Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Netaji Subhas Chandra Bose

বিমান দুর্ঘটনা মিথ্যে, প্রমাণিত কমিশনের রিপোর্টে, তবে কি গুমনামি বাবাই সেই মহামানব?

১৯৪৫ সাল, নভেম্বর মাসে শহরে গুলি চলল আজাদ হিন্দ বিপ্লব দমনে। ১৯৪৬ সাল, নেতাজির জন্মদিবস উপলক্ষে শহরে এসেছেন শাহনাওয়াজ খান, বললেন খুব শীঘ্রই নেতাজির সঙ্গে ভারতে দেখা হবে।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ২০:৫৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ২০:৫৯

options
link
বিমান দুর্ঘটনা মিথ্যে, প্রমাণিত কমিশনের রিপোর্টে, তবে কি গুমনামি বাবাই সেই মহামানব? zoom
নেতাজি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভারতেই ছিলেন! কলকাতায় তার অনুগামীরা আজও আছে!
Advertisement

গুমনামি বাবাই  কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’

সন্ন্যাসীর লেখা দেবনাগরী হরফে কিন্তু ভাষা বাংলা। নিদারুণ অভিমান অভিব্যক্ত হয়েছে সাহিত্যকর্মে ঋদ্ধ হয়। ত্যাগী কেবল নিজের জীবন নয়, ত্যাগ করেছেন সমগ্র বিশ্বকে | উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই এমন ভাবে লেখা, যাতে করে যাকে লেখা সেই কেবল বুঝতে পারে। টুকরো টুকরো কিছু লাইন চোখে জল এনে দেয়।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
ভগবানজির ‘ওয়াসিয়াতনামা’।

“Populus Vult Decipi” লাতিন এই প্রবাদের অর্থ, “জনগণ প্রতারিত হতে চায়!” এতটুকুতেই থেমে থাকেননি দেশনায়ক! স্পষ্ট ভাষায় দেশের উদ্দেশ্যে বলেছেন— “You all people wish to be fooled!” আর কিছু কি বলতে বাকি থাকে? কেন ফিরে এলেন না দেশনায়ক? উত্তর প্রজন্মের জন্য রেখে গেলেন অব্যক্ত উত্তর।

বৃদ্ধ বয়সে অন্তর্ধানের পূর্বে নিজের দার্শনিক মনের চিন্তা টুকরো কিছু কাগজে ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন মহামানব। সাংবাদিক অশোক ট্যাণ্ডনের হাতে পড়ে যায় সেই লেখা। তিনি বলেন, “খুব অস্পষ্টভাবে কিছু পড়া যায়। টাকা পয়সার কোনও প্রসঙ্গ ছিল না। ইতিহাস দর্শন আর রাজনীতির নিরিখে মনে হয় এটাই তাঁর ওয়াসিয়াতনামা!”

ভগবানজির হাতে লেখা দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক চিন্তার প্রকাশ।

স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে গড়ে ওঠা মুক্তি সংঘ বিপ্লবী দলের সংস্পর্শে গড়ে ওঠে নেতাজির বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স। ক্রমে বিপ্লবী নেতা অনিল রায়ের নেতৃত্বে গুপ্ত সমিতি শ্রীসংঘের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। এই দলের অন্যতম অ্যাকশনিস্ট নেতা অনিল চন্দ্র দাস যোগ দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর গুপ্তচর বিভাগে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিনগুলিতে এক বিশেষ আগ্নেয়াস্ত্র-সহ গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীন ভারতে সেই বৈপ্লবিক পরিচয় ছিল অজ্ঞাত। ১৯৬৩ সালের নৈমিষারণ্যে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের কাছে সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে এসেছিলেন তিনি। সাক্ষাতের পূর্বে দিতে হয়েছিল পূর্বপরিচয় সম্বলিত ক্রেডেনশিয়াল নোট।

ভগবানজির কাছে প্রাপ্ত বিপ্লবী অনিল দাসের ক্রেডেনশিয়াল নোট।

দেশনেত্রী লীলারায় ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের সক্রিয় নেত্রী। তাছাড়া, ১৯৪১ সালে মহানিষ্ক্রমণের পূর্বে দেশের ভিতরে বিপ্লব গড়ে তোলার জন্য সুভাষচন্দ্র এক গোপন কমিটি তৈরি করেছিলেন, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল রিভলিউশনারি কমিটি | জয়প্রকাশ নারায়ণ, ডক্টর রামমনোহর লোহিয়ার মতো জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বঙ্গদেশ থেকে স্থান পেয়েছিলেন দেশনেত্রী লীলা রায়। ভারত ত্যাগের পূর্বে ফরওয়ার্ড ব্লক দলের মুখপাত্র প্রকাশের ও সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন দেশনায়ক। সেই চিঠির একটি প্রতিলিপি ফৈজাবাদের রামভবনে সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্রের শেষ আবাসস্থলে ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া গিয়েছে।

