একদিকে দেশে জন্ম রেকর্ড তলানিতে, অন্যদিকে ১০০ বছর পেরনো মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। জাপানের জনসংখ্যার ছবিতে এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
জাপানে ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা এখন ১ লক্ষ ৭ হাজার ৬৭৭। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাব বলছে, মাত্র এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে ৭,৯১৪। শতায়ুদের প্রায় ৮৮ শতাংশই মহিলা। দীর্ঘায়ুর দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম নজির তৈরি করা জাপানে তাই প্রশ্ন উঠছে, এত দীর্ঘ জীবন পাওয়ার পিছনে আসল রহস্যটা কোথায়?
পরিসংখ্যানটি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন জাপান পালন করছে প্রবীণদের সম্মানে বিশেষ দিন ‘রেসপেক্ট ফর দ্য এজেড ডে’। কিন্তু দীর্ঘায়ুর এই সাফল্যের পাশেই রয়েছে জনসংখ্যার আরেকটি উদ্বেগজনক ছবি। ২০২৫ সালে জাপানি নাগরিকদের মধ্যে জন্মের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৬ লক্ষ ৭১ হাজার ২৩৬-এ, যা নতুন সর্বনিম্ন রেকর্ড। ফলে একদিকে বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা, অন্যদিকে কমছে নতুন প্রজন্মের সংখ্যা।

প্লেটে কী থাকে?
জাপানিদের দীর্ঘায়ুর আলোচনায় সবার আগে আসে খাদ্যাভ্যাস। মুকোগাওয়া উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ওয়ার্ল্ড হেলথ ডেভেলপমেন্ট-এর ডিরেক্টর ডা. ইউকিও ইয়ামোরির মতে, দীর্ঘ জীবনের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে জাপানি খাবারের ধরন।
দ্বীপদেশ হওয়ায় মাছ ও সামুদ্রিক খাবার জাপানিদের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে। ফলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পাশাপাশি সামুদ্রিক খাবার থেকে ম্যাগনেশিয়াম ও টরিনও পাওয়া যায়। ভাত এবং সয়া-ভিত্তিক খাবারও জাপানি খাদ্যসংস্কৃতির অঙ্গ। তুলনামূলক কম কোলেস্টেরলযুক্ত এই খাদ্যাভ্যাস হৃদ্রোগের ঝুঁকি কম রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে নুনেই সমস্যা
জাপানি খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাও রয়েছে। সয়া সস, মিসো এবং অন্যান্য নোনতা উপাদানের কারণে সোডিয়াম গ্রহণ অনেক সময় বেশি হয়ে যায়। একই সঙ্গে দুগ্ধজাত খাবার তুলনামূলক কম খাওয়ার কারণে ক্যালশিয়াম গ্রহণও কম হতে পারে।
জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির পার্থক্যও এই বিষয়টিকে সামনে আনে। ডা. ইয়ামোরির উল্লেখ করা আঞ্চলিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেশি নুন খাওয়ার প্রবণতা থাকা আওমোরি প্রিফেকচারে স্ট্রোক ও পাকস্থলীর ক্যানসারে মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে কম নুন খাওয়ার অঞ্চল ওকিনাওয়ায় পরিস্থিতি আলাদা।

‘থ্রি এস’-এর সূত্র
দীর্ঘায়ুর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক বোঝাতে ডা. ইয়ামোরি দিয়েছেন ‘থ্রি এস’ সূত্র। তাঁর পরামর্শের মূল কথা হল, নুন কমাতে হবে, সামুদ্রিক খাবার বাড়াতে হবে এবং সয়া বেশি রাখতে হবে। সয়া-জাতীয় খাবারে থাকা আইসোফ্লাভোন নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। এই উপাদান কোষের স্বাভাবিক পুনর্গঠন এবং ক্যানসারের বিরুদ্ধে শরীরকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
হাঁটাচলা, পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ
তবে শুধু প্লেটে কী রয়েছে, তা দিয়েই দীর্ঘায়ুর পুরো গল্প লেখা যায় না। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘায়ুপ্রবণ জনসংখ্যা হংকংয়ের উদাহরণ টেনে ডা. ইয়ামোরি দেখিয়েছেন, সেখানেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং পরিবারের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসের কারণে দৈনন্দিন চলাফেরাতেও শরীর সক্রিয় থাকে।
অর্থাৎ, শতায়ু হওয়ার কোনও একক ‘ফর্মুলা’ নেই। বরং খাবারে সংযম, বেশি মাছ ও সয়া, কম নুন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পরিবারের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের ভিত গড়ে দিতে পারে। আর জাপানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই। দীর্ঘ জীবন শুধু কত বছর বাঁচলাম, তার হিসাব নয়। সেই বছরগুলো কতটা সক্রিয়, সুস্থ ও অর্থপূর্ণভাবে কাটল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ খবর
-
অখিলেশের ‘চার আনা’ মন্তব্যই ঘুরিয়ে দেবে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন! কোন পথে জাঠ মন?
-
হরমুজে সেনা মোতায়েনে আমেরিকাকে ‘না’ দক্ষিণ কোরিয়ার! ট্রাম্পের ‘চাপ’ উড়িয়ে দিল সিওল
-
শিশুখাদ্যেও বিষ? এবার নেসলের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ, নোটিস পাঠাল কেন্দ্র
-
বিপর্যয়ের আতঙ্ক! পুজোর পর্যটনে উত্তরকে টেক্কা দক্ষিবঙ্গের, জঙ্গলমহলও ‘হাউসফুল’
-
নন্দীগ্রাম ভোটে কংগ্রেসকে সমর্থন ‘সর্বহারা’ মমতার, জল্পনা উসকে বললেন, ‘সিস্টার পার্টি’