Netaji Subhas Chandra Bose

নেতাজি ও বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সম্পর্ক, ফৈজাবাদের রহস্যময় সেই সাংকেতিক চিঠি 

কার কাছ থেকে কার কাছে বার্তা পৌঁছনোর জন্য গোপন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল? চিঠিতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির উল্লেখ কেন রাখা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার জন্য চিঠিটির মূল পাঠ, তার প্রামাণিকতা, প্রাপকের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট নথিগুলির নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করা অপরিহার্য।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ২০:৫৬

options
link
নেতাজি ও বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সম্পর্ক, ফৈজাবাদের রহস্যময় সেই সাংকেতিক চিঠি 
নেতাজিকে লেখা চিঠির প্রতিটি শব্দ হয়তো আজও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয়।

গুমনামি বাবাই  কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।

Advertisement

সৈকতের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান তখন উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ অঞ্চলের ভগবানজিকে ঘিরে থাকা রহস্যের অনুসন্ধান। তাঁর কাছে ভগবানজি কোনও সাধারণ সাধু বা অজ্ঞাতপরিচয় সন্ন্যাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই ব্যক্তিত্বের পরিচয়ের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধানের প্রশ্নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

আমাদের মধ্যে বহু তর্ক হয়েছে। মতের মিল সবসময় ছিল না। কখনও কোনও তথ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বিমত হয়েছে, কখনও কোনও দাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তর্কের মধ্যেই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—আমরা দু’জনেই অনুসন্ধান করতে চাই। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বিষয়টি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করব। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকে ঘটনাগুলো যেন ধীরে ধীরে অন্য এক গতিতে এগোতে লাগল। ভগবানজি কে ছিলেন? তিনি কি সত্যিই নেতাজি? নাকি ইতিহাসের এক দীর্ঘ ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কোনও বিপ্লবী? যে নথিগুলো সামনে আসছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা কী?

Advertisement

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা কখনও পুরনো বইয়ের কাছে ফিরেছি, কখনও স্মৃতিচারণ পড়েছি, কখনও নথির উৎস নিয়ে আলোচনা করেছি। কোনও দাবি গ্রহণ করার আগে তার প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করেছি। তবু সবকিছু অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ একসময় আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল একটি চিঠি। চিঠিটি লিখেছিলেন মহারাজা ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী।

অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী নেতা মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী এই চিঠি লিখেছিলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে!

১৯৮৫ সালের পর উত্তরপ্রদেশের রামভবনে ভগবানজির ব্যবহৃত জিনিসপত্র উদ্ধারের যে বিবরণ প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে এই চিঠির নামও যুক্ত হয়েছে। চিঠিটির উৎস, সংরক্ষণ, পাঠোদ্ধার এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবু এর বিষয়বস্তু আমাদের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে চলে এল।

চিঠির শুরু— ‘জয়যুক্তেষু।’ কয়েকটি শব্দ। একটি সম্বোধন। কিন্তু সেই সম্বোধনের পর যে ইঙ্গিতগুলো রয়েছে বলে মনে করা হয়, সেগুলোই আমাদের থামিয়ে দিল। একজন প্রবীণ বিপ্লবী, যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিলেন, তিনি কেন এমন ভাষায় লিখবেন? কাকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন? চিঠির প্রাপক কি সত্যিই সেই ব্যক্তি, যাঁকে ঘিরে এতদিন ধরে রহস্য তৈরি হয়েছে? নাকি চিঠির ভাষার অন্য কোনও ঐতিহাসিক, সাংগঠনিক কিংবা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা রয়েছে? প্রশ্নের সংখ্যা বাড়তে লাগল।