দেশনেত্রী লীলা রায়কে ফরওয়ার্ড ব্লকের পত্রিকার প্রকাশনার দায়িত্ব অর্পণে সুভাষ চন্দ্রের পত্রের প্রতিলিপি।

চাঞ্চল্যকর এমন সব তথ্য হাতে এসেছিল সাংবাদিক অশোক ট্যাণ্ডনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। ফোনে অশোকজি বলতেন, “আমি তো সকলকেই আমার কাছে থাকার সমস্ত জিনিসের প্রতিলিপি দিয়ে দিতে চাই। আমি যাই, এই তথ্যের ইতিহাসধর্মী বিশ্লেষণ হোক। ডাক্তার বীরেন রাইয়ের পুত্র প্রিতমের মাধ্যমে গুগল ড্রাইভে আমি সমস্ত স্ক্যান কপি ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়েও ছিলাম। দুর্ভাগ্য, যাঁরা আমার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আজ বই লিখছেন, তেমনি দু’জন নেতাজি গবেষক ফোন করে ভয় দেখিয়ে তা বন্ধ করে দেন।” নেতাজির প্রসঙ্গে গবেষণা সকলের অধিকার । এই সমস্ত জিনিস রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। কেউ কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে তা কুক্ষিগত রাখতে পারে? সাংবাদিক অশোকজির অযোধ্যার বাড়িতে বসে চমকে উঠেছিলাম সেই ঘটনা শুনে। তবে এত সাম্প্রতিক ঘটনা, নেতাজির অনুসন্ধানে আমাদের যাত্রা শুরুর দিনগুলোর কথা বলি। সেখানে প্রশাসনিক হুমকি থেকে নাৎসি-যোগ সবই রয়েছে রহস্য রোমাঞ্চকর প্রেক্ষাপটে। Facts are stranger than fiction! ফিরে যাই প্রথমের দিনগুলিতে!

পূর্বাশ্রমের কথা স্মরণে অসম্মত হলেও বলেই ফেললেন, “বাহাদুর কি এখনও আছে অতুল, আমাদের বাড়িতে?” চোখের জলে ভেসে যান অতুল সেন। 

“ঘুম ভাঙলো, আজ খবর আছে!” দাদুর ডাকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম! মুখার্জি কমিশন!

ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন। সকালে নিউজ পেপার আসতেই “বর্তমান” পত্রিকাটা নিয়ে জানালার পাশে রোদে উপুড় হয়ে ঝুঁকে পড়তাম। দু’জোড়া চোখে দাদু আর আমি খুঁজতাম নেতাজির খবর। মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, লন্ডন, তাইওয়ান ছুটে বেরিয়েছে প্রাক্তন বিচারপতি জাস্টিস মনোজ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মুখার্জি কমিশন। পবিত্র ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, সমর গুহ— এইসব নাম তখন আমার কাছে পিরিয়ডিক টেবিল। মহাজাতি সদনে কমিশনের হিয়ারিং বসত। কারা কারা শপথ নিল, কি কি বলল, তাই আমার ধ্যান জ্ঞান। রাজ্য সরকার কমিশনকে গোপন ফাইল দেখতে দিচ্ছে না। সংসদে ঝড় তুলছেন সুব্রত বসু। ফৈজাবাদের সন্ন্যাসীর খবর তখন পড়েছিলাম। “এই বিচারপতি কিন্তু অন্যরকম। এবার একটা কিছু হবেই!” দাদু প্রায়ই বলতেন। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ঘোরতর সমর্থক ছিলেন। বাজপেয়ীর কবিতা, বক্তৃতা এবং নেতাজি অন্তর্ধান তদন্তে গ্রিন সিগন্যাল মোহিত করেছিল। যেদিন কমিশনের রিপোর্ট বেরোলো, আমাদের কি আনন্দ! বিমান দুর্ঘটনা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, যেন মৃত্যুর মায়াজাল ছিন্ন করে ফিরে এসেছেন নেতাজি!

