একদিকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের জল্পনা, অন্যদিকে মক্কা চুক্তির ভাল-মন্দ। বহু প্রশ্ন উত্তরহীন ভেসে বেড়াচ্ছে বাংলাদশে। এমনকী, পড়শি দেশে এত ধুমধাম করে ‘ব্রিক্স’ যজ্ঞ সমাধা হল, গণমাধ্যম ছাড়া সমাজের কোনও মহলে কোথাও তার প্রতিফলনই নেই! লিখছেন, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
দিন কয়েকের জন্য বাংলাদেশে এসেছি। দেখছি, সর্বত্র সবকিছু ছাপিয়ে অধিকাংশের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটিই প্রশ্ন: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনা কি সত্যি সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন? এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নেই। বুক বাজিয়ে কেউ দাবি করতে পারছে না, হ্যাঁ তিনি ফিরবেনই, কিংবা, না তাঁর ফেরা হচ্ছে না। লেজুড় হিসাবে উঠে আসছে আরও কিছু সম্পূরক বা ‘সাপ্লিমেন্টারি’ প্রশ্ন। যেমন, ভারত কি তাঁকে দেশে ফিরতে দেবে? অথবা, তাঁর নিরাপত্তা কিংবা ন্যায়বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক মহল কি বাংলাদেশের সরকারের উপর কোনওরকম চাপ সৃষ্টি করবে? কিংবা তিনি সত্যিই ফিরে এলে দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা সামাল দেওয়া যাবে কি?
আরও পড়ুন:
দেশের হাল যে চমৎকার, এ কথা কেউ বলবে না। পশ্চিম এশিয়ার অশান্তির কারণে গ্যাস সংকট তীব্র। দোসর বিদ্যুৎ ঘাটতি। এই যুগলবন্দি শিল্প পরিস্থিতির হাল করুণ করে তুলেছে। গ্যাসের অভাবে বহু কারখানা বন্ধ। বেকারত্বের ছোবল সর্বত্র। রাস্তাঘাটে চুরি-ছিনতাই মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছে। রাহাজানি-ডাকাতিও। এসবের সঙ্গে সংগত করছে মূল্যবৃদ্ধি। চাল, ডাল, আটা, তেল ও মশলার দাম হু-হু করে বেড়ে চলেছে। অবস্থা কতটা করুণ একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। হাসিনা আমলে এই সময়টায়, মানে দুর্গাপুজোর মুখোমুখি বাংলাদেশ সরকারিভাবে ইলিশ রফতানি করত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির জন্য। ইলিশ কূটনীতির দিকে হাপিত্যেশ করে চেয়ে থাকত মেছো-বাঙালি। উৎপাদন এত হত যে রফতানি না করলে জেলেদের লোকসান। বাজারে ইলিশের দাম এই সময়টাতেই সাধারণের নাগালের মধ্যে আসে। ছবিটা হুট করে পাল্টে গিয়েছে। যা হচ্ছে তা এককথায় উলটপুরাণ!