চিঠির প্রতিটি শব্দ আলাদা করে পড়তে ইচ্ছে করত। কোনও শব্দ কি ইঙ্গিত বহন করছে? কোনও বাক্যের আড়ালে কি এমন তথ্য রয়েছে, যা সরাসরি লেখা সম্ভব ছিল না? নাকি আমরা নিজেরাই পূর্বধারণা নিয়ে চিঠির ভাষাকে ব্যাখ্যা করছি? ইতিহাসের গবেষণায় সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কখনও কখনও এখানেই। আমরা যে উত্তর খুঁজছি, তার সঙ্গে মিলে যায় এমন শব্দ দেখলেই তাকে প্রমাণ বলে ধরে নিতে চাই। অথচ একটি চিঠির সত্যিকার অর্থ বোঝার জন্য প্রয়োজন তার সম্পূর্ণ পাঠ, প্রাপকের পরিচয়, লেখকের অবস্থান, লেখার সময়কাল এবং সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

তবু ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর চিঠিটি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক সময়, যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু প্রবীণ মানুষ জীবিত ছিলেন, কিন্তু নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে প্রশ্নের কোনও সর্বসম্মত সমাধান তৈরি হয়নি। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ষাটের দশকের একজন অভিজ্ঞ বিপ্লবী। তাঁর মতো মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি ছিল দীর্ঘ, বহুস্তরীয় এবং সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—
ষাটের দশকে তিনি এমন কোনও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে থাকলে, তার পেছনে কী ছিল?

বিপ্লবী নেতা মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী।

কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি কি আমাদের অজানা কোনও যোগাযোগের সূত্র দিতে পারে? নাকি সেই চিঠিকে পরবর্তী সময়ে এমন একটি প্রেক্ষাপটে পড়া হয়েছে, যা লেখকের মূল উদ্দেশ্য থেকে আলাদা? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নথির নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, চিঠির পূর্ণ পাঠ উদ্ধার, লেখকের অন্যান্য চিঠির সঙ্গে তুলনা এবং সমকালীন ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক দলিল পর্যালোচনা। তবু একজন পাঠক হিসেবে, একজন অনুসন্ধিৎসু মানুষ হিসেবে, আমি প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
কারণ আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়। শুরু হয়েছিল অঙ্কভীত এক কিশোরের হাতে ধরা একটি ইতিহাসের বই থেকে। তারপর বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা, পরিবারের গল্প, পুরনো প্রকাশনার ঘর, হারিয়ে যাওয়া বই, এবং একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্ন আমাকে টেনে এনেছে এমন এক অনুসন্ধানের সামনে, যার শেষ আজও আমার কাছে অজানা।

সেদিন যদি আমি জয়শ্রী প্রকাশনের নাম দেখে থেমে যেতাম, যদি মনে করতাম এত পুরনো প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই আর নেই, তাহলে হয়তো এই অনুসন্ধানের পথ আমার সামনে খুলত না।

কখনও মনে হয়েছে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য কোনও গোপন নথির মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। তা লুকিয়ে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। কেউ কিছু মনে রেখেছেন, কেউ কিছু ভুলে গেছেন, কেউ কিছু বলতে চাননি, আবার কেউ হয়তো এমন কিছু বলেছেন যার অর্থ বোঝার জন্য প্রয়োজন আরেকটি প্রজন্মের অনুসন্ধান। টেমার লেনের সেই ছোট্ট ঘরটির কথা মনে পড়ে। পুরনো বোর্ড। বইয়ের স্তূপ। বিজয় নাগের গম্ভীর কণ্ঠ। আর আমার হাতে তুলে দেওয়া সেই বইগুলো, যেগুলো আমাকে তিহাসের অন্য এক জগতে নিয়ে গিয়েছিল।

সেদিন যদি আমি জয়শ্রী প্রকাশনের নাম দেখে থেমে যেতাম, যদি মনে করতাম এত পুরনো প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই আর নেই, তাহলে হয়তো এই অনুসন্ধানের পথ আমার সামনে খুলত না। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে একটি পুরনো বইয়ের প্রকাশকের নামও হয়ে উঠতে পারে নতুন প্রশ্নের সূচনা। আর সেই প্রশ্নের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে এক নাম— সুভাষচন্দ্র বসু।

