সমুদ্রের বিপুল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে মৎস্য আহরণ ও সমুদ্র অর্থনীতির প্রসারই হতে পারে ‘বিকশিত ভারত’-এর পথে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
সি. পি. রাধাকৃষ্ণন: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্ব ভারতের বিকাশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে– সকলের সঙ্গে সকলের বিকাশ, সকলের বিশ্বাস, সকলের প্রয়াস। বিগত ২৫ বছরে কোটি কোটি মানুষের, বিশেষত প্রান্তিক মানুষের জীবনকে স্পর্শ করেছেন তিনি। উন্নয়নের ক্ষেত্রে তঁার দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ এক উদাহরণ হয়ে রয়েছে। পিছিয়ে পড়া জেলাগুলিকে তিনি বলেছেন, ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী জেলা’, সীমান্তের গ্রামগুলিকে বলেছেন ‘প্রাণবন্ত ও অগ্রবর্তী গ্রাম’ এবং উত্তর-পূর্ব’কে বলেছেন ‘অষ্টলক্ষ্মী’। ভৌগোলিক দিক থেকে প্রান্তিক অঞ্চলগুলিও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুবাদে বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে বলীয়ান হয়ে উঠছে। ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার স্বপ্নের দিশায় এগিয়ে চলেছে দেশ। পিএম-জনমন, পিএম-জনধন, পিএম-গরিব কল্যাণ যোজনা এবং অন্য আরও নানা প্রকল্প সর্বাত্মক উন্নয়ন এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের বিষয়ে তঁার দায়বদ্ধতাকেই তুলে ধরে। ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার উপরে উঠে এসেছে– যা কেবল ভারতের নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার যাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এমন দিন নিশ্চয়ই আসবে, যখন সমগ্র পৃথিবী দারিদ্র ও ক্ষুধার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল– সমুদ্র অর্থনীতির প্রতি অগ্রাধিকার। ছয়ের দশকে, সবুজ বিপ্লবের সময়ে আমরা ক্ষুধার সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পেরেছি। ধান, গম, ডাল ও মিলেট উৎপাদনে বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে ভারত এখন রয়েছে প্রথম সারিতে। সারা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে এই দেশ। সবুজ বিপ্লবের পরে শ্বেত বিপ্লব দেশে দুধের ঘাটতি মিটিয়েছে এবং ডেয়ারি পণ্যের রফতানির নির্ভরতা মুছে দিয়েছে। ভারত এখন দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে সকলের আগে এবং সেজন্যই দেশের মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে প্রোটিনের ঘাটতি বিপুল পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে।
নীল বিপ্লব আর-একটি সাফল্যের অধ্যায় হতে চলেছে। আমাদের দেশকে পূর্ণ করে দিয়েছে প্রকৃতি। এদেশের উপকূল রেখা ১১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ। নৌ-চালনা ও নৌ-বাণিজ্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে ভারতে। ২৪ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে আমাদের। সমুদ্র সম্পদের একটি বড় অংশ রয়েছে আমাদের হাতে। কিন্তু, দশকের পর দশক ধরে এই সম্পদের ব্যবহার হয়েছে খুবই কম মাত্রায়। সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণের কাজ এক সময় কেবলমাত্র উপকূলের নিকটবর্তী অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন আমরা সেই সীমা ভেঙে ফেলছি। সমুদ্র পরিসরে নিজস্ব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আরও গভীর সমুদ্র টুনা ও অন্য নানা মাছের বড় উৎস।
২০১৯ সালে মৎস্যচাষ, পশুপালন এবং দুগ্ধ উৎপাদন মন্ত্রক প্রতিষ্ঠার সুবাদে এই ক্ষেত্রটি প্রত্যক্ষভাবে মোদিজির নেতৃত্বের সুফল ভোগ করার অধিকারী হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, আমাদের জাতীয় পতাকার নীল চক্র নীল বিপ্লব বা সমুদ্র অর্থনীতির প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট করে তোলে।
বিগত দশকে মৎস্য ও জলজ চাষ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম উদীয়মান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সারা বিশ্বে মাছ উৎপাদনে ভারতের স্থান দ্বিতীয়– ৮ শতাংশ অবদান রয়েছে এই দেশের। রুটিরুজির বিষয়ে এই ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল প্রায় ৩ কোটি মৎস্যজীবী। আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় এই ক্ষেত্রের গুরুত্ব এখন অনেকটাই। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে ভারতের মৎস্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯৫ লক্ষ টন।
পরিবেশবান্ধব মৎস্য উৎপাদন
সম্প্রতি আমি মৎস্যচাষ, পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদন মন্ত্রকের দু’টি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এর একটি হল– ওড়িশায় গভীর সমুদ্রে পরিবেশবান্ধব মৎস্য আহরণ এবং ভারতের পতাকা লাগানো জলযানগুলিকে এই কাজের জন্য অনুমতিপত্র প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত সমারোহ। অন্যটি, লাক্ষাদ্বীপে মৎস্যচাষিদের সঙ্গে আলাপচারিতা। ওড়িশায় গভীর সমুদ্রে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে মৎস্য আহরণ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় মৎস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ উৎপাদন মন্ত্রকের একটি উদ্যোগের উদ্বোধন করেছিলাম। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার এবং ওড়িশা সরকার, আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং মৎস্যজীবীদের যৌথ উদ্যোগ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আমি বিশ্বাস করি যে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের দেশের ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান বিনিয়োগ। গত মাসে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে আমি প্রথমবার লাক্ষাদ্বীপ যাই। সেখানে দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনার আওতায় মৎস্যচাষ সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৫-’২৬ সালে গভীর সমুদ্র এবং আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অব্যবহৃত সম্পদকে কাজে লাগাতে উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে, আমাদের মৎস্যজীবীরা তঁাদের কর্মকাণ্ড আরও প্রসারিত করতে সক্ষম হবেন। সমুদ্র পরিসর ভারতের বিকাশে নতুন অধ্যায় রচনা করতে চলেছে। যে কোনও দেশই সমৃদ্ধ হয় যখন সেখানকার মানুষ নতুন নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোয় প্রত্যয়ী ও সাহসী হয়ে ওঠে।