হাসিনা আমলে, মানে দুর্গাপুজোর মুখোমুখি বাংলাদেশ সরকারিভাবে ইলিশ রফতানি করত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির জন্য। ইলিশ কূটনীতির দিকে হাপিত্যেশ করে চেয়ে থাকত মেছো-বাঙালি। উৎপাদন এত হত যে, রফতানি না করলে জেলেদের লোকসান। বাজারে ইলিশের দাম এই সময়টাতেই সাধারণের নাগালের মধ্যে আসে। ছবিটা হুট করে পাল্টে গিয়েছে।
সোমবারের ‘প্রথম আলো’-র প্রথম পৃষ্ঠার বড় খবর, ইলিশ-খরা এতই প্রবল যে, এই ভরা মরশুমেও ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রফতানি হচ্ছে! এ যেন ‘ক্যারিং কোলস টু নিউ কাসল!’ বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই উলটপুরাণ প্রক্রিয়ার শুরু গত বছর। সে-বছর এপার বাংলা থেকে পদ্মাপাড়ে ইলিশ গিয়েছিল প্রায় ১৮ হাজার কেজি। এ বছরের সাড়ে ৯ মাসে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার কেজি! এই ইলিশের প্রধান জোগানদার নাকি মোদি-রাজ্য গুজরাট। ভারত থেকে বাংলাদেশে কেন যাচ্ছে এত ইলিশ? সহজ উত্তর, চাহিদা। গত ক’-বছর ধরেই বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন কমছে। ২০২১-’২২ সালে যে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন, ২০২৪-’২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার টন। বাজার ঘুরে দেখলাম, এক কেজি ওজনের বাংলাদেশি ইলিশ ২৫০০ টাকার নীচে নেই! ভারতীয় ইলিশ তুলনায় সস্তা। লোকে আগ্রহ ভরে কিনছে, কিন্তু পস্তাচ্ছে। দোকানিকে গালমন্দ করছে। স্বাদহীন। গন্ধহীন।
সাধারণের পেট ও রসনায় টান সত্ত্বেও অফিস-কাছারি, ক্লাব-মেহফিল কিংবা ঘরোয়া আড্ডায় চাপা আলোচনার সেরা টপিক শেখ হাসিনার ডিসেম্বর প্রত্যাবর্তন সম্ভাবনা। একটা চাপা উত্তেজনা যেন ক্লাইম্যাক্সের অপেক্ষায় দমবন্ধ করে প্রহর গুনছে। নিশ্চিতভাবে কারও কিছু জানা নেই বলেই এসব আলোচনায় নানা সম্ভাবনা নিয়ে লোফালুফি চলছে। আচ্ছা, সত্যিই কি তিনি ফিরতে চান? ভারত কি তাঁকে এভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দেবে?
তাঁর পক্ষে জবরদস্তি আসা কি সম্ভব? বাংলাদেশ কি হাসিনাকে অনুমতি দেবে? হাসিনা এলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা কি বাঁধভাঙা বন্যার জলের মতো দু’-কূল ছাপিয়ে প্লাবন ঘটাবে? সেই জনজোয়ার রোখা কি সরকারের পক্ষে সম্ভব? অন্য ধরনের প্রশ্নও উত্তরহীন ভেসে বেড়াচ্ছে। যেমন, হাসিনা ও তাঁর দোসরদের প্রতি সাধারণের ক্ষোভ সত্যিই কি প্রশমিত? নতুন সরকার এই অল্প দিনে কি এতটাই আশাহত করেছে যে, মানুষ ‘পতিত স্বৈরাচারী’ হাসিনাকে বরণ করতে প্রস্তুত? তাঁকে সরাতে যারা বিপ্লব ঘটাল, দেশে এলে তারা কি হাসিনাকে তিষ্ঠতে দেবে? ক্যান্টনমেন্টও কি হাসিনার জন্য নিরাপদ?
পড়শি দেশে এত ধুমধাম করে এই যে ‘ব্রিক্স যজ্ঞ’ সমাধা হল, কী আশ্চর্য, গণমাধ্যম ছাড়া সমাজের কোনও মহলে কোথাও তার প্রতিফলনই নেই!
আলোচিত হচ্ছে অন্য ধরনের রাজনৈতিক বিষয়ও। যেমন, হাসিনা ফিরে এলে কার স্বস্তি সবচেয়ে বেশি? উত্তরটা সহজ। ভারত। সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে কে পড়বে, সেই প্রশ্নের উত্তরও কঠিন নয়। বাংলাদেশ সরকার। এর রেশ ধরেই উঠে আসছে এই প্রশ্ন, তাহলে বাংলাদেশ সরকার নিজের অস্বস্তি ও অশান্তি বাড়াতে চাইবে কেন? কেন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে বিড়ম্বনা আবাহন করবে? অন্য প্রশ্নও কম আলোচিত নয়। বারবার ডিসেম্বর প্রত্যাবর্তনের ডঙ্কা বাজিয়ে কোনও অজুহাতে পিছু হটলে হাসিনার বিশ্বাসযোগ্যতা কি নষ্ট হবে না? দেশে ঘাপটি মেরে থাকা সমর্থকদের রোষানলে নেত্রীকে পড়তে হবে না? আশাহত হওয়ার মাশুল গুনতে হবে না? যেখানে যাচ্ছি, সর্বত্র এই এক আলোচনা। উচ্চকিত অবশ্যই নয়, আলোচনা অনুচ্চে, চাপা কণ্ঠে। পড়শি দেশে এত ধুমধাম করে এই যে ‘ব্রিক্স যজ্ঞ’ সমাধা হল, কী আশ্চর্য, গণমাধ্যম ছাড়া সমাজের কোনও মহলে কোথাও তার প্রতিফলনই নেই!