অর্কুট যুগ তখন, চিরকুটের মত ছোট ছোট পোস্টে নেতাজি তদন্তের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখতাম। সম্বল ছিল বরুণ সেনগুপ্ত, সমর গুহ, পবিত্র ঘোষ, সুনীল দাস প্রমুখের বিশ্লেষণধর্মী তথ্য সঞ্চয়ন। তদন্ত কতদূর অগ্রসর হলো আর কী কী ধরনের নতুন পথ হতে পারে, এই ছিল আমার ধ্যান জ্ঞান চিন্তা। নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর প্রকাশিত সুভাষ চন্দ্রের বক্তৃতা সংকলন থেকে নির্বাচিত অংশ গড় গড়িয়ে বলতে পারতাম। “বাবার কথা” গ্রন্থ থেকে “বসু বাড়ি”, “ইতিহাসের সন্ধানে “, “মহানিষ্ক্রমণ” সবকিছু মিলেমিশে রাঙাকাকাবাবুর রাজনৈতিক চরিত্রটা মহামানবের রূপ পরিগ্রহ করে আমার মনে। নেতাজির জন্য প্রাণ দিতে পারতেন আবিদ হাসান, ভগত রাম তলোয়ার, সত্যরঞ্জন বকশিরা। প্রাণ দিতে পারতাম আমিও। তবে আমাদের প্রাণের কী বা মূল্য আছে! প্রয়োজন ছিল তথ্যের, প্রতিবাদের, যখন ছয় বছরের পরিশ্রম অগণতান্ত্রিকভাবে কংগ্রেসের মন্ত্রী শিবরাজ পাটিল ধুলিস্যাৎ করে দিলেন পার্লামেন্টে। “এটা ইমারজেন্সির থেকেও গর্হিত কাজ করল!” নেহেরু পরিবার প্রসঙ্গে দাদু একটাই কথা বলতেন, ওরা নেতাজির প্রতিপক্ষ! আর নেতাজির প্রতিপক্ষ মানে আমার মতো নেতাজির ভক্তদের প্রতিপক্ষ!

এলগিন রোডের কাছেই শরৎ বসু রোডে ছিল বাবার অফিস। বাবাই সেখানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। দণ্ড দিতেন তবে মুন্ডচ্ছেদের অর্ঘ্য আমিই। “রোজ রোজ এত নেতাজি ভবন যাওয়া কীসের?” সকালে কলেজ বাঙ্ক করে বাবার সঙ্গে অফিস। নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর প্রকাশিত পুরনো “ওরাকেল” পত্রিকা গরু খোঁজার মতো খুঁজতাম বই পাড়ায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। বাবার অফিস যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হাঁটা পথে ৩৮/২ এই এলগিন রোডের বাড়িটা মাত্র পাঁচ মিনিট। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হত দরজা দিয়ে প্রবেশ করেই! চল্লিশের দশকে ব্রিটিশ গুপ্তচররা যখন এই বাড়ির আশপাশে নানা পেশার মানুষের অছিলায় ছদ্মবেশ ধারণ করে রয়েছে, বাহাদুর দারোয়ান ছিল বসুবাড়ির প্রতিরক্ষায়। ১৯৬২ সালে নৈমিষারণ্যে তীর্থ ভ্রমণে গিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে পুরনো কংগ্রেস কর্মী অতুল সেন পেলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের সাক্ষাৎ। ঐশ্বরিক এই যোগসূত্রকে দেশনেত্রী লীলা রায় নির্দেশ করেছিলেন, “চির অসম্ভব আসে সম্ভবের বেশে!” সত্যি রহস্য কাহিনি হার মেনে যায় রোমাঞ্চকর এই সত্য আহরণে! পরিচিত অতুলের সঙ্গে এক মায়াবী খেলা খেললেন দেশনায়ক।

পূর্বাশ্রমের কথা স্মরণে অসম্মত হলেও বলেই ফেললেন, “বাহাদুর কি এখনও আছে অতুল, আমাদের বাড়িতে?” চোখের জলে ভেসে যান অতুল সেন। মুখার্জি কমিশনের রিপোর্টে এই ঘটনার কথা পড়তে পড়তে আমার চোখও বাঁধ মানেনি। “আমার ঘরের দেওয়ালে মা কালীর ছবিটা কি এখনও আছে?” নৈমিষারণ্যের ঘন জঙ্গলে জীর্ণ প্রাচীন এক শিবালয়ে বসে পর্দার আড়াল থেকে সন্ন্যাসীর এই কথাগুলো শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি অতুল সেন। মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট কলেজ জীবনেই জোগাড় করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছিলাম। এত মন দিয়ে পড়াশোনাটা করলে হয়তো মাইক্রোসফ্টেও চাকরি জুটে যেত। তবে মন দিয়ে ডাকলে ঈশ্বর না আসলেও, ঈশ্বর লাভ ঘটে। আমারও ঘটেছে। কোন নেতাজি গবেষক হতে চাইনি, নেতা হতে চাইনি। চেয়েছিলাম আমার নেতার শেষটা জানতে, জেনেছি। দেশ, জনগণ, সরকার স্বীকৃতি দিল কিনা, কিছু যায় আসে না। তিনি নিজেও তো কখনও স্বীকৃতি চাননি। তিনি নিজেই তো বলতেন, “ধন্য এই দেশ, এই সরকার! সে মরেছে কি না তাই প্রমাণ করতে লোডেড ডাইস কমিশন বসাও বারে বারে!”

