মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আরও ১০০টি-কে শো-কজ নোটিশ পাঠিয়েছেন। অনুমোদনহীন, ভুয়া মাদ্রাসা নিয়ে বাম আমলে কম বিপাকে পড়তে হয়নি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, বেআইনি কার্যকলাপ রোধে, শিক্ষাব্যবস্থাকে সুঠাম করতে হবে। মাদ্রাসা অভিযান দেশের মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী নয়। এমন ভাবনা একপেশে ও অতি-সরলীকৃত। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল।
নভেম্বর, ২০০০। জ্যোতি বসুকে সরিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দিল্লিতে তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি। একদিন বুদ্ধবাবু নর্থ ব্লক তঁার দফতরে এসে বললেন, ‘আচ্ছা আদবানিজি, আপনি মহারাষ্ট্র ও গুজরাত-সহ এ-দেশের বহু রাজ্যে আইএসআই তৎপরতা বৃদ্ধির কথা বলছেন। বেআইনি মাদ্রাসার মাশরুম চাষ হচ্ছে বলছেন। কিন্তু আপনি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে কিছু বলছেন না কেন? আমার কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট আসছে। রাজ্যের পরিস্থিতি খুব খারাপ।’
মুচকি হেসে দেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমার কাছেও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে তথ্য আছে। কিন্তু বলি না কেন বলতে পারেন? বললে, যদি আপনি ‘ডিনাই’ করেন। আমি চুপ করে থাকতে চাই না। জানি, পশ্চিম বাংলার কী অবস্থা! কিন্তু প্রকাশ্যে আপনি অস্বীকার করলে কার লাভ? সন্ত্রাসবাদীদেরই লাভ হবে।”
মনে পড়ে, ২০০৩ সালের ৬ মার্চ বুদ্ধবাবুর সঙ্গে উপ-প্রধানমন্ত্রীর প্রাতঃরাশ বৈঠকের কথা। সেদিন আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে বেআইনি মাদ্রাসার রমরমা।
তখন বুদ্ধবাবু খুব জোরালোভাবে বলেন, অস্বীকার করার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আপনি প্রকাশ্যে বলুন। আমিও প্রকাশ্যে বলব। পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত সীমান্তে, জাতীয়তাবাদ বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিয়ে জঙ্গিরা সক্রিয় হচ্ছে। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ চলছে। এসব বন্ধ করতে হবে।
এল কে আডবাণী তঁার আত্মজীবনী, ‘মাই কান্ট্রি, মাই লাইফ’ বইয়ে এ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন (পৃষ্ঠা. ৬৩৮)। এও লিখেছেন যে, কলকাতায় একবার বুদ্ধবাবু তঁার সঙ্গে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ নিয়ে যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করেন। বুদ্ধবাবুর আগে জ্যোতিবাবু এই অবস্থান নেননি। ’৯৮ সালে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা-বিজেপি সরকার প্রায় ৮০ জন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’-কে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাতে চায়। জ্যোতিবাবুর সরকার তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বুদ্ধবাবু তো বিধানসভায় বাজেট অধিবেশনে বলেই বসেন যে, সীমান্ত জেলাগুলির মাদ্রাসার একাংশ মৌলবাদী সন্ত্রাসের অঁাতুড়ঘর হয়ে গিয়েছে।