ব্রিক্স নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ অবশ্য যে ছিল না, তা নয়। খুব ছিল। তবে সেটা ছিল বিমসটেকের চেয়ারপার্সন হিসাবে ব্রিক্স আউটরিচে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যোগদান করা উচিত হবে কি না তা নিয়ে। দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ তারেককে আগেই জানানো হয়েছিল। তিনি আগ্রহীও ছিলেন ব্রিক্সের আগেই ভারতে যেতে। কিন্তু তাতে জল ঢালে ৫ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতি ও প্রশ্নোত্তর পর্ব, যেখানে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনায় বিন্দুমাত্র আগল রাখেননি। ‘কট্টরপন্থী’দের কাছে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা। সরকারের উপর চাপ সৃষ্টিতে তারা দেরি করেনি। তারেক যাননি। বিমসটেকের চেয়ারপার্সন হিসাবেও কাউকে পাঠাননি। রোববার বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়ে দেন– বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গত ১৫ বছরের ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে নতুন দিকে যাবে। তাই সফরের চরিত্র দ্বিপাক্ষিকই হতে হবে। বহুপাক্ষিক নয়। হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা আগ্রহের শীর্ষে থাকলেও সরকারের দিক থেকে অন্য এক বিষয়কে টেনে আনা হয়েছে আলোচনার স্তরে। মক্কা চুক্তি। এ নিয়ে সাধারণের মাথাব্যথা কম হলেও গণমাধ্যম গমগম করছে।
সৌদি আরবের মক্কায় চলতি বছরের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে এই ত্রিপক্ষীয় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। নেটো জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, জোটভুক্ত ৩ দেশের কারও উপর হামলা হলে তা অন্য দু’-দেশের উপর হামলা বলে গণ্য করা হবে। ৩ দেশের কার কী দায়িত্ব তাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যেমন– সৌদি দেবে টাকা, তুরস্কের দায় উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের, সেনা সরবরাহ করবে পাকিস্তান। ইতিমধ্যেই এই চুক্তিকে ‘মুসলিম নেটো’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। ত্রিদেশীয় এই চুক্তিতে অন্য কোনও দেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ কেউ না জানালেও বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এই আগ্রহ অবশ্যই ভারতের নড়াচড়া বাড়িয়েছে ভূ-রাজনৈতিক কারণে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ বলেই। এ নিয়ে এ দেশের গণমাধ্যমে চর্চাও হচ্ছে বিস্তর। ভারত-বিরোধিতার সুর যেমন চড়ছে, তেমনই শোনা যাচ্ছে সাবধানী পদক্ষেপণের কথা। একদিকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের জল্পনা, অন্যদিকে মক্কা চুক্তির ভাল-মন্দ: এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বাকি সবকিছু কেমন যেন থমকে গিয়েছে!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
মার্কিন অস্ত্রে সৌদি ‘বধ’ হাউথির! সাহায্যে অপারগ জানালো আমেরিকা, পিঠটান মুসলিম ন্যাটোর
-
রণজয়ের সঙ্গে প্রেম-গুঞ্জনের মাঝেই অভিকার আঙুলে হিরের আংটি! গোপনেই বাগদান?
-
তিন বছর পর ভারতে ফিরছে আইপিএল নিলাম, বিয়ের জন্য আটকে স্থান-দিনক্ষণ ঘোষণা!
-
মুর্শিদাবাদের ঘটনাতেও শিক্ষা হয়নি! রেলগেট খোলা রেখেই ঘুমিয়ে কাদা গেটম্যান! তদন্তের নির্দেশ
-
বক্সায় বাঘ টানতে ‘প্রেমের ফাঁদ’! বিহার থেকে আসছে ‘ব্যাঘ্র-সুন্দরী’