শিক্ষকের জায়গা কি ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’? হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ‘এআই’ অবতার-নির্ভর উদ্যোগপতি প্রশিক্ষণ সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির মধ্যেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে– রক্তমাংসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের উষ্ণতার বিকল্প কি সত্যিই হতে পারে ‘এআই’? লিখছেন অংশুমান কর।
বাস্তব অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলার আর প্রয়োজন নেই। তাঁরই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ দিয়ে তৈরি অবতারের সামনে বসে নিজের স্টার্ট-আপের পরিকল্পনা তুলে ধরা যাবে, পাওয়া যাবে সমালোচনা, ঠিক করে নেওয়া যাবে ভুলভ্রান্তি। এমনই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল। উদ্যোগপতি হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে তারা চালু করেছে আট সপ্তাহের অনলাইন ‘এইচবিএস ফাউন্ড্রি’ বুটক্যাম্প। এই কোর্সটির খরচ ৬৯৯ ডলার, মানে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৭ হাজার টাকা। ঠিক কী হবে এই কোর্সে? অংশগ্রহণকারীরা একটি স্টার্ট-আপ তৈরির গোটা প্রক্রিয়াটি হাতে-কলমে শিখবেন– প্রাথমিক ভাবনাকে ঘষেমেজে নেওয়া থেকে শুরু করে উপযুক্ত লগ্নিকারী ও ক্রেতার সামনে সেই ভাবনাকে ‘পিচ’ করা পর্যন্ত সবই শেখানো হবে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের পাঠ্যবস্তু, বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান দিয়ে প্রশিক্ষিত এআই এজেন্ট, সহ-উদ্যোক্তাদের কমিউনিটি এবং অবতারের কৃত্রিম ভিডিও কল– এসব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগকারীদের সামনে ‘পিচ’ করা, সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে মিটিং করা কিংবা বোর্ডের মিটিং– সবই অনুশীলন করা যাবে।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল যে ‘এআই’ অবতারগুলি তৈরি করেছে, তার মধ্যে একটি হল– জেফ বাসগ্যাংয়ের অবতার। বাসগ্যাং ফ্লাইব্রিজ ক্যাপিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সিনিয়র লেকচারার। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সারা কেসলার একটি প্রতিবেদন লেখার জন্য একটি প্রস্তাব বাসগ্যাংয়ের এআই অবতারের সামনে পেশ করেছিলেন। তিনি ডিজিটাল বাসগ্যাং অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র ছিলেন। কিন্তু প্রস্তাবটি নিয়ে তিনি মোটেই উৎসাহ দেখাননি। কথা বলার সময় আসল বাসগ্যাংয়ের মতোই ডিজিটাল অবতারের কঁাধও সামান্য, প্রায় একই ছন্দে বারবার নড়ছিল। পরে আসল বাসগ্যাংকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, অবতারটি তঁার কাছে একটু ‘অদ্ভুত’ লাগে, তবে তঁার ছাত্রছাত্রীরা অবতারটি বেশ পছন্দ করে।
ফাউন্ড্রি বুটক্যাম্পের এই সাফল্য ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষাপ্রদান পদ্ধতি ঠিক কেমন হতে চলেছে– সে সম্পর্কে একটি অশনিসংকেত দিচ্ছে।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ইতিমধ্যেই আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ১০০-রও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে এই ফাউন্ড্রি বুটক্যাম্পটিকে ব্যবহার করেছে। উদ্দেশ্য, প্রতি বছর যে প্রায় ৯০০ জন এমবিএ পড়ুয়াকে তারা ভর্তি করে, তার বহু গুণ বেশি ভবিষ্যতের উদ্যোগপতিদের কাছে হার্ভার্ডের প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেওয়া। এই প্রকল্পটির শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। তখন ভাবনা ছিল, সাধারণ চ্যাটজিপিটির মতো একটি পরামর্শদাতা তৈরি করা। ফাউন্ড্রির প্রকল্প অধিকর্তা ক্যাথারিনা রিংস জানিয়েছেন, অক্টোবরের পরীক্ষামূলক পর্বে ব্যবহারকারীদের মতামত পাওয়ার পরই প্রকল্পের ধরনটি বদলানো হয়। আরও সুসংহত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় এপ্রিলে।
প্রকল্পটির জন্য ‘এআই’ অবতারগুলিকে ইচ্ছে করেই একটু অন্যভাবে তৈরি করা হয়েছে। ভাবী উদ্যোগপতিরা কোনও প্রস্তাব দিলেই যাতে তারা বাহবা না দেয়, বরং প্রশ্ন তোলে, প্রস্তাবের দুর্বলতা ধরিয়ে দেয়– সেভাবেই তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপকদের অবতার তৈরি করা হয়েছে ‘হেইজেন’ প্রযুক্তির সাহায্যে। রিংস দাবি করেছেন যে, কোনও ‘চ্যাটবট’-এর সঙ্গে শুধু অধ্যাপকের ছবি জুড়ে দিলেই ব্যবহারকারীদের আগ্রহ বেড়ে যায়। আর ভিডিওয় সেই অবতারকে কথা বলতে দেখলে তঁাদের পছন্দ এবং আস্থাও আরও অনেকখানি বাড়ে। ইতিমধ্যেই ফাউন্ড্রি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। যেমন– জর্জিয়া টেকের ‘কোয়াড্র্যান্ট-আই’ কর্মসূচির প্রিন্সিপাল হ্যারল্ড সলোমন তঁার ১২ সপ্তাহের একটি কর্মশালায় পিএইচডি পড়ুয়া ও শিক্ষকদের জন্য ফাউন্ড্রি ব্যবহার করেছেন। তঁার মতে, মানব প্রশিক্ষকদের সময় ও সামর্থ্য সীমিত। তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক বেশি উদ্যোগপতিদের প্রশিক্ষণ দিতে পারছে।
ফাউন্ড্রি বুটক্যাম্পের এই সাফল্য ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষাপ্রদান পদ্ধতি ঠিক কেমন হতে চলেছে– সে সম্পর্কে একটি অশনিসংকেত দিচ্ছে। শিক্ষাবিদদের একাংশ দীর্ঘ দিন ধরেই এমন একটি আশঙ্কা প্রকাশ করছিল যে, ধীরে ধীরে অন্যান্য নানা ক্ষেত্রের মতোই শিক্ষাক্ষেত্রেও রক্তমাংসের শিক্ষকের প্রয়োজন থাকবে না। এই আশঙ্কা কি তাহলে সত্যি হতে যাচ্ছে? ইতিমধ্যেই ‘এআই’ পরিচালিত স্পোকেন ইংলিশের নানা কোর্স জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। একটা বড় কারণ এই যে, চাইলেই একজন মানব শিক্ষককে নিজের ভুল ঠিক করিয়ে নেওয়ার জন্য বা পরামর্শ নেওয়ার জন্য পাওয়া যায় না। ‘এআই’ কিন্তু ২৪ ঘণ্টাই শিক্ষার্থীর সাহায্যে হাজির।
একজন শিক্ষক অনেক সময়ই ক্লাসরুমের নয়, হয়ে ওঠেন তঁার ছাত্রের জীবনদেবতা।
এরপর কি তাহলে চাকরি যেতে শুরু করবে শিক্ষক-অধ্যাপকদের? এই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু একটি রুপোলি আলোকরেখাও ইতিমধ্যেই দেখা গিয়েছে। যে ‘এআই’ অবতারগুলি জনপ্রিয় হয়েছে, সেগুলি কিন্তু বানানো হয়েছে এর শিক্ষকদের আদলে। তারা এমনকী নকল করছে পড়ানোর সময় সেই শিক্ষকদের ব্যবহৃত দেহভঙ্গিকেও। অনেক সময়ই এক-একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কয়েকজন শিক্ষকের পাঠদানের খ্যাতির কারণে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই ধরনের খ্যাতিমান মানব শিক্ষকদের খ্যাতিকেই ব্যবহার করছে এই কোর্সটির বিপণনের কাজে। অবতারদের তৈরি করা হচ্ছে জনপ্রিয় মানবশিক্ষকদের প্রতিরূপ হিসাবে। বার্তা খুব পরিষ্কার। শিক্ষাদানে এখনও পর্যন্ত রক্তমাংসের শিক্ষকদের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি ‘এআই’। বরং মানবসম্পদের দক্ষতাকেই ‘এআই’ নকল করছে।
একথাও নিশ্চিন্তেই বলা যায় যে, রক্তমাংসের শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্কের মধ্যে যে উষ্ণতা থাকে, তার পুনর্নির্মাণ করা এই অবতারের পক্ষে অসম্ভব। একজন শিক্ষক অনেক সময়ই ক্লাসরুমের নয়, হয়ে ওঠেন তঁার ছাত্রের জীবনদেবতা। এআই অবতারের পক্ষে এই ভূমিকা পালন করা কার্যত অসম্ভব। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের প্রখ্যাত অধ্যাপক টমাস আইজেনম্যান যেমন এই কোর্সে নথিভুক্ত হওয়া তঁার ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘ওরা এআই ভালবাসে। এআই ব্যবহার করছে, অনেক কিছু শিখছেও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বার বার ফিরে আসতে হচ্ছে মানুষের কাছেই।’ মানব শিক্ষকদের জন্য ক্লাসরুম তাই এখনও ভূস্বর্গই। ভবিষ্যতে ভূস্বর্গ ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে ইঙ্গিত কিন্তু বর্তমান দিচ্ছে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘যতদিন সনাতনী পতাকা উড়বে, কেউ ভারতের ক্ষতি করতে পারবে না’, হুঙ্কার যোগীর
-
রাতে রাস্তায় বাস থাকলেই জরিমানা! তবে বাসমালিকদের স্বস্তি দিতে নয়া সিদ্ধান্ত অর্জুনের
-
পরপর বোমা ফেলল রাশিয়া, এবার যুদ্ধের আগুন ন্যাটোভুক্ত দেশে! জবাব দেবে সামরিক জোট?
-
ক্রিকেটের বাইশ গজে এই প্রথম! দিল্লিতে টি-২০তে পুরো ‘বন্দে মাতরমে’ কণ্ঠ মেলাল টিম ইন্ডিয়া
-
অভিশাপ ও পুনর্জন্মের জটিল রহস্য, কীভাবে জন্ম নেন মহাপরাক্রান্ত মহিষাসুর?