি! ক্যাগ রিপোর্ট সামনে আসতেই চাঞ্চল্য বীরভূমে
-
অন্তঃসত্ত্বার পেটে ‘সন্তানের মুখ’, খাচ্ছে ডাব! হবু মাকে ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ নেটদুনিয়ার