যে বিষয়টি আরও উল্লেখযোগ্য, তা হল– এই কাঠামোয় মৎস্যজীবীদের অধিকারকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মৎস্য আহরণ বিধি এবং গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ সম্পর্কিত ২০২৫ সালের নির্দেশিকা ভারতের উন্নয়নের যাত্রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এর মাধ্যমে মৎস্যচাষিদের সমবায়, মৎস্যচাষি উৎপাদক সংগঠন এবং সর্বোপরি ভারতীয় মৎস্যজীবীদের নতুন নতুন পরিসরে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। লাক্ষাদ্বীপের আয়তন ৩২ বর্গ কিলোমিটার। সেখানকার তটরেখা ১৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। এছাড়াও সেখানে রয়েছে– ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি হ্রদ। ওই দ্বীপপুঞ্জে জলাভূমির মোট আয়তন ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। পাশাপাশি সমুদ্র পরিসরে রয়েছে– ৪ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সমুদ্র পরিসরে ভারতের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের এক-ষষ্ঠাংশই রয়েছে লাক্ষাদ্বীপে। সবমিলিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে– ব্যক্তিগত প্রয়াসে সমৃদ্ধি সম্ভব, আর একত্রিত প্রয়াসে সূচনা হয় রূপান্তর পর্বের।
সমুদ্র অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
ভারতের সিফুড রফতানি হয় ২০টিরও বেশি দেশে। গত অর্থবর্ষেই এর রফতানির মোট মূল্যমান ৭৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা ২০১৩-’১৪ সালের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হচ্ছে ভারতীয় সিফুড। তবে, আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখনও আসেনি। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ সংক্রান্ত উদ্যোগ এক্ষেত্রে রফতানি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
ডিজিটাল অনুমোদন প্রণালী, জলযান ট্র্যাকিং, আন্তর্জাতিক শংসা এবং অন্য নানা উপযোগী পদক্ষেপ বিশ্বের বাজারে ভারতীয় সিফুডের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তবে, উন্নয়ন যেন পরিবেশের হানি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। হাজার হাজার বছর ধরে মানবসভ্যতাকে লালনপালন করেছে সমুদ্র। তাকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। পরিবেশবান্ধব পন্থায় মৎস্য আহরণ ও উৎপাদন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের নতুন নির্দেশিকা এক্ষেত্রে ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধির উপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং বেআইনি ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণের বিরোধিতা করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে তুলে আনা মৎস্য সম্পদ, তার প্রক্রিয়াকরণ, হিমঘর ব্যবস্থাপনা, পরিবহণ, প্যাকেজিং এবং রফতানি বহু মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। প্রক্রিয়াকরণ ও মূল্য সংযোজনে মহিলাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের কার্যকর রূপায়ণ উপকূলবর্তী ভারতের অর্থনৈতিক জীবনধারাকে আরও শক্তিশালী করবে।
Viksit Bharat @ 2047– এর লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছি আমরা। এই স্বপ্নপূরণে সমুদ্র অর্থনীতির প্রসার একটি আবশ্যিক শর্ত। নীল বিপ্লবের যাত্রায় এই পরিসরের প্রতিটি ক্ষেত্রেরই বড় ভূমিকা রয়েছে। আমি আনন্দিত যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে মৎস্যচাষ মন্ত্রক নীল বিপ্লবের বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিকাশের নতুন অভিমুখে আমাদের যাত্রাকে চালিত করছে।
Viksit Bharat @ 2047 হয়ে উঠবে এমন এক ভারত, যেখানে প্রতিটি অঞ্চল এবং সমাজের প্রতিটি অংশ অর্থনৈতিক বিকাশের অংশীদার। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার বার্তা এই যে, মৎস্যচাষ ও মৎস্য আহরণকে পারিবারিক পেশা হিসাবে না দেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-ভিত্তিক এবং সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র হিসাবে দেখা দরকার। উপযুক্ত তথ্য, প্রযুক্তি এবং আর্থিক সংস্থানের মাধ্যমে মৎস্যজীবীদের সহায়তায় অবিচল থাকতে হবে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলিকে। দৃঢ় ও প্রত্যয়ী পদক্ষেপে এগলে ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চল সমৃদ্ধির আলোয় উদ্ভাসিত হবে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘বন্ধুত্বের বন্ধন…’, জন্মদিনে ‘বন্ধু’ মোদিকে মিষ্টি শুভেচ্ছা মেলোনির
-
অন্নপূর্ণার টাকায় উমা আরাধনা, চাঁদা না নিয়েই অসাধ্যসাধন বাংলার ‘দুর্গা’দের
-
পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা যোজনা দর্জি-ক্ষৌরকারদের! তৃণমূল সরকারকে দুষে শুভেন্দু বললেন ‘পরিযায়ী বিশ্বকর্মাদের রাজ্যে ফেরাব’
-
এখনও হয়নি প্রতীক-সিদ্ধান্ত! ঝুলেই উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ, কী মত দু’পক্ষের?
-
জর্ডন থেকে ১ পয়েন্ট, ঘরের মাঠে ইরাকের ক্লাবের বিরুদ্ধে নামার আগে আত্মবিশ্বাসী ইস্টবেঙ্গলের রামিরেজ