তবে বুদ্ধবাবু অবশ্য শেষ পর্যন্ত তঁার এই ব্যক্তিগত কঠোর অবস্থানে অটুট থাকতে পারেননি। আদবানি লিখেছেন, ‘I found a rare Communist leader, whose views on ISI-guided cross border terrorism and its ideological roots were, to a fair degree, congruent with mine.’ কিন্তু মাদ্রাসায় বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করতে গিয়ে বুদ্ধবাবু বিপদে পড়লেন। ২০০২ সালের ২৯ জুন এল. কে আডবাণী উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। এখনও মনে পড়ে, ২০০৩ সালের ৬ মার্চ বুদ্ধবাবুর সঙ্গে উপ-প্রধানমন্ত্রীর প্রাতঃরাশ বৈঠকের কথা। সেদিন আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে বেআইনি মাদ্রাসার রমরমা। পাক সন্ত্রাসবাদীরা কীভাবে এসব মাদ্রাসায় জঙ্গিঘঁাটি তৈরি করছে– তা নিয়ে।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বুদ্ধবাবু তো বিধানসভায় বাজেট অধিবেশনে বলেই বসেন যে, সীমান্ত জেলাগুলির মাদ্রাসার একাংশ মৌলবাদী সন্ত্রাসের অঁাতুড়ঘর হয়ে গিয়েছে। ব্যস! বুদ্ধবাবুর বিরুদ্ধে জামাত বাহিনী প্রতিবাদে মুখর হয়! পার্টি বিরক্ত হয়। বুদ্ধবাবু শিলিগুড়ি গিয়েও একই কথা বলেন। তখন বিমান বসু বলেন, বুদ্ধর বক্তব্য সংবাদপত্রে বিকৃত করা হয়েছে। মাদ্রাসা বন্ধ হবে না।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ‘বেআইনি’ মাদ্রাসা নিয়ে কখনও কোনও মন্তব্য করেননি। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সংসদে জানায়– বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু মাদ্রাসায় জঙ্গি কার্যকলাপের খবর আছে। বিধানসভায় এ ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কেন্দ্র আমাদের কাছ থেকে মাদ্রাসার ছাত্রদের জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে জানতে চায়। আমরা কেন্দ্রকে জবাব দিয়েছি। কিন্তু কেন্দ্র আমাদের জবাবকে গ্রহণ করে না! ওদের কথাই ওরা বলে। মমতা বলেন, বিজেপি সবকিছুতে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে।
একইভাবে ২০১৫ সালে মমতা বলেছিলেন, যেসব মাদ্রাসা নথিভুক্ত নয়, যারা টাকা পায় না, তাদেরও স্বীকৃতি দেব আমরা। ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে মাদ্রাসা সমীক্ষা করার ব্যাপারে মমতা বলেছিলেন, ওদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতিসাধন দরকার, কিন্তু ওদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নাক গলাব না। অতীতের কাহিনিতে ইতি টেনে এবার বর্তমানের কথা বলি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় এসেই ‘বেআইনি’ মাদ্রাসা নিয়ে সমীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, অনেক রেজিস্ট্রিভুক্ত মাদ্রাসাতেও ছাত্র নেই, শিক্ষক নেই। যেমন: হুগলির হরিপালে মাদ্রাসার জমিতে কলাবাগান ভূতুড়ে বাড়ি। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরেও এমন মাদ্রাসার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ‘বেআইনি’ মাদ্রাসা নিয়ে কখনও কোনও মন্তব্য করেননি। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সংসদে জানায়– বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু মাদ্রাসায় জঙ্গি কার্যকলাপের খবর আছে।
শুভেন্দু যা বলছেন, যা করছেন, সেটি নতুন কোনও রকেট সায়েন্স নয়। এ তো বিজেপির সুপ্রাচীন মতাদর্শগত অবস্থান। মনে করুন, ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগেও বাংলায় এসে নরেন্দ্র মোদী ‘সীমান্তে অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন। মোহন ভাগবত তথা সংঘ পরিবারও চিরকাল এ বিষয়ে বলেছেন।
মাদ্রাসার শিক্ষাপ্রদান একটি সুপ্রাচীন বিষয়। ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত কারণে হজরত মহম্মদের সময় থেকে মদিনায় শুরু হয়। দশম শতাব্দীতে বাগদাদে মাদ্রাসা আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়। আরবি ভাষায় ‘মাদ্রাসা’ শব্দের অর্থই হল– শিক্ষাক্ষেত্র। কিন্তু এই শিক্ষার আড়ালে যদি সন্ত্রাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে সেই দেশবিরোধী কাজকে কীভাবে সমর্থন করা যায়?
