গুমনামি বাবাই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।
এই মুহূর্তে সে সবই স্মৃতি! একের পর এক দৃশ্যেরা ভেসে ওঠে তুলসি সংগ্রহালয়ের ঘরে। ধুলো জমতে থাকে চিঠি, বইপত্রে। সামরিক পোশাকের জীর্ণ দশায় হৃতপ্রায় পরিচয়, যা অবলম্বন করে ভেসে থাকে চুপকথারা স্মৃতির মলিনপটে। সেই সমস্ত স্মৃতিকথা সত্য প্রমাণের আঙ্গিকে ইতিহাস হয়ে উঠবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে। সে দায় ইতিহাসেরই।
নৈমিষারণ্য! চারিদিকে জঙ্গল, এক আদিম রহস্যময়তা। আজও যেন সেই আদিম রহস্যময়তার অনুভূতি ধরে রেখেছে নিজের কাছে। এখানেই এসেছিলেন বিপ্লবী দেশনেত্রী লীলা রায়। কার সন্ধানে? দেশনায়কের সন্ধানে। কংগ্রেস নেতার অতুল সেন এসেছিলেন তীর্থযাত্রী হয়েই, ঈশ্বরকে পেলেন জরাজীর্ণ শিবালয়ে! কোন এক অজানা কারণে দেশের প্রতি নীরব অভিমানে তাঁর কথায় সাড়া দেননি। অবহেলায় ফিরিয়েছেন দেশনেত্রীর প্রত্যাবর্তনের ডাক! তবু দেশনেত্রী তাঁর কর্তব্য থেকে পিছু হটেননি। নিয়ে এসেছেন এক রহস্য-যুগ, যেখানে পুরনো দিনের বিপ্লবীরা অতীতের আগুনে পুড়তে ছুটে এসেছেন সন্ন্যাসীর গোপন ডেরায়, ফিনিক্স পাখির মতো।
আরও পড়ুন:
নবরাত্রিতেই সন্ন্যাসীর পূর্বজীবনের সংস্পর্শীরা আসতেন এখানে।
ষাটের দশক। উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর জেলার পুণ্যতীর্থ নৈমিষারণ্যে এক পুরনো শিবমন্দির। খসে পড়া দেওয়াল, দেওয়ালের বুক চিরে ওঠা অশ্বত্থ-বটের প্রশাখায় কাঁকড়া-বিছে আর সাপের সহাবস্থান। পাশেই প্রাচীন পৌরাণিক চক্রতীর্থ। প্রাচীন উপকথায় বলে, একসময় ঋষি-মুনিরা দেবতাদের কাছে এমন একটি পবিত্র স্থান প্রার্থনা করেছিলেন, যেখানে তাঁরা নির্বিঘ্নে যজ্ঞ ও তপস্যা করতে পারবেন। তখন দেবতারা তাঁদের সামনে একটি চক্র নিক্ষেপ করেন এবং নির্দেশ দেন— যেখানে সেই চক্রের ‘নেমি’ বা চক্রের বাইরের অংশ থেমে যাবে, সেই স্থানেই তপস্যার জন্য উপযুক্ত পবিত্র ক্ষেত্র হবে। দৈবস্পর্শের সেই চক্র থেমেছিল এখানেই।
সেই থেকেই এই স্থান ‘নৈমিষারণ্য’ নামে পবিত্র হয়ে ওঠে। চক্রতীর্থের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গোলাকার পবিত্র জলাশয়। জলাশয়ের চারপাশে মন্দির, ঘাট এবং ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। ভোরের আলোয় যখন তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে স্নান করেন, মন্ত্রোচ্চারণ করেন এবং দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করেন, তখন গোটা পরিবেশে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়। বছর দুয়েক আগে এই পবিত্র জলাশয়ের পাশে শ্রী বদ্রিনারায়ণ ধাম মন্দিরের পুনর্নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়। পুরোহিত হরপ্রসাদ দীক্ষিতের আমন্ত্রণে সেদিন সেখানে চুপিসারে এসেছিলেন রহস্যময় সন্ন্যাসী। এমনিতে পর্দার আড়ালে থাকতেন, বিশেষ অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর সাক্ষাৎ পাননি। তবে রাতের অন্ধকারে বের হতেন পরিক্রমায়। নিশুতি রাত। রূপালি চাঁদের আলোয় মায়াবী পৃথিবীতে ছায়ামূর্তির নিঃশব্দ পদচারণা না-ফেরা দেশে।