১৯৫৫ সাল, পন্ডিত নেহরু পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন নেতাজির মৃত্যু নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তারপর, দেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ডা. রাধা বিনোদ পালকে সামনে রেখে বেসরকারিভাবে তদন্ত কমিশন বসাবে।

তখন নেতাজি ভবনের পিছনের দিকটায় ছিল ফাঁকা মাঠ | উপরে দো’তলার বারান্দায় তাঁর পায়ের চিহ্ন লাল কালিতে চিহ্নিত। মনে আছে, অপরিণত মানসিকতায় সেই পায়ের ছাপের ওপর পা রেখে হাঁটার চেষ্টা করতাম সেই বয়সে। সেই অগস্থ্যযাত্রীর জয়যাত্রাকে উপলব্ধির এক মরিয়া প্রয়াস। মিয়া আকবর শাহ এলেন। বাড়িতেই অফিস ঘর। রুদ্ধদ্বার কক্ষে গোপন বৈঠকে বসলেন দেশনায়ক। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ দিয়ে সেই যাত্রায় কীভাবে এড়িয়ে যাবেন ব্রিটিশের সার্ভিলেন্স, আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু তাই। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর গঠিত নতুন ভারতে সেই বাড়িতে আবার ফিরে এসেছিলেন আকবর শাহ। অতীতের সুখ স্মৃতি রোমন্থনে দুঃখের কথা শুনিয়ে যান বক্তৃতায়। রিসার্চ ব্যুরোর সৌজন্যে সেই অমূল্য স্মৃতিচারণা স্থান পেয়েছে পুরনো ওরাকল পত্রিকায়। গোগ্রাসে গিলতাম সেগুলো কলেজ জীবনে। পড়ার অভ্যেসটা আজও রয়ে গিয়েছে আগের মতই। বিশেষত বিষয়ে যখন নেতাজি!

“একটা ভালো কাজ আছে করবি?” মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়ে বাঘাযতীনের রাজাদা আমার হাতে চাঁদ তুলে দিল। অর্কুটে আমার পোস্ট থেকে পরিচয়। জানালো, দিল্লির এক গবেষক নেতাজি অন্তর্ধান নিয়ে বই লিখছেন। ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে তাঁর জন্য খবর সংগ্রহ করতে হবে। সোদপুর থেকে ২৩০ বাসে আলিপুর চিড়িয়াখানা। বড় বড় গাছ, ব্রিটিশ আমলের বিল্ডিং, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে মাত্র ৮ টাকায় রুটি আর আলুর দম পাওয়া যেত। রিপোগ্রাফি সেকশনে ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আনন্দবাজার, যুগান্তর, অমৃতবাজার সংবাদপত্রের মাইক্রোফিল্ম ঘাটার কাজের রসদ বলতে ওইটুকুই যথেষ্ট। সংরক্ষণের স্বার্থে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাঁ হাতে স্লাইড পুশ, ডান হাতে উপর নিচ রিল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাইক্রো ফিল্মে নেতাজির খবর খোঁজা। নেতাজি কোথায়?

১৯৪৫ সাল, নভেম্বর মাসে শহরে গুলি চলল আজাদ হিন্দ বিপ্লব দমনে। ১৯৪৬ সাল, নেতাজির জন্মদিবস উপলক্ষে শহরে এসেছেন শাহনাওয়াজ খান, বললেন খুব শীঘ্রই নেতাজির সঙ্গে ভারতে দেখা হবে। ডাক্তার শিশির বসু বললেন, তাঁর রাঙাকাকাবাবুর শ্রীমুখ থেকে শীঘ্রই দেশের মানুষ মহানিষ্ক্রমণের গল্প শুনবে। শার্দুল সিং কবীশ্বর বললেন, লিডারের থেকে সাংকেতিক ভাষায় কিছু কমিউনিকেশন এসেছে ঠিক যেমনটা আসত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৫০ সাল, দক্ষিণ ভারতের নেতা মথুরামালিঙ্গম থেবর বললেন, চিন দেশে নেতাজির সঙ্গে বেশ কয়েক মাস সময় কাটিয়ে ফিরেছেন। ১৯৫৫ সাল, পন্ডিত নেহরু পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন নেতাজির মৃত্যু নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তারপর, দেশের মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ডা. রাধা বিনোদ পালকে সামনে রেখে বেসরকারিভাবে তদন্ত কমিশন বসাবে। দ্রুত মত পরিবর্তন করলেন নেহরু, শাহনওয়াজ খানকে মন্ত্রীত্বের লোভে কিনে নিয়ে বসালেন প্রথম তদন্ত কমিটি। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি, শেখ মুজিব গণমাধ্যমে বললেন, বাংলাদেশ যে আজ বাস্তব এটা প্রমাণ করে নেতাজি সুভাষ বেঁচে আছেন! মহাবিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজ মুক্তি পেয়ে শহরে এলেন।