বাজপেয়ী ও আডবাণী জুটি যা করতে পারেনি, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে মোদি ও শাহ জুটি যা করতে পারেনি, এখন যদি কেন্দ্রের সহায়তায় শুভেন্দু সরকার তা করতে সক্ষম হয়, তবে তাঁকে তো দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেকের সমর্থন জানান প্রয়োজন। ১৯৯৩ সালে ১৫ মার্চ মুম্বই বিস্ফোরণের পর পশ্চিম উপকূলবর্তী এলাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় ‘আইএসআই’ কৌশল বদলে পূর্ব উপকূলবর্তী এলাকায় জোর দেয়! বাংলাদেশকে ‘বাফার’ বানিয়ে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চল, বিশেষত বাংলা সীমান্ত দিয়ে, জঙ্গি অনুপ্রবেশ করানোর কৌশল নেয়। কঁাটাতারবিহীন সীমানা দিয়ে জঙ্গি ঢুকে দেশের নানা প্রান্তে এমনকী কাশ্মীরে পর্যন্ত যেতে শুরু করে। এখন রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে সন্ত্রাসদমনে যদি শুভেন্দু সরকার সফল হয়, তাতেই বাংলার মঙ্গল। প্রয়োজন ঐকমত্য।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর ১০০টি মাদ্রাসায় শো-কজ নোটিশ পাঠিয়েছেন। রাজ্যজুড়ে যে-সমীক্ষা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে, সরকারি রেজিস্ট্রেশনের বাইরেও রয়েছে বেশ কিছু ‘ভুয়া’ মাদ্রাসা, যাদের অনুমোদন নেই, পরিকাঠামো নেই– অথচ তারা স্বঘোষিত মাদ্রাসা চালাচ্ছে। সেখানে কী হয় বা না হয়, তা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন। এবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে, সমীক্ষায় করে, কোনটি ‘বৈধ’ আর কোনটি ‘অবৈধ’– তার বিচার করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন, একটাই রাষ্ট্র, তাতে একটাই শিক্ষাব্যবস্থা থাকা উচিত। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ২০০২ সালে যে-কাজ করতে পারেননি, ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারী সেই রাস্তায় বলিষ্ঠ পদক্ষেপ করছেন।
এ দেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার শিকড় অনেক গভীরে। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার জন্য মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদ, না কি মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ব্যবহারের জন্য হিন্দুত্বের আন্দোলনের বিকাশ মাথাচাড়া দিয়েছে– এই বিতর্ক এখনও। কিন্তু এই মাদ্রাসা অভিযান কোনওভাবে দেশের মুসলমান-বিরোধী অভিযান নয়। এমন মনে করলে তা হবে অতি-সরলীকরণ। মনে রাখতে হবে, ‘অবৈধ’ মাদ্রাসায় যদি ‘সন্ত্রাসবাদী’ কার্যকলাপের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এবং সে-বিষয়ে গোয়েন্দারা যদি প্রামাণ্য তথ্য দেন, তবে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেও জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘ব্রিক্স’ সম্মেলনেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। কিছু দিন আগে সাংহাই কো-অপারেশনের বৈঠকেও কার্যত পাকিস্তানকে কাঠগড়ায় দঁাড় করিয়ে তিনি বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দু’-মুখো নীতি রাখা চলবে না। একদিকে সন্ত্রাসদমনের কথা বলা হবে, অন্যদিকে সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্য গড়ে তোলা হবে– ভারত এমন নীতির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। ফলে শুভেন্দু অধিকারী যে-কথা বলছেন, বা যা করছেন, তা প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাসদমন নীতির সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্য রক্ষাকারী।
(মতামত নিজস্ব)
সর্বশেষ খবর
-
প্রতীকের পর প্রার্থীও খোয়ালেন মমতা, নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে নাম তুললেন সঞ্চিতা
-
জুম্মাবারের প্রার্থনার সময় আত্মঘাতী হামলা! পাকিস্তানে বিস্ফোরণে হত ১৫, আহত বহু
-
জন্মহার তলানিতে, শতায়ু বাড়ছে হু হু করে! জাপানে ১ লক্ষের বেশি মানুষ পেরিয়েছেন সেঞ্চুরি, রহস্য কী?
-
হাউথিদের সঙ্গে চুক্তি আমেরিকার, ভয়ংকর যুদ্ধে সৌদি আরবকে ‘চোরাবালি’তে ফেললেন ট্রাম্প
-
ভক্তের পায়ের উপর দিয়ে চলে গেল সলমনের গাড়ির চাকা, চালককে জোর ধমক ভাইজানের