কাছাকাছিই রয়েছে শক্তিপীঠ ললিতা দেবী মন্দির। পুরাণকথা অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব যখন তাঁর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয়নৃত্যে মগ্ন হন, তখন বিশ্বকে রক্ষা করতে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করেন। এখানে সতীর হৃদয় পড়েছিল বলে জানা যায়। ললিতা দেবীকে এখানে আদিশক্তির এক বিশেষ রূপ হিসেবে আরাধনা করা হয়। মন্দিরের সঙ্গে নৈমিষারণ্যের সামগ্রিক পৌরাণিক ঐতিহ্য গভীরভাবে যুক্ত। কথিত আছে, দেবতাদের প্রার্থনায় দেবী এই তপোবনে আবির্ভূত হয়ে ঋষি-মুনিদের রক্ষা করেছিলেন। সেই থেকেই নৈমিষারণ্যে তাঁর আরাধনা চলে আসছে। মন্দিরে দেবীর মূর্তিকে ঘিরে ভক্তদের গভীর আবেগ। বিশেষ করে নবরাত্রি, দুর্গাপূজা এবং অন্যান্য শুভ তিথিতে এখানে বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তসমাগম হয়। দেবীর কাছে ভক্তরা সংসারের বাধা-বিপত্তি দূর হওয়া, পরিবারে শান্তি এবং মনস্কামনা পূরণের জন্য প্রার্থনা করেন। নবরাত্রিতেই সন্ন্যাসীর পূর্বজীবনের সংস্পর্শীরা আসতেন এখানে। সাধনার স্তর অতিক্রম করে জননেতা সাধক হয়েছেন। পুরনো স্মৃতিমাণিক্যেই জীবনসুধা।
“আমি এক দশনামী সন্ন্যাসী! আমার পূর্বাশ্রমের কথা স্মরণ করা নিষিদ্ধ।
“স্বাধীনতার দাম দিয়েছো কি? দাওনি! ত্যাগ করোনি! তোমরা ত্যাগীদের ত্যাগ করেছ ! তাম্রপদকে মুছে ফেলতে চেয়েছ, দেশভাগের খুন! Mother Kali will take her revenge!”
পর্দার আড়াল থেকে দৈব্যাদেশের মতো ভেসে এল দেশনায়কের কন্ঠস্বর। যেন অব্যর্থ লক্ষ্যে ছুটে এল বুলেট, পেনাঙে স্বরাজ ট্রেনিং স্কুলের মাঠে। প্রৌঢ়ত্বে এসেও সচকিত হলেন সেকালের আইএনএ সিক্রেট সার্ভিস অফিসার ডা. পবিত্রমোহন রায়। লিডার বলেছিলেন, স্বাধীন ভারতে দেখা হবে। কিন্তু সেই দেখা যে এমনও হতে পারে, বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল তাঁর!
“সুভাষবাবু!” গলা কেঁপে উঠল ডা. রায়ের। মধ্যপ্রদেশের শিওপুর্কালান, উত্তর বঙ্গের শৌলমারি, দক্ষিণভারত—যেখানেই রটেছে তিনি আছেন, দ্রুত ছুটে গিয়েছেন নেতাজির এই গুপ্তচর ডাক্তারবাবু। ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরেও লিডারের প্রতি আনুগত্যে এতটুকু চিড় ধরেনি তাঁর। পবিত্র আসবেই! এই বিশ্বাস কি সন্ন্যাসীরও ছিল না? আন্তরিকভাবে খাঁটি ভক্তের সন্ধান তো ভগবানও করেন!