“নেতাজি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভারতেই ছিলেন! কলকাতায় তার অনুগামীরা আজও আছে।” স্কুলে থাকার সময় খবরে পড়া ফৈজাবাদের সন্ন্যাসীর সেই প্রথম সরাসরি যোগসূত্র পেলাম কলকাতায়।

খবর স্তূপ পাহাড় হয়ে জমছিল। জরুরি খবরগুলো রেপ্রোগ্রাফি করিয়ে রাজাদার হাত দিয়ে পৌঁছে দিতাম দিল্লি। “নেতাজি ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ভারতেই ছিলেন! কলকাতায় তার অনুগামীরা আজও আছে।” স্কুলে থাকার সময় খবরে পড়া ফৈজাবাদের সন্ন্যাসীর সেই প্রথম সরাসরি যোগসূত্র পেলাম কলকাতায়। কলেজ বাঙ্ক করে আমার কলেজ স্ট্রিটের কাছে টেমার লেনে জয়শ্রী পত্রিকার অফিসে আসা শুরু হল। ছোট্ট একটা ভাঙাচোরা ঘর, জেলখানার গরাদের মত একটা বড় জানলা, ঢুকতে গিয়ে দরজার উপরে লেখা “জাতীয় সাহিত্য কেন্দ্র”! নন্দলাল বসুর হাতে আঁকা ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার মনোগ্রাম, খালেদ চৌধুরীর অসাধারণ প্রচ্ছদ। ঘরের ভিতরে ৭০ ছুঁই ছুঁই তরুণ সম্পাদক শ্রী বিজয় নাগ। পরিচয় তিনি দেশনেত্রী লীলা রায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র। জয়শ্রী পত্রিকার সংস্পর্শে আমার জীবনে এলো এক নতুন অধ্যায়! সুভাষ চন্দ্রের প্রত্যাবর্তন!

“তোমাদের কাছে কেবলমাত্র সুভাষচন্দ্র হতে পারেন, আমাদের কাছে প্রথমে তিনি সৎগুরুদেব! তদন্ত কমিটি কমিশন চলতেই থাকবে। সত্যিটা কখনও বদলাবে না!”
লখনউ নিবাসী বন্ধু প্রীতম রাইয়ের সঙ্গে আলাপ হতেই উত্তরপ্রদেশ-রহস্য আরও কাছে চলে এলো। তারই সূত্র ধরে আলাপ হয় সাংবাদিক শ্রী অশোক ট্যাণ্ডনের সঙ্গে। তাঁর কারণেই উত্তরপ্রদেশে সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্রের ইতিহাস আজ ইতিহাসের কালগর্ভে হারিয়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে। জানতে পারলাম ট্যান্ডনজির লেখা “নয়ে লোগ”, “গঙ্গা” পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ এবং “গুমনামি সুভাষ “ গবেষণাধর্মী গ্রন্থের কথা। তখন ২০১১ সাল। কলেজ আর চাকরির মাঝে দোদুল্যমান সময়ে ছুটলাম ফৈজাবাদ সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্রের সন্ধানে। অশোক ট্যান্ডনজির সঙ্গে আলাপচারিতার সময় প্রতিজ্ঞা করলাম, তার গবেষণাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। সেই মতো “গুমনামি সুভাষ “ গ্রন্থের ইংরেজি এবং বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করলাম। সেখানেই হল বিপত্তি। জানতাম না, তাঁর গবেষণাধর্মী রচনাকে অস্বীকার করে সেই গবেষণার পরাগ অনুসরণ করেই রচিত হচ্ছে মহাগ্রন্থ!

(এই পর্বের লেখক সৈকত নিয়োগী)

(পরবর্তী পর্ব ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার)

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.