একজন মানুষ, যাঁকে ঘিরে ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয়েছে। একজন বিপ্লবী নেতা, যাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর অন্তর্ধান সম্পর্কে নানা দাবি, সাক্ষ্য ও নথি জনসমক্ষে রয়েছে, কিন্তু যেগুলোর সবকটির ঐতিহাসিক মূল্য সমান নয়। ভগবানজির পরিচয় নিয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে গেলে তাই আমাদের ফিরে যেতে হবে নথির কাছে। চিঠির কাছে। সাক্ষ্যের কাছে। সময়ের কাছে।

আর সবচেয়ে বেশি—সত্যের কাছে। কারণ ইতিহাসের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় প্রলোভন হল নিজের বিশ্বাসকে প্রমাণ হিসেবে দেখতে শুরু করা। কিন্তু সত্যিকার অনুসন্ধানী মন জানে, একটি প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখাও কখনও কখনও উত্তর পাওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। রামভবনের সেই চিঠি তাই আমার কাছে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বরং এক গভীর প্রশ্নের দরজা।
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন? কাকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন তাঁর পত্র?

ত্রৈলোক্যনাথের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় মান্দালয় জেলে। ১৯২৭ সালে তাঁকে বর্মার মান্দালয়ে পাঠানো হয়।

ভগবানজির সঙ্গে সম্পর্কিত বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সেই সাংকেতিক চিঠিটিও কেন গুরুত্বপূর্ণ দলিল? সেই গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও ত্রৈলোক্যনাথের সম্পর্কের কথা। কারণ সেই সম্পর্কের গভীরেই লুকিয়ে রয়েছে পরবর্তী সময়ে ভগবানজিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক রহস্য ভেদ করবার চাবিকাঠি। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই- কেন ষাটের দশকের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বসে থাকা এক প্রবীণ বিপ্লবীর কাছে পৌঁছেছিল এমন একটি বার্তা? আর কীভাবে সেই চিঠির প্রতিধ্বনি এসে পৌঁছেছিল উত্তর ভারতের এক নির্জন আশ্রয়ে, যেখানে এক রহস্যময় সন্ন্যাসীকে ঘিরে তখন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছিল রহস্য? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতার বহু আগে, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলিতে।

ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তখনও ‘মহারাজ’ নামে পরিচিত নন। কিশোর বয়সেই স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১৯০৬ সালে অনুশীলন সমিতিতে যোগদান। এরপর গ্রেপ্তার, কারাবাস, আন্দামানের সেলুলার জেল, মান্দালয়—তাঁর জীবন যেন একের পর এক অন্ধকার দরজা পেরিয়ে এগিয়ে চলা এক বিপ্লবীর দীর্ঘ যাত্রা। প্রায় ত্রিশ বছর কারাগার ও অন্তরীণ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে করে তুলেছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের এক জীবন্ত ইতিহাস।

তবে ত্রৈলোক্যনাথের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় মান্দালয় জেলে। ১৯২৭ সালে তাঁকে বর্মার মান্দালয়ে পাঠানো হয়। সেখানেই তাঁর সাক্ষাৎ সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সখ্য। ত্রৈলোক্যনাথের স্মৃতিকথায় উঠে আসে সেই সম্পর্কের এমন কিছু মুহূর্ত, যা নেতাজির ব্যক্তিত্বের এক মানবিক দিককে সামনে আনে। জেলে অসুস্থ সহবন্দির সেবা করা, অন্যের কষ্টে পাশে দাঁড়ানো কিংবা আহত বিপ্লবীর ক্ষত নিজ হাতে পরিষ্কার করে দেওয়া— এসব ঘটনা ত্রৈলোক্যনাথের স্মৃতিতে অমলিন ছিল। একবার টেনিস খেলতে গিয়ে তাঁর হাঁটুতে চোট লাগে। সুভাষচন্দ্র নিজ হাতে নিমপাতা সিদ্ধ জল দিয়ে তাঁর ক্ষত পরিষ্কার করতেন। এই স্মৃতি কেবল বন্ধুত্বের নয়, বরং দুই বিপ্লবীর পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক সম্পর্কেরও দলিল।

ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছিলেন, মান্দালয় জেলে সুভাষবাবুর পাশে থাকার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। সেই সান্নিধ্য তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও স্মৃতিতে বিশেষ স্থান অধিকার করে ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে তাঁদের পথ আলাদা হয়ে গেলেও সম্পর্কের স্মৃতি হারিয়ে যায়নি। আর বহু বছর পরে সেই স্মৃতিই যেন নতুন এক রহস্যের দরজা খুলে দিল। স্বাধীনতার পর ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গিয়েছিল।

ভগবানজিকে নেতাজি হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি এবং তার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ নিয়ে ঐতিহাসিক ও আইনগত বিতর্ক রয়েছে।

ত্রৈলোক্যনাথ পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন। সেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, গ্রেপ্তার এবং নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। অন্যদিকে ভারতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ নতুন মাত্রা পেতে শুরু করেছিল। সরকারি বিবরণ অনুযায়ী ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাখ্যা নিয়ে বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলেছেন। নানা সাক্ষ্য, স্মৃতিকথা, তদন্ত এবং জনশ্রুতির ভিতর দিয়ে জন্ম নিয়েছে এক বিকল্প ধারণা— নেতাজি হয়তো বেঁচে ছিলেন।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে পরবর্তী সময়ে উঠে আসে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব—ভগবানজি। ভগবানজি কে ছিলেন? তিনি কি সত্যিই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? নাকি তিনি ছিলেন নেতাজির ভাবধারা ও স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক গোপন জগতের কেন্দ্রীয় চরিত্র? এই প্রশ্নের উত্তর আজও বিতর্কিত। তবে তাঁকে ঘিরে সংগৃহীত চিঠিপত্র, সাক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিবরণ নেতাজি-অনুসন্ধানের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ভগবানজির সঙ্গে সম্পর্কিত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিপ্লবী দেশনেত্রী লীলা রায়ের নামও উঠে আসে। নেতাজির সহযোদ্ধা ও বিপ্লবী আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে লীলা রায়ের সঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। ষাটের দশকে ভগবানজির সঙ্গে সাক্ষাতের পর লীলা রায় তাঁর পরিচয় সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

দেশনেত্রী লীলা রায়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ভগবানজিকে নেতাজি হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি এবং তার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ নিয়ে ঐতিহাসিক ও আইনগত বিতর্ক রয়েছে। মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর প্রচলিত বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, কিন্তু ভারত সরকার সেই রিপোর্ট গ্রহণ করেনি। ফলে এই ইতিহাসকে বুঝতে গেলে সাক্ষ্য, দাবি, তদন্তের সিদ্ধান্ত এবং সরকারি অবস্থান— সবকিছুকে পৃথকভাবে বিচার করা প্রয়োজন।

এটি কেবল দুই বিপ্লবীর ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল নেতাজির অন্তর্ধান, ভগবানজির পরিচয় এবং একটি গোপন অনুসন্ধানের সম্ভাব্য যোগাযোগ-ব্যবস্থা।

তবু সেই বিতর্কের মধ্যেই ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সাংকেতিক চিঠির প্রসঙ্গটি বিশেষ আগ্রহের জন্ম দেয়। বিবরণ অনুযায়ী, ষাটের দশকের মধ্যভাগে লীলা রায়ের বিশ্বস্ত সহযোগী শৈলেন রায়, যিনি ‘ননীদা’ নামে পরিচিত ছিলেন, গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে যান। উদ্দেশ্য ছিল ত্রৈলোক্যনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং একটি বিশেষ চিঠি পৌঁছে দেওয়া। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্তের নজরদারি এবং পাকিস্তানি প্রশাসনের সতর্কতার মধ্যে এই যোগাযোগ সহজ ছিল না। চিঠিটি ছিল সাংকেতিক ভাষায় লেখা। তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত হলেও বিবরণে বলা হয়, তাতে ভগবানজি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল। ত্রৈলোক্যনাথও নাকি পালটা একটি সাংকেতিক চিঠি শৈলেন রায়ের হাতে পাঠান। সেই চিঠি পরে লীলা রায়ের কাছে পৌঁছয়।

এই ঘটনাটির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি কেবল দুই বিপ্লবীর ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল নেতাজির অন্তর্ধান, ভগবানজির পরিচয় এবং একটি গোপন অনুসন্ধানের সম্ভাব্য যোগাযোগ-ব্যবস্থা। কিন্তু রহস্য আরও ঘনীভূত হয় ১৯৮৫ সালে। ভগবানজির রামভবনের আশ্রয়স্থল থেকে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নামে একটি সাংকেতিক চিঠি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে সেই চিঠি মুখার্জি কমিশনের কাছেও পেশ করা হয়েছিল চিঠিটির ভাষা ছিল সাংকেতিক। তার মধ্যে মান্দালয় জেলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথের কাটানো দিনগুলির উল্লেখ ছিল।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর সঙ্গে বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী।

কার কাছ থেকে কার কাছে বার্তা পৌঁছনোর জন্য এই গোপন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল? আর চিঠিতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির উল্লেখ কেন রাখা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার জন্য চিঠিটির মূল পাঠ, তার প্রামাণিকতা, প্রাপকের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট নথিগুলির নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করা অপরিহার্য। কেবল জনশ্রুতি বা পরবর্তী স্মৃতিচারণের ভিত্তিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তবু ইতিহাসের অনুসন্ধান কখনও কখনও এমন কিছু সূত্র সামনে আনে, যেগুলি উত্তর দেওয়ার চেয়ে আরও গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। ত্রৈলোক্যনাথের চিঠিও তেমন এক সূত্র।

ভগবানজির কাছে পৌঁছনো সেই সাংকেতিক বার্তায় কি সত্যিই লুকিয়ে ছিল এমন কোনও তথ্য, যা নেতাজি-রহস্যের আরও একটি পর্দা সরিয়ে দিতে পারত?

একদিকে মান্দালয় জেলের স্মৃতি, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর তারই মধ্যে ভগবানজিকে ঘিরে চলা গোপন যোগাযোগ। এই তিনটি স্তর এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। একটি চিঠি তখন হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্মৃতির দলিলের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক রহস্যের অংশ। ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর জীবন শেষ হয়েছিল ১৯৭০ সালে। ভারতে এসে তিনি নেতাজি ভবন পরিদর্শন করেছিলেন এবং সেখানে লিখে গিয়েছিলেন তরুণদের উদ্দেশে তাঁর প্রত্যাশার কথা— নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শে শক্তিশালী ভারত গড়ে উঠুক। কয়েক দিনের মধ্যেই দিল্লিতে তাঁর মৃত্যু হয়। বিপ্লবী জীবনের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর স্মৃতি রয়ে যায়। আর সেই স্মৃতিরই একটি অংশ পরবর্তীকালে জড়িয়ে পড়ে ভগবানজি-রহস্যের সঙ্গে।

ইতিহাসের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো এই নয় যে, একটি চিঠিতে কী লেখা ছিল। বরং প্রশ্ন হল, কোন বিশ্বাস, কোন স্মৃতি এবং কোন অমীমাংসিত প্রশ্ন মানুষকে এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি গোপন যোগাযোগ রক্ষা করতে বাধ্য করেছিল? ত্রৈলোক্যনাথের চিঠি সেই প্রশ্নের দরজায় আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। দরজার ওপারে রয়েছে নেতাজির অন্তর্ধানের রহস্য, ভগবানজির পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এবং স্বাধীনতার পরও শেষ না হওয়া এক অনুসন্ধানের দীর্ঘ ছায়া।

চিঠির প্রতিটি শব্দ হয়তো আজও আমাদের কাছে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয়। কিন্তু ইতিহাসের অন্ধকারে কখনও কখনও একটি ক্ষুদ্র দলিলই হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের আলো। আর সেই আলোর দিকেই তাকিয়ে প্রশ্ন জাগে— ভগবানজির কাছে পৌঁছনো সেই সাংকেতিক বার্তায় কি সত্যিই লুকিয়ে ছিল এমন কোনও তথ্য, যা নেতাজি-রহস্যের আরও একটি পর্দা সরিয়ে দিতে পারত?

(সৌমব্রত দাশগুপ্ত)

(পরবর্তী পর্ব ২৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার)

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.