“আমি আর আগের মতো নেই, পবিত্র! তুমি আর ওই নামে আমাকে ডেকো না ।” লিডারের গলায় আবেগের বারি শুকিয়ে গিয়েছে ঘোর বাস্তবতায় । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের তর্পণে হারিয়েছে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন।
পর্দার আড়াল রেখেই বললেন পবিত্র। জীবনের সব সাফল্য দেবতার পায়ে অর্ঘ্যরূপে অর্পণ করে ত্যাগীর যাপনচিত্রে জীবন মিলিয়ে দিতে প্রস্তুত সে। আর কোন মোহ নেই, নেই মায়ার বন্ধন। ঘর সংসার জৈবিক প্রয়োজন রহিত এক যন্ত্র-সত্তা পবিত্র!
“ভগবানজী! জনগণ বলছে, আপনি-ই আমাদের হৃত দেশনায়ক! তবে কেন আপনি সামনে আসতে চান না!” সিক্ত নয়নে এ প্রশ্ন করলেন। নীরব চারণিকপর্বে সে শ্রোতা মাত্র। অবাধ তার কলমে বন্দি হচ্ছে সময় ও অমৃতবাণী!

“আমি এক দশনামী সন্ন্যাসী! আমার পূর্বাশ্রমের কথা স্মরণ করা নিষিদ্ধ। My coming out will not be in nation’s interest! আর দেশনায়ক? লগটেবিল খতিয়ে দেখো, বিমানটির কোনও হদিশ নেই। আজ তোমরা তাঁর কথা বলছো? কার কথা, যাকে নিজেরাই মেরে ফেলেছো? এই ‘মৃত ভূত’ নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছে! রাশিয়ান গুলাগে দেখেছে মৃত্যুর শীতলতা! নগ্ন অভুক্ত দেহ, জীবন ফিরে পেতে খুঁড়ছে কবর। সে জানেও না, বরফ মাখা মাটিতে লেখা তারই নামে মৃত্যুপরোয়ানা!
দেবীর চরণতলে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপশিখাটি মহামানব তুলে ধরলেন।
জেনারেল ডেথ! কে সে? শুনেছো কখনও তার নাম? অদৃষ্টের অশেষ মহিমা, শূন্য তব সিংহাসন! তোমরা স্বামীজির পূজো করো, কখনও তাঁর মত হতে চেষ্টা করেছ? করোনি! প্রাণের মায়া প্রাণাধিক, তাই না? ফিরে যাও পবিত্র। আমাকে আর মনে রেখো না!”
মহামানব ক্ষণিকের বিরাম নিলেন। দেওয়ালে টাঙানো তাঁর আরাধ্যা দেবী, মা কালীর বাঁধানো ছবি। এতগুলো বছরে, কত কি পালটে গিয়েছে। সে নিজেও কি পালটে যায়নি? পারিবারিক অ্যালবামের দিকে চেয়ে, সকলের অগোচরে মৃদু হাসেন তিনি। মহাকালের এ কেমন লীলা! কালের নিয়মে চলে ভর্ৎসনা। সময় মনে রাখে না। কিন্তু পবিত্র-সহ পুরনো অফিসার, অনুগামীরা বসে থাকে পর্দার ওপারে। মিনিট, ঘণ্টা, দিন কেটে যায় । স্থাণুবৎ তারা বসে থাকে পাষাণ বিগ্রহের চরণতলে। তারপর একদিন পাথরের মন গলে। দেবীর হৃদয়ে পড়েছিল নৈমিষারণ্যে। সন্ন্যাসীর হৃদয়ে কি তাই ওঠে অনুরণন? সব হারিয়ে প্রাণের মানুষদের ফিরে পাওয়ার আনন্দ! পরিবারিক সুখ যে নেহাৎই তুচ্ছ।
দেবীর চরণতলে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপশিখাটি মহামানব তুলে ধরলেন। “আজ তোমরা যারা এখানে সমবেত হয়েছ, শপথ করো—যা জেনেছ, অনুভব করেছ, কক্ষণও কোথাও প্রকাশ করবে না! মন্ত্রগুপ্তির এই প্রাথমিক প্রতিজ্ঞাটুকু তোমরা প্রাণ দিয়ে রক্ষা করবে! নইলে আমার দেখা আর কখনও পাবে না!”
