কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘প্রথম ১০০’ দিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি রাজ্য সরকার সম্পর্কে ওই সময়ের মধ্যে কোনও সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়। সরকারের কাজ এক সুবিশাল, দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যার সঙ্গে সরাসরি জনগণ যুক্ত। পরিষেবা দেওয়া কোনও কৃতিত্বের কাজ নয়। বরং সেটা সুষ্ঠু এবং সঠিক না হলে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিরোধী এবং শাসকের মধ্যে তাই আকাশ-পাতাল ফারাক। সরকারের প্রধান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ক্যারিশমার উপর সরকারের ভাবমূর্তি তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কাজটা বিমানের পাইলটের মতো নয় যে, এক দৌড়েই রানওয়ে থেকে সরকারকে আকাশে তুলে দেবেন। তাঁকে অনেক পরিকল্পনা করে এগতে হয়।
আরও পড়ুন:
সেই প্রেক্ষিতে শুভেন্দু অধিকারী তরুণ। মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। নিশ্চয়ই অনেক ভাবনা তাঁর আছে। ডাব্ল ইঞ্জিনের সুযোগ তিনি পাবেন। কেন্দ্র পাশে থাকলে রাজ্যের উন্নয়নে গতি আসে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সুযোগ রাজ্য পায়। গত ৪৯ বছর সেই সুযোগ পশ্চিমবঙ্গ পায়নি। তবে একটি সরকারের অভিমুখ বোঝার জন্য ১০০ দিন যথেষ্ট। সেই প্রেক্ষিতে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের (Bengal BJP) ১০০ দিনের কাজের মূল্যায়ন যদি করা যায়, তাহলে বলা যেতেই পারে সরকার কী চাইছে সেটা আপাতত স্পষ্ট। যারা বলছে, ‘তিন মাসেই সরকার আস্থা হারিয়েছে’, ‘ট্রেনে-বাসে কান পাতলেই সমালোচনা শোনা যাচ্ছে’, ‘এখনই ভোট হলে এরা হেরে যাবে’, আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। পশ্চিমবঙ্গের এটাই ধারা। যে-ই সরকারে থাকুক, তাকে ফালাফালা করা হয় চায়ের দোকানে, অফিসের আড্ডায়, লোকাল ট্রেনের ভিড়ে। কিন্তু সহজে পরিবর্তন করে না মানুষ। এই রাজ্যে সরকার ও জনগণের যে নিবিড় সংযোগ তা অন্য রাজ্যে নেই।
বাম আমলে কৃষক শ্রমিকদের সঙ্গে লাল পার্টির গভীর বন্ধুত্ব ছিল। তারা ঘাম রক্ত ঝরিয়ে সেই পতাকা বইত। গ্রাম থেকে এসে ব্রিগেড ভরিয়ে দিত। তৃণমূল আমলে মহিলা-সহ বিভিন্ন উপভোক্তা শ্রেণির সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। তাদের সমর্থনে
তিন-তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপভোক্তা শ্রেণি ভোট ব্যাঙ্ক তৈরি করে। কৃষকরা সিপিএমকে ভাবত নিজেদের পার্টি। শ্রমিক কর্মচারীদের অধিকার ছিল বাম সরকারে। পরে, এই রাজ্যের মহিলারা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি ভাতা পাওয়া উপভোক্তা শ্রেণি মনে করত, দিদি আছে তাই ভাল আছি। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট ও ১৫ বছরের তৃণমূল জামানা পেরিয়ে রাজ্যে এখন গেরুয়া শাসন। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার স্রোতে ভেসে ক্ষমতা দখল করার পর ভারতীয় জনতা পার্টি আর পিছন ফিরে তাকাতে চাইছে না। কিন্তু বাঙালির মননে জায়গা নিশ্চিত রাখতে চেনা ছকের বাইরেও যে তারা যেতে চাইছে না সেটাও এই ১০০ দিনে স্পষ্ট।
এটা ঠিক যে বিজেপি একটা সলিড হিন্দুত্বের ভোট ব্যাঙ্ক তৈরি করতে পেরেছে এই রাজে্য। তৃণমূল যখন মুসলিম ভোট নিজেদের পক্ষে একজোট করতে লাগল, তখন পাল্টা হিন্দু ভোটের মেরুকরণ বিজেপি করেছে। যার সুফল এবার আরও বেশি করে পেয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র রামনাম করেই ক্ষমতা হাতের মুঠোয় থাকবে না, সেটা ভাল করেই তারা জানে। সেজন্যই জনমুখী প্রকল্পে নজর ও নির্বাচনী সংকল্পে বিপুল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ক্ষমতায় এসে যে কল্পতরু বাজেট স্বপন দাশগুপ্ত মহোদয় পেশ করেছিলেন তা থেকেই বোঝা যায় সংস্কারের নজর থাকলেও সরকার ‘পপুলার ইমেজ’-কে সামনে রাখছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন থেকে অর্থনীতি বিকল্প অনেক ভাবনার প্রতিফলন বাজেটে রয়েছে। শুভেন্দু ছঁুতে চেয়েছেন সব স্তরকে।
বিজেপি ২২টি রাজ্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষমতায়। কোনও রাজ্যের এমন আপাদমস্তক জনমুখী বাজেট পেশ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার এই ভাবনা বাস্তবায়িত করতে মোদি-শাহদের ভরসা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি খুব অল্প বয়স থেকে সংগঠক নেতা। গত প্রায় ২০ বছর এই রাজ্যের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ানোর ফলে তিনি জানেন রাজ্যের মানুষ কী চায়। কোথায় লুকিয়ে আছে সমর্থন জোগাড় করার অঙ্ক। সেই অর্থে বিজেপির বড় সাফল্য– তাঁকে দলে টানা। শুভেন্দুই তাদের কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। ফলে তঁাকে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ ছিল না।
যে-কথা বলছিলাম, ১০০ দিনে এই সরকারের কাজের যদি মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছনোই নিবিড়ভাবে করা হচ্ছে। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নাম বদলে হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। যে মহিলা জানুয়ারি মাসেও ১০০০ পেতেন, তিনি এখন পাচ্ছেন ৩০০০।
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই ৩ হাজার যে মহিলাদের কাছে কতটা অমূল্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘লক্ষ্মী’-র চেয়ে ‘অন্নপূর্ণা’-র সংখ্যা প্রায় ১ কোটি কম। তৃণমূলের আমলে বাছবিচার ছিল না। প্রচুর ভুয়া নামও ঢুকে পড়ে। বিজেপি খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই প্রত্যেককে দেয়নি। ফর্মে কিছু বিধিনিষেধ ছিল। যাদের প্রয়োজন নেই তারা পাবে কেন? যদিও সংখ্যালঘুদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথ্য দিয়েছেন ১৯ লক্ষ ২০ হাজার মুসলিম মহিলাকে
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র টাকা দেওয়া হচ্ছে।
বস্তুত, কোনও সামাজিক প্রকল্পই বন্ধ হয়নি। নামবদল হয়েছে এবং বৃদ্ধি হয়েছে বরাদ্দ। বিশেষ করে তফসিলি, আদিবাসী উদ্বাস্তু রাজবংশীদের যে ঢালাও সমর্থন এবারে বিজেপি পেয়েছে তা ধরে রাখতেই সামাজিক প্রকল্পে আরও ঘি ঢালা হচ্ছে। এবার বেকার যুবক এবং নতুন প্রজন্মের ভোট বিজেপির দিকে যাওয়াই তৃণমূলের হারের অন্যতম কারণ। ১৫ বছর ধরে সরকার চললে যুবদের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অঁাচ লাগে। দিল্লিতে মোদি সরকার যা টের পাচ্ছে। যেভাবে জেন জি-রা পথে নেমেছে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে আসরে কখনও প্রধানমন্ত্রী, কখনও সংঘপ্রধান মোহন ভাগবত। ফলে রাজ্য সরকারকেওআ গামী দিনে চাকরিবাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্পায়নে জোর দিতে হবে। চাকরির পরীক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর দিতে হবে। কাজ সৃষ্টি করতে হবে।
যদিও প্রথম ১০০ দিনে এই প্রসঙ্গ অবান্তর। সেসব মূল্যায়ন ১০০ দিন নয়, ৫০০ দিন পর হবে। ফলে সরকারের সমালোচনা করার সময় এখনও আসেনি। শুভেন্দুবাবু নিজে খুবই পরিশ্রম করছেন। কারণ, তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে ‘নতুন’ একটি টিম নিয়ে। তৃণমূল আমলে একাধিক দফতরে মন্ত্রী তিনি ছিলেন। বহু স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন। পক্ষান্তরে তাঁর টিমে সরকারি দলে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব কমজনের। বেশিরভাগ প্রথমবার বিধায়ক।
সরকারের আরও দু’টি লক্ষ্য স্পষ্ট। প্রথমত, দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলকে আরও বেশি কোণঠাসা করা। দ্বিতীয়ত, কড়া কিছু আইন, কিছু পদক্ষেপ। বিরোধীদের আরও ছত্রখান করা। শুভেন্দু জানেন, পশ্চিমবঙ্গ বরাবরের আন্দোলনের মাটি। ছোটখাট ইস্যুতেও বিপুল প্রতিক্রিয়া হয়ে যায় সমাজে। তিনি বিপক্ষ শিবিরকে সুযোগ দেবেন কেন? দলীয় স্তরেও ১০০ দিনের একটি পর্ব আছে। দাদাগিরি-তোলাবাজি-কাটমানি খাওয়ার রোগ যে সদ্য ক্ষমতায় আসা দলের মধ্যে ঢুকেছে, সে-কথা নিজমুখে স্বীকার করেছেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। অন্তত ২০ জন বিধায়ককে তিনি সতর্ক করেছেন। কিছু নেতাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মাত্র ১০০ দিনে এটা খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সুবিধাবাদী শ্রেণি সবসময় শাসকের ধারেকাছে থাকতে চায়। তাদের যত প্রতিরোধ করা যাবে, ততই শাসকের পক্ষে মঙ্গল। তৃণমূল যদি শুরু থেকে কড়া ব্যবস্থা নিত তাহলে তাদের সমস্যার মুখে পড়তে হত না। শমীকবাবু রাজ্য সভাপতি হয়ে বিজেপির সব গোষ্ঠীকে এক করেছিলেন। এবার ‘শাসক’ হয়ে বেনোজল ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জ শুভেন্দু অধিকারীরও। যদিও একটি ১০০ দিনের সরকার সম্পর্কে এর বেশি কিছু লেখার সুযোগ এখন অন্তত নেই। তাদের সমালোচনা করার সময়ও আসেনি। বরং তারা কাজ করুক। কাজ দেখাক। আরও অন্তত ১০০ দিন সময় তাদের দিতেই হবে।
সর্বশেষ খবর
-
শিকলবন্দি মানসিক ভারসাম্যহীন ভাইকে জুতোপেটা! মালদহ মেডিক্যালে অমানবিক দৃশ্য
-
মেটাকে টেক্কা দেবে জিও! দেশি স্মার্ট চশমা বাজারে আনতে চলেছেন আম্বানিরা
-
বিজেপির পদ থেকে ‘বিতাড়িত’, কয়েকদিন পরেই ‘ককরোচ’দের প্রশংসায় পঞ্চমুখ পদ্ম সাংসদ
-
প্রকৃতির রুদ্ররোষে নেপাল! ‘পাশে আছি’, বলেন্দ্র শাহকে ফোন মোদির, দিলেন সাহায্যের আশ্বাস
-
বাড়িতে কথার ফুলঝুরি, কিন্তু স্কুলে গেলেই চুপ! শুধুই লাজুক নাকি বড় সমস্যায় ভুগছে আপনার শিশু?