“তোমরা এবার এসো। আমার সাধনার সময় হয়ে এল। তোমাদের ফেরার ট্রেন তো সাতটায়।”
“হে মহামানব! আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম!” পর্দার এপাশে থাকা মানুষগুলো পবিত্রের অচেনা। বেশ কয়েকজন কলকাতার। তবে তাঁদের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে, এরা সর্বত্যাগী সুভাষচন্দ্রের লোক। এ শপৎবাক্য, যুগান্তর দলের অঙ্গীকারবদ্ধতার মতোই, মৃত্যুতেও যার নেই ব্যাত্যয়।
“তোমরা এবার এসো। আমার সাধনার সময় হয়ে এল। তোমাদের ফেরার ট্রেন তো সাতটায়।”
এতক্ষণে খেয়াল পড়ল সবার, ঘড়িতে সাতটা বাজতে মিনিট দশেক মাত্র বাকি! “ছোট্ট রাজকুমার শুক্লা বাইরে গাড়ী নিয়ে অপেক্ষা করছে। এস। আবার দেখা হবে!”
মহামানবকে প্রণাম জানিয়ে তাঁর ডেরা থেকে বের হলেন সকলে। অপ্রকাশিত সত্যের নির্বাক সাক্ষী। স্টেশান অন্তত ঘণ্টাখানেকের পথ। আজ যাত্রী অপেক্ষাগারেই রাতটা কাটাতে হবে।
“আরে এখন তো সাতটা বাজতে পাঁচ ! কিন্তু আমরা তো. . .!” হাবুর মনে প্রশ্নের ঝড় নেমে এল। “আশ্চর্য্য!” ব্রজনন্দন যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না! এও সম্ভব? আজ মহামানব বলছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন। “কালোऽস্মি লোকক্ষয়কৃত্ প্রবৃদ্ধঃ”—আমি কাল, জগতের বিনাশকারী। কীভাবে সময় তাঁর নির্দেশেই থেমে থাকে, যখন তাঁর মুখ নিঃসৃত শ্লোক বাণী হয়ে উঠছিল। আসলে সময় থামেনি। বরং কৃষ্ণ অর্জুনকে এমন এক মুহূর্তের অভিজ্ঞতা দিয়েছিলেন, যেখানে সে সময়ের স্রোতের ভিতর দাঁড়িয়ে প্রথমবার সময়কেই দেখতে পেল। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল পরে, কিন্তু তার পরিণতি যেন কৃষ্ণের বিশ্বরূপে ইতিমধ্যেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। বাস্তবে এও সম্ভব! মহামানবের এ কেমন মায়াজাল! উত্তর জানেন স্বয়ং মহাকাল!
(পরবর্তী পর্ব ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার)
সর্বশেষ খবর
-
ক্ষমতা পেয়েও ভোলেননি শিকড়, মেলায় বসে পুতুল বিক্রি বিজেপি বিধায়কের!
-
‘রবীন্দ্র সরোবরের জল যেন খাওয়া যায়’, আধিকারিককে ব্যবস্থার নির্দেশ অগ্নিমিত্রার
-
লক্ষ্মীবারই তৃণমূলের প্রতীক বিবাদের নিষ্পত্তি? ফের দুই শিবিরকে ডাকল কমিশন
-
ভারতীয় ভূখণ্ডে পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত কমিশন চিনের, ‘নাটক’ বলল ভারত
-
আলমারি খুললেই ন্যাপথালিনের ঝাঁঝালো গন্ধ? শরীরে ঢুকছে রাসায়নিক, বিপদে লিভার-